আন্তর্জাতিক বইমেলা কী চট্টগ্রামে সম্ভব ?

মুশফিক হোসাইন

13

বাংলাদেশে শীতের মওসুমে-কিংবা পরে ঢাকা, চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক রপ্তানি মেলা আয়োজিত হয়ে থাকে। যতদূর জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক দেশ ঐ সব মেলায় অংশ নিয়ে থাকে। নির্ভরশীল সূত্র থেকে জানা যায়, ঐ সকল মেলায় শত শত কোটি টাকার অর্ডার পান দেশীয় উদ্যোক্তারা। এটা নিঃসন্দেহে একটি শুভ সংবাদ। বিশ্বের বাজারে দেশের পরিচিতি যেমন বাড়ে তেমনি সম্মানও বেড়ে যায় বহুলাংশে। সরকার ও বাণিজ্যিক চেম্বারগুলো এতে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন।
প্রসঙ্গটি অবতারণা করার পেছনে একটি স্বপ্ন আছে। তা হলো বাংলাদেশে কোন আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের সংবাদ শুনি নি। কিন্তু এ আয়োজনটি অবশ্যই করা যেতে পারে। উদাহারণত বলা যায়, ভারতের একটি রাজ্য পশ্চিম বঙ্গ। তার রাজধানী কলকাতা। বেশ কয়েক বছর থেকে শুনে আসছি। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার কথা। সেখানে বাংলাদেশ প্যাভেলিয়ন থাকে। দেশের নামি-দামি প্রকাশকরা ঐ মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকে। এমন কী আমাদের চট্টগ্রামের ২/১ জন প্রকাশক ও অংশ নেয়ার সংবাদ সামাজিক মাধ্যমের মারফতে জানতে পারি। আরও জানা যায়, ঐ মেলায় বাংলাদেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী ও অন্যরাও অংশ নিয়ে থাকেন। তারা সেখানে যোগ দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ফলাও করে বিজ্ঞাপন দেন। এটা দোষের কথা নয়। বরঞ্চ এর মাধ্যমে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার সংবাদ পেয়ে থাকি। আবার বাংলাদেশি এক তরুণ উদ্যোক্তা আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে মুক্তধারা বইমেলার আয়োজন করে থাকেন। সেখানে প্রবাসী বাঙালিরা শুধু নয়, ভারতীয় বাঙালিরাও যোগ দেন। উভয় বাংলার নামি-দামি লেখকের সমাবেশ হয়ে থাকে। এ সংবাদও আনন্দের।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে এবং চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশনা পরিষদ ও চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে একক একটি বইমেলা সফলভাবে সমাপ্ত হলো। চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের পাশে জিমনেশিয়াম প্রাঙ্গণে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি মেলাটি সম্পন্ন হল। অবশ্য ঝড় ও কালবৈশাখীর কারণে ঢাকা বইমেলার মতো চট্টগ্রাম বইমেলার দুইদিন বাড়িয়ে ২ মার্চে সুসম্পন্ন হল। বইমেলা আয়োজন করা কোন সিটি কর্পোরেশনের কাজের অওতাভুক্ত কাজ নয়। তবুও কবি বিশ্বজিৎ-এর সাথে সুর মিলিয়ে বলতে হয়, ‘কিন্তু কর্মসীমার পরিধি বিস্তৃত করে জনহিতকর কাজে হাত দেওয়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ঐতিহ্য।’ এই প্রতিষ্ঠান যখন পৌরসভা হিসাবে পরিচিত ছিল, তখন থেকেই এর চেয়ারম্যান নূর আহম্মদ শিক্ষার প্রসারের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। …. অতপর সিটি কর্পোরেশন এই অঞ্চলের মানুষের জ্ঞান ও সৃজনশীলতার চর্চাকে উৎসাহিত করতে, নবীন-প্রবীন নাগরিকের বই পাঠের আগ্রহকে মূল্য দিতে এগিয়ে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক। (প্রথম আলো ৮ মার্চ ২০১৯)
ইতিপূর্বে বিক্ষিপ্তভাবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বইমেলার আয়োজন হয়েছিল। কিন্তু লেখক পাঠকের চাহিদার সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ না হওয়ায় তা সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। চট্টগ্রামের লেখক পাঠক ও প্রকাশকদের দাবি ছিল একটি একক বইমেলার আয়োজন। বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠির বইমেলা আয়োজনে ছিল না সুষ্ঠু কোন পরিকল্পনার চাপ। ছিল না দেশের প্রতিনিধিত্বশীল প্রকাশকদের সাড়া। স্মৃতি যদি বিভ্রান্ত না করে তবে ’৭৫ সালে সোজা কথায় আশির দশকে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল মাঠে একটি আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মেলাটি খুবই জমজমাট হয়েছিল। মেলায় কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামছুল হক, শহীদ কাদেরী, রফিক আজাদসহ আরো নামকরা কবি সাহিত্যিকদের পদচারণায় মুখর ছিল। এ ছিল আমার জীবনের প্রথম বইমেলা। আমরা তরুণরা সন্ধ্যার পর থেকেই মেলায় অংশগ্রহণের জন্য মুখিয়ে থাকতাম। তখন আমরা ছাত্র। বেশ কিছু বই কিনেছিলাম। ঐ মেলার স্লোগান ছিল ‘বই হোক নিত্য সঙ্গী’। এ স্লোগানটি আমাকে বইমেলায় অনুপ্রাণিত করেছিল। ঐ মেলাটি যেমন জমজমাট ছিল পরবর্তী সময়ে আর কোন মেলা তেমন জমজমাট তো ছিলই না। পরবর্তী সবগুলো মেলা তরুণ বোদ্ধা পাঠকের সমযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছিল। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল ’৯০ এর দশকে পাবলিক লাইব্রেরি আয়োজিত বইমেলাটি। সম্ভবত উক্ত দুটি মেলার উদ্যোক্তা ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। এ দুটি বইমেলা বাদ দিলে পরবর্তী সকল বইমেলা সীমাহীন ব্যর্থতায় ভরা ছিল। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও কয়েকটি মেলা আয়োজন করে। যা প্রকাশক, পাঠকদের দৃষ্টি আর্কষণে ব্যর্থ। সম্ভবতঃ ২০১৭ সালে মুসলিম ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণের অনুষ্ঠিত মেলার অব্যবস্থাপনায় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয়। উক্ত বইমেলার উদ্বোধক চসিকের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন নিজেও তাঁর অসন্তুষ্টির কথা খোলামেলা প্রকাশ করেন। তিনি তখন কথা দিয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট সকলের পরামর্শ নিয়ে একুশের বইমেলার আয়োজন করবেন। পরের বছর না পারলেও এবার তিনি কথা রেখেছেন। চট্টগ্রামের লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ প্রকাশকদের নিয়ে প্রায় দু’মাস আগে প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেন। সবার পরামর্শ অনুযায়ী একুশ ২০১৯ এর বইমেলা সফল হিসাবে সকলের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। এবার একুশে তিনি ভাষার মাসের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্য নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে করে সাধারণ বইপ্রেমিরা যেমন খুশি, তেমনি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও খুশি। তবে সবচেয়ে বেশি তৃপ্ত হয়েছে লেখক ও প্রকাশকরা। বিভিন্ন জনে বই বিক্রির তথ্য বিভিন্নভাবে দিলেও এটা নিঃসন্দেহে ন্যূনতম ১০ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। এতে করে এটা প্রমাণ করে যে, এবারে বইমেলা সর্বক্ষেত্রে সফল ও সার্থক। মেলায় সাধারণ মানুষের ঢল সে কথার অকাট্য দলিল হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এ থেকে বলা যায়, ইতিপূর্বে লক্ষ্য উদ্দেশ্যহীনভাবে বইমেলার আয়োজনের পর এবারই চট্টগ্রামবাসী একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আর একটি উৎসব পালনের অনুসঙ্গ পেল। আর তা সম্ভব হয়েছে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের একান্ত আন্তরিকতা ও উৎসাহে। শুধু তাই নয়, মেয়র ভবিষ্যতে মেলার পরিসর বৃদ্ধিসহ একই সময়ে বইমেলা আয়োজনের আশ্বাস ব্যক্ত করেছেন। চট্টগ্রামবাসী তাঁর কথায় আস্থা রাখতে চায়। তাঁর কর্মউদ্যোগ সফল হোক সাহিত্যকর্মী হিসাবে প্রচন্ড আশাবাদী। ভবিষ্যতে তাঁর সাথে আমরা আছি।
তাঁর এবারের বইমেলা থেকে চট্টগ্রামবাসী ভবিষ্যতে তাঁর উদ্যোগে চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজন আশা করতে পারে। যদি আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজন করতে সম্মত হই। তাহলে এটাই প্রমাণিত হবে (ঈযরঃঃধমড়হম ঃড় ঃযব ভড়ৎঃয) চট্টগ্রাম সবার আগে। অতীতের সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে। আর তার নায়ক হবে চট্টগ্রামের মেয়র।
ইতিহাসে তাঁর নাম অম্লান হয়ে থাকবে। যেহেতু ইতিপূর্বে ১৯৭৫ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল মডেল স্কুলের মাঠে একটি আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে বইমেলায় ভারত, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়াসহ ৪৩ বিভিন্ন দেশের ৪৩টি বইয়ের স্টল ছিল। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি পুস্তক ব্যবসায়ীর স্টল ছিল। যেহেতু চট্টগ্রাম ১৯৭৫ সালে একটি সফল আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের সফল উদ্যোক্তা। সেই অভিজ্ঞতা এবং ২০১৯ সালের সফল বইমেলোর সফল আয়োজনের অভিজ্ঞতা থেকে ‘চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বইমেলা’ আয়োজন করা যায়। একুশে বই মেলার পর একই ভেন্যুতে কিংবা শিল্পকলা একাডেমির মাঠ, থিয়েটার ইনস্টিটিউট, শিশু একাডেমি, সিআরবি’র এলাকাসহ যে কোন স্থানে আয়োজন করা যেতে পারে। তবে তা সেই একুশের বই মেলাকে কোন অবস্থায় যেন ক্ষুন্ন না করে। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার বিদ্যমান আইন কানুনের আওতায় ৭ থেকে ১৫ দিন ব্যাপি অনুষ্ঠিত হতে পারে। সে বই মেলায় দেশিয় প্রকাশকদের ক্ষেত্রে ও আন্তর্জাতিক মান বিবেচনা করার শর্ত রাখা বাঞ্চনীয়। যেহেতু আন্তর্জাতিক বইমেলা সেহেতু মেলায় অংশগ্রহণের একটি বিশেষ নীতিমালা অনুসরণ করার সকলের জন্য স্বস্তিদায়ক। এবারের বইমেলার মতো চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্ন ও প্রত্যাশার বাস্তবায়নে চট্টগ্রামের মেয়র উদ্যোগী হলে বিশ্বদরবারে চট্টগ্রামের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।
চট্টগ্রাম যেহেতু কসমোপলিটন নগর। এখানে দুই হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিক মানুষের আগমন ঘটে। এখনও এ নগরে বাস করেন বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিক মানুষ বাস করছেন। চট্টগ্রামবাসী বহুভাষা ও সংস্কৃতিক সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এসকল বিষয় বিবেচনা করে “চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বইমেলা” আয়োজন করলে চট্টগ্রামবাসী তা সাদরে গ্রহণ করবেন। আশাকরি কলকাতা বইমেলার মতো চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের জন্য নগরবাসী মেয়রকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাবেন। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এটা বিশ্বাস করেন। মাননীয় মেয়র আপনি এই ্একটি আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের দায়িত্বটুকু গ্রহণ করুন। এবারের একুশের মেলাকে সফল ও যৌক্তিক পরিনতিকে পৌঁছানোর জন্য ধন্যবাদ।
ফেব্রুয়ারি তথা ভাষার মাসে চট্টগ্রামবাসী একটি একক উৎসব পালনের ব্যবস্থা করার জন্য কৃতজ্ঞতা।

লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব.)