আপন বৃত্ত

স্বদেশ দত্ত

19

এক
বাসুদেব মন্ডল স্কুল ম্যাগাজিনের জন্যএকটি প্রবন্ধ লিখতে বসেছেন। ভাবছেন – কী নিয়ে লেখা যায় ?
মনেপড়লো – গত বছর লিখেছিলেন ‘পরমাণুর ইতিহাস’। হেড স্যার প্রশংসা করে বলেছিলেন – সুন্দর লিখেছেন। আপন বৃত্ত থেকে লেখা তো, সুন্দর হতেই হবে।
বাসুদেব মন্ডলের মাথায় নেগেটিভ তরঙ্গ খেলা করে গেল – স্যার প্রশংসা করেছেন ঠিকই, কিন্তু একটু খোঁচা কি দেন নাই ?বৃত্ত বলতে কী বুঝিয়েছেন ? রসায়ন ছাড়া অন্যকিছু নিয়ে লিখলে কি সুন্দর হবে না ? বেখাপ্পা হবে ?নাকি রসায়ন ছাড়া আমি অন্যকিছু জানি না ?
এমন সময় একটা মশা গুনগুনিয়ে উড়ে গেল। চিন্তা ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। তিনি মশার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন –
ডানা আছে পাখি নয়
উড়তে পারে বিমান নয়
মানুষ খায় বাঘ নয়
সুঁই ঢুকায় ডাক্তার নয়
ছোটবেলাকার শোনা ধাঁধা।
তিনি মৃদু হেসে নিজের সাথে নিজে বলে গেলেন – সব মশা কি রক্ত চোষে ? খায় শুধু স্ত্রী মশা। কেন খায় ?মশা রক্তের প্রোটিনকে হজম করে, মুক্ত অ্যামাইনো এসিডে পরিণত করে। যা দিয়ে পরবর্তিতে এদের ডিমের কুসুমের ভিত্তি স্থাপন করে। প্রজননের জন্য খায়। টিকে থাকার জন্য খায়। মশা তো নিজেকে পুষ্ট করে ফুল-ফলের রস খেয়ে।
আবার একটি মশা গান গেয়ে উড়ে গেল।
বাসুদেব মন্ডলের মাথায় ঈশ্বর গুপ্তের প্রবাদসম দ্বিপদীর কথা খেলা করে গেল –
রাতে মশা দিনে মাছি
এই নিয়ে কলকাতায় আছি
তিনি চলে গেলেন ইতিহাসের পাতায় – সেই তিন বছর বয়সে বেড়াতে এসেছেন মাতুলালয়ে। আক্রান্ত হয়েছেন জ¦রে। খাটে শুয়ে বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছেন, রেতে মশা দিনে মাছি/এই তাড়ড়য়ে কলকাতায় আছি।
পরক্ষণেই সন্দেহ ও যুক্তি একই সাথে ভর করল – সত্যি কিনা কে জানে ? হতেও পারে। Morning shows the day.
একটা মশা নিঃশব্দে কামড় দিয়ে বসল।
বাসুদেব মন্ডল ‘উহ’্ করে উঠলেন। কামড় দেওয়া স্থান ফুলে উঠেছে। ফুলে যাওয়া স্থানে হাত বুলিয়ে কাব্য করে বললেন – দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থেকে রাতের বেলায় জাগা ?/ সুযোগ বুঝে কামড় দিয়ে পালায় হতভাগা।
তিনি লেখার বিষয় পেয়ে গেলেন। লিখবেন মশা নিয়ে।
তিনি লেখার খাতা টেনে নিয়ে ছোট ছোট পয়েন্টে লিখতে শুরু করেছেন Ñ
(১) ইংরেজি ‘Mosquito’ শব্দটি `mosco’ এবং`ito’ দিয়ে গড়া। এর অর্থ ‘ছোট পতঙ্গ’।
(২) কত প্রজাতির মশা! অ্যানোফিলিস, এডিস, কিউলেক্স, ম্যানসলিয়া, কিউলিসিটা, লুৎজিয়া, সরোফেরা, ওয়োমিয়া এরকম ৩৫০০ টিরও বেশি।
এমন সময় ডান হাতের কব্জিতে একটা মশা এসে বসেছে। তিনি লেখা থামিয়ে বাম হাতে মারতে গেলেন। মশা উড়ে গেছে। তিনি হেসে উঠলেন। একটি কৌতুক মনেপড়ে গেল।
‘‘ মূককীট থেকে বের হওয়া বাচ্চা মশা। সবেমাত্র উড়তে শিখেছে।প্রথম যেদিন সে বাইরে গেলো। মা মশা খুব টেনসনে ছিল।বাচ্চা মশা ফেরার পর মা মশা জানতে চাইলো – ওড়াউড়ি করতে কেমন লাগল ?
-দারুণ!খুব মজা।
– মানে ?
– আমার ওড়াউড়ি দেখে কত মানুষ যে তালি দিল!
মা মশা সতর্ক করে দিয়ে বলল – শোন মানুষের তালির আশেপাশে যাবি না! এটা মশা মারার কামানের চেয়েও ভয়ঙ্কর! ”
তিনি কৌতুক রেখে ভাবতে লাগলেন –
‘‘ প্রকৃতিবিদরা বলেন, কানাডীয় অঞ্চলে মশার উৎপত্তি। তারপর নদী বা সাগরপথে মনুষ্যবাহিত নানা ধরনের জলযানের সুবাদে ছড়িয়েছে বিশ^ময়। অ্যান্টার্কটিকা ও কিছু দ্বীপপুঞ্জ, বিশেষ করে আইসল্যান্ড ছাড়া বাদবাকি ভূভাগে মশা ছড়িয়ে আছে। ’’
এমন সময় দুই পায়ের পাতাতে মশা কামড় দিয়ে বসল। তিনি সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বুঝতে পারছেন না, হঠাৎ করে মশারা কেন ক্ষেপে গেল ?
দুই
খেয়াল জাগল, কয়েল জ্বালিয়ে দিলে কেমন হয় ?ডাকতে চাইলেনগিন্নী নিহারিকাকে। ডাকতে গিয়েও ডাকলেন না – ‘‘ তিনি তো আবার সাচ্চা পরিবেশবাদী! কয়েল, অ্যারোসল তাঁর একেবারেই না পছন্দ। বাবার বাড়ি থেকে বিকেলেই ফিরেছে । যাওয়ার আগে ফুলের টবগুলো দেখতে বলেছিল। দেখা হয় নাই। সামান্য জমে থাকা পানিতেই মশা তার প্রজনন কাজ সেরে ফেলতে পারে। ’’
বাসুদেব মন্ডল মশা থেকে বাঁচার উপায় পেয়ে গেলেন। যাকে বলে – সাপও মরবে , লাঠিও ভাঙ্গবে না।
তিনি মশারি টাঙিয়ে নিলেন। কাগজ-কলম নিয়ে ঢুকে গেলেন মশারির ভিতর। শুরু করলেন মশা নিয়ে ভাবনা – ফলের মৌসুমে পরাগায়ন ছাড়া মশার অন্যকোন ভাল দিক আছে ? সবই তো খারাপ দিক। হুল ফুটানো, অসুখ বিসুখ ছড়ানো….।
ভাবনা আর এগুলো না। কপালে মশার কামড়। তিনি কপাল চুলকাচ্ছেন।
মশারির ভিতর বেশ কয়েকটা মশা পাখা ঝাপটানো গান গেয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। তিনি মশাকে মারতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু হচ্ছে না। শুধু তালি হচ্ছে।
ভিতর থেকে নিহারিকা দেবী বলে উঠলেন – কী ব্যাপার ? তাালিয়া বাজাচ্ছ যে ? কোন আনন্দের সংবাদ আছে নাকি ?’ বলতে বলতে চলে আসলেন।
বাসুদেব মন্ডল স্থির হয়ে বসেছেন। দেখা যাচ্ছে না মশা। না ওড়াউড়ি। না গুণগুনানি।
নিহারিকা দেবী মশারির কাছে চিড়িয়া দেখার মতন করে দাঁড়িয়েছেন। জিজ্ঞেস করলেন Ñ মশারি টাঙিয়েছ যে ?
– মশা খানিকটা বিরক্ত করছিল।
– মানে ? আসার পর থেকে মশার কোন গন্ধই পেলাম না! আর তুমি বলছ, মশা বিরক্ত করছে! যার জন্য সন্ধ্যা পেরোতেই মশারি টাঙাতে হলো ? কই মশা ? বের হয়ে আস। সোফায় বসি। দেখি, মশার দেখা পাই কিনা ?
বাসুদেব মন্ডল সোফায় এসে বসেছেন।
নিহারিকা দেবী হেসে বললেন – তালিয়া বাজাচ্ছিলে কেন ?
– মশা!
– মশা ?মশারির ভিতর মশা ?
বাসুদেব মন্ডল কিছু বলছেন না।
নিহারিকা দেবী ‘দেখি’ বলে মশারির ভিতর ঢুকে গেলেন।
বিরক্তির সুরে বললেন Ñ কই ? কোন মশা তো দেখছি না ?
পরক্ষণে হেসে বললেন – মশা কি আমায় দেখে পালাল? কিন্তু , মশা তো আমার দিকে তেড়ে আসার কথা। তাদের ‘ও’ পজিটিভ পছন্দ কিনা! আবার পড়েছি নীল শাড়ি।
চোখ গোলগোল করে বললেন – মশা নিয়ে কোন উল্টাপাল্টা ভাবছিলে ?
বাসুদেব মন্ডল কিছু বলতে গিয়েও বললেন না।
নিহারিকা দেবী সোফায় এসে বসেছেন। মিষ্টি হেসে গান ধরলেন Ñ একটুসখানি দেখ/ একখান কথা রাখ/ ভালবাইসা একবার আমায় বৌ কইয়া ডাক।
গান থামিয়ে বললেন – কী এমন জড়বৎ হয়ে বসে আছ যে ?
– মশা খুঁজছি। কিন্তু দেখছি না।
– ওহ্, তোমার মশা প্রয়োজন ? গেলাম।
তিন
নিহারিকা দেবী চৌকাঠ পার হওয়ার সাথে সাথে মশা গুণগুনিয়ে উঠল। একটা, দুইটা করে আস্তে আস্তে বেশকিছু মশা ওড়াউড়ি শুরু করে দিয়েছে।
বাসুদেব মন্ডল হাত নাড়ছেন। কিন্তু মশা হাতের নাগলের বাইরে থেকে চক্রাকারে উড়ছে। তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন। অস্ফূট স্বরে বললেন -যা, মশা নিয়ে লিখবই না।
আর তখনই অদ্ভুত কান্ডটা ঘটল। সব মশা ওড়াউড়ি বন্ধ করে দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে টেবিলে গিয়ে বসতে শুরু করেছে। তিনি অবাক বিস্ময়ে সেইদিকে তাকিয়ে আছেন।
একসময় বসে পড়লেন।
ভাবলেন – থাক মশারা ওখানে বসে। যা বলেছি তা। তোদেরকে নিয়ে ভাববই ন। লিখব অন্যকিছু নিয়ে।
সাথে সাথে ভাবনা মোড় নিল অন্যদিকে। মনেপড়ে গেল সহকর্মী ইমরান শেখরের কথা।
ক্লাশ শেষে শিক্ষক মিলনায়তনে প্রবেশ করেছেন। ইমরান শেখর কিছু একটা পড়ছিলেন। বই থেকে চোখ সরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন – দাদা, আপনার আধুনিক রসায়নের জনক কে ?জন ডাল্টন ?না, অ্যান্টনি ল্যাভয়সিয়ে ?
এমন প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলেন। মনেমনে বললেন – আসলেই তো ? কেউ বলেন, জন ডাল্টন। কেউ বলেন, অ্যান্টনি ল্যাভয়সিয়ে। আসলে কে ?
বিতর্ক বা যুক্তি এড়িয়ে উত্তর দিলেন – রসায়ন কি শুধু আমার ? আপনারও। তাইতো জন ডাল্টন আর অ্যান্টনি ল্যাভয়সিয়ে নিয়ে ভাবছেন। আর মাথায় প্রশ্ন যেহেতু এসেছে , উত্তরও পেয়ে যাবেন।
ইমরান শেখর হেসে বললেন – মাথায় ?মনে নয় ?
তিনি মৌন হাসি দিলেন।
চার
বাসুদেব মন্ডল লেখার বিষয় পেয়ে গেছেন। লেখার শিরোনাম হবে ‘ডাল্টন ? না, ল্যাভয়সিয়ে ? ’
তিনি টেবিলের দিকে তাকালেন। অবাক হয়ে বললেন – ও মা, মশারা পালিয়েছে!
নিহারিকা দেবী ভিতর থেকে চলে এসেছেন। বললেন – আবার কী হলো ? চেঁচাচ্ছ যে ?
বাসুদেব মন্ডল হাসলেন। এড়িয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছেন।
– কিছু বলছ না ?মুচকি মুচকি হাসছ ?
– কেমিক্যাল দিয়ে মশা মারার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু দুইজন রসায়নবিদের নাম নিতেই মশা পালাল। বেশ মজার না ?
– এই একদম কথা লুকাবে না। সত্যি করে বল।
বাসুদেব মন্ডল হো হো করে হেসে উঠলেন। তিনি হাসতে হাসতে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় পেয়ে গেলেন।
গেয়ে উঠলেন – যদি বউ সাজো গো/ আরো সুন্দর লাগবে গো।
– এইসব কোন ধরণের স্থূল রসিকতা ? তোমাকে কেমন জোকার জোকার মনে হচ্ছে। কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা।
– ও, আমি করলে স্থূল রসিকতা ? আর তুমি যখন বাবার বাড়ি থেকে ফিরে ‘একটুসখানি দেখ’ কর, তা হয় সূক্ষ রসিকতা ?
বাসুদেব মন্ডল নিহারিকা দেবীর একখানা হাত কোলে টেনে নিলেন। মুচকি হেসে বললেন – দুষ্টামি করছিলাম। এবার গানটা গাও। বেশ আবেদনময়ি গান!
নিহারিকা দেবি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন – যা! ও ভাবে বলতে নেই।
– ঠিক আছে। ও ভাবে বলব না। এবার গাও।
নিহারিকা দেবি হেসে গান ধরেছেন।
বাসুদেব মন্ডল মুচকি হাসি ধরে রেখেছেন। আর মাঝেমাঝে তাল ঠুকছেন