আনোয়ারা মধ্য-ইংরেজি স্কুল ও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

জামাল উদ্দিন

70

বিদ্যা সাধনায় চট্টগ্রামের ইতিহাস সুপ্রাচীন। ইংরেজ শাসন পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার আগে এখানকার শিক্ষা প্রধানত ধর্মভিত্তিক তিনটি ধারায় চলছিল। বৌদ্ধদের জন্য কেয়াং বা বিহার, হিন্দুদেও জন্য পাঠশালা-টোল-চতুষ্পাঠী এবং মুসলমানদের জন্য মক্তব-মাদ্রাসা ছিল পঠন-পাঠন কেন্দ্র। এছাড়া চতুর্থ একটি ধারাও কাজ করেছিল যা ছিল গণ পর্যায়ে হিন্দু ও মুসলমান সংস্কৃতির মিলন ধর্মী। রাষ্ট্রনৈতিক প্রয়োজনে তখন ফার্সি ভাষা ছিল রাজকীয় ভাষা, আর বৈষয়িক প্রয়োজনে প্রচুর হিন্দু ফারসি ভাষা শিখতেন। পক্ষান্তরে জ্ঞাননাম্বেষণে ও রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে এবং জনসংযোগের প্রয়োজনে অনেক মুসলমান আলেমকে শিখতে হতো সংস্কৃত। তবে অপর তিনটি ধারার মতো চতুর্থ ধারার প্রাধান্য সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন ছিল না। সপ্তদশ শতাব্দী ও অষ্টাদশ শতার্ব্দীতে চট্টগ্রামে শিক্ষা ইতিহাসের সচিত্র চিত্র ছিল এই চার ধরণের। এমনকি উনবিংশ শতাব্দীর মুখে ইংরেজরা যখন তাদেও নতুন শিক্ষার ধারা নিয়ে উপস্থি হন তখনও এই পুরানো ধারা দেশের-নাড়ি নক্ষত্রকে তীব্রভাবে জড়িয়ে ছিল। বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে তার ভিত্তি স্থাপন কওে ইংরেজরাই। চট্টগ্রামে শিক্ষা সাধনার ইতিহাস খুঁজতে গেলে প্রথমে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামটি আসে সেপি ‘পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়’। গবেষকদের মতে খ্রিস্ট্রীয় অস্টম শতাব্দীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়। এই বিশ্বব্দ্যালয়ের অবস্থান ছিল আনোয়ারার ঝিওরী, হাজিগাঁও ও বটতলী গ্রামের মাঝখানে দেয়াঙ পাহাড়ে। পন্ডিতবিহারের আগে এবং পরবর্তীকালে অন্তত আঠার শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় না। পন্ডিতগণের অনুমান, সেকালে শিক্ষা গুরুগৃহ, বিহার ও মসজিদ কেন্দ্রীক ছিল বলে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সে সময় গড়ে ওঠে নি। ১৭৬১ সালে চট্টগ্রাম ইংরেজ অধিকারভূক্ত হলেও উনিশ শতকের প্রায়ভাগ পর্যন্ত পাঠশালা-চতুষ্পাঠী, মক্তব-মাদ্রাসা ও কেয়াং –বিহারই ছিল শিক্ষার সার্বজনীন মাধ্যম। এসব নবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যে-সব বই ব্যবহার করতেন সেগুলি হাতে লেকা বই আর পুথি। ইতিহাস বিচাওে দেখা যায় – ইংরেজী শিক্ষার প্রথম প্রবর্তন হয়েছিল অষ্টাদশ শতকে। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতে শিক্ষা প্রসারের জন্য একটি সনদ পাশ হয়। এই প্রথম সরকারি আইনের দ্বারা ভারতে শিক্ষার দায়িত্ব সম্পর্কে নীতি গ্রহণ করা হয়। তারপর থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরনই ধারাবাহিকতায় আনোয়ারা গ্রামের জমিদার রাজচন্দ্র সেন ১৮৯০ সালে আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। রামকৃষ্ণ মঠের স্বামী ‘পবিত্রানন্দ মহারাজ’ ছিলেন প্রথম প্রধান শিক্ষক। তৎকালীন অনগ্রসর কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামবাসীদের সজীব ও শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যই ছিল তাঁর এই মহৎ প্রচেষ্টা। আজকের আনোয়ারায় তখন কোন স্কুল ছিল না। গৃহস্থের বাড়ির আঙিনায় গুরু মহাশয়রা নিজেদের পাঠশালা চলাতো এবং ঐ গুরুমহাশয়ের নামেই চলত সেই সব পাঠাগার। অবস্থাপন্ন লোকেরা ছেলেদের চট্টগ্রাম শহর বা পটিয়ায় পাঠিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে ইংরেজি স্কুলে পড়াতেন। চাষা, গরিব কিংবা মধ্যবিত্তের ছেলেদের গ্রামে পড়ার কোন সুযোগ ছিল না। তৎকালে এখানে একটি মুন্সেফি আদালত ছিল, পরবর্তীতে ঐ আদালত পটিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। তৎস্থলে একটি রেজিস্ট্রি অফিস প্রতিষ্ঠিত হয় ইংরেজ আমলে। এই রেজিস্ট্র অফিসের পাশেই একটি পুলিশফাঁড়ি। ১৮৯০ সালের ৭ ডিসেম্বর ইংরেজ সরকার এক ফরমান জারি করে আনোয়ারা পুলিশফাঁড়িকে ‘আনোয়ারা থানা’য় রূপান্তর করেন। একই বছর রেজিস্ট্রী অফিসের পুকুর পাড়ে ছনের ছাউনির মাটির ঘর তৈরি করে জমিদার রাজচন্দ্র সেন আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুলের কার্যক্রম শুরু করেন। এক বছর পরেই ১৮৯১ সালে তিনি স্কুলের নিকটেই প্রথম পোস্ট অফিস স্থাপন করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় স্কুলের অদূরে আনোয়ারা যৌথ ব্যাংক। তারপর থেকে ধীরে ধীরে সরকারি অফিসগুলো প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।
জমিদার রাজচন্দ্র সেন চট্টগ্রাম কালেক্টরেটের নাজির পদে চাকরি করতেন।
তিনি ছিলেন আঠার শতকের কবি এবং ‘সারদামঙ্গল’ কাব্যের রচয়িতা মুক্তারাম সেনের জ্ঞাতি বংশধর। ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক রামকৃষ্ণ মঠের স্বামী পবিত্রানন্দ মহাশয় স্কুল থেকে বিদায় নিলে ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ খালি হয়ে যায়। জমিদার রাজচন্দ্র একজন বিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকের খোঁজ করছিলেন। ঐ সময়ে ‘সাপ্তাহিক জ্যোতি’ পত্রিকায় মধ্যযুগের পুঁথির পান্ডুলিপি সংগ্রহ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অজুহাতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কালেক্টরেট এর কেরানি পদ থেকে চাকরি হারায় আবদুল করিম। তাঁর এই দুঃসময়ে এগিয়ে আসেন কালেক্টরেটের নাজির রাজচন্দ্র সেন। কমিশনার কার্যালয়ে নাজির রাজচন্দ্র সেনের সাথে সেই অফিসে চাকরির সুবাদে আবদুল করিমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুলে শিক্ষকতার জন্য আহবান জানান। এ দুঃসময়ে রাজচন্দ্র সেনের আহব্বান উপেক্ষা করাও যায় না। আবার মনে দ্বিধাও জাগলো, দ্বিধার কারণ হলো প্রধান শিক্ষকের পদ না পেলে তিনি যোগদান করবেন না। তখনকার মৌলিক প্রথা অনুযায়ী হিন্দু প্রতিষ্ঠিত কেনো স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে নিযুক্তি পেতেন না কোনো মুসলিম শিক্ষক। তাছাড়া আনোয়ারা হিন্দুপ্রধান এলাকা। অনেক চিন্তার পর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সরিয়ে আবদুল করিম আনোয়ারা গ্রামে এলেন। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা রাজচন্দ্র সেন স্থানীয় গণ্যমান্যদের সাথে আলোচনা, তর্কবিতর্ক করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন আবদুল করিমকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেবেন। তিনি প্রধান শিক্ষকের নিযুক্তি পত্রই সরাসরি তুলে দিরেন আবদুল করিমের হাতে। আবদুল করিম আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। ১৮৯৯ সালের প্রথম দিকে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
আনোয়ারা স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় তিনি পার্শ্ববর্তী শিলাইগড়া গ্রামের থানাদার বাড়িতে থাকতেন এবং সেখান থেকে স্কুলে যাতায়াত করতেন। যাতায়াতের পথ সুগম ছিল না, পথঘাট বলতে কিছু ছিল না, মেঠোপথে রোদ বৃষ্টি মাথায় করে স্কুল করতেন, বিশেষ করে বর্ষকালে খাল বিল কাদার মধ্যে আসা যাওয়া করতে হতো। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক আবদুল করিম এবং স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা রাজচন্দ্র সেন উভয়ের চেষ্টা ছিল ঐ অঞ্চলের ছেলেরা যাতে শিক্ষিত হয়ে উঠে। তাদের উভয়ের চেষ্টায় গরিবদের ছেলেরাও লেখাপড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠে, যাদের সামর্থ ছিল না তাদের বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা হতো, এমন কি হেড মাস্টার তাঁর সামান্য বেতন থেকেও গরিব ছেলের বই খাতা দিতেন এবং মাসিক সাহায্যও করতেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সারদাচরণ চৌধুরী, শশী নন্দী, সুরেন্দ্র খাস্তগীর, সতীশচন্দ্র সেন, যোগেশচন্দ্র সেন, নিশিচন্দ্র ঘোষ ইত্যাদি পরবর্তী জীবনে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই শিক্ষক আবদুল করিমের দ্বারা অনুপ্রাণিত হন, কেউ কেউ আর্থিক সাহায্যও লাভ করেন। ড. আহমদ শরীফ এ বিষয়ে লেখেন : ‘আবদুল করিম ছিলেন স্নেহান্ধ ব্যক্তি। স্নেহভাজনের জন্যে তিনি হৃদয় মন অর্থ ঢেলে দিতেন। আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালে দুইজন স্থানীয় দরিদ্র সন্তান আজিজুর রহমান (আনোয়ারার শোলকাটা গ্রামবাসী) ও নিশিচন্দ্র ঘোষ (কবি জীবন্দ্রে কুমার দত্তের প্রতিবেশী আনোয়ারা গ্রামের) তাঁর এতই প্রিয় ছিলেন যে তিনি চট্টগ্রাম শহরে ইন্সপেক্টর অফিসে কেরানি হয়ে আসার পরেও তাঁদের বিদ্যালয়ের ব্যয় স্বেচ্ছায় বহন করে প্রথমজনকে এন্ট্রান্স পাস করিয়ে তাঁর নিজের অফিসে কেরানি পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন এবং নিশি ঘোষও তাঁর অর্থেই বি.এ. পাস করে সীতাকুণ্ড উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে সুদীর্ঘকাল প্রদান শিক্ষক থেকে অবসর গ্রহণ করেন।” পরবর্তীতে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ শিলাইগড়া গ্রাম ত্যাগ কওে শোলকাটা গ্রামের আজিজুর রহমান কেরানীর বাড়িতেই থাকতেন। উপরে যে নিশিচন্দ্র ঘোষকে আবদুল করিমের সাহায্যের কথা বলা হয়েছে, সেই নিশি ছিলেন আনোয়ারা গ্রামের ছেলে, তাঁর বাবা ছিলেন অতি দরিদ্র, ঘরামির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি
কোনোদিন ভাবতে পারেননি যে তাঁর ছেলে নিশি স্কুলে পড়াশুনা করবে। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি নিশির আগ্রহ দেখে আবদুল করিম স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তাকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে স্কুলে এবং পরে বিএ. পর্যন্ত পড়ান। তিনি নিশিকে হাইস্কুলের চাকুরি পেতেও সাহায্য করেন। এই নিশিচন্দ্র পরে বি.টি.ও পাস করেন এবং এফিডেবিট করে দে পদবি পরিবর্তন করে ঘোষ পদবি গ্রহণ করেন। আনোয়ারা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা রাজচন্দ্র সেনের ছেলে সঞ্জীবচন্দ্র সেন আবদুল করিমের প্রত্যক্ষ ছাত্র ছিলেন না, তবুও আদর্শ শিক্ষক রূপে আবদুল করিমের জনপ্রিয়তার কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন “তাঁর জ্ঞানস্পৃহা, আচার-আচরণ অমায়িক ব্যবহার, দেবদুর্লভ চরিত্র অতি অল্পদিনের মধ্যেই তাঁকে আনোয়ারা ও পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসী সকলেরই শ্রদ্ধার পাত্র করে তোলে। তিনি তাঁর ছাত্রদের নিজের সন্তানের মতই জ্ঞান করতেন ও আদর ভালোবাসয় ঘিরে রাখতেন। বিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়ার পরেও ছাত্রদের সাথে সেই মধুর সম্পর্ক অটুট ছিল। আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম না কিন্তু বড় হয়ে যখন আমি চট্টগ্রাম শহরে পড়তে আসি তখন তাঁর সেই অকৃত্রিম ছাত্রপ্রীতি ও ভালবাসা দেখেছি। তাঁর বাসায় তাদের সঙ্গে আমিও চিড়েমুড়ি জলপান খেয়েছি।”

আবদুল করিমের জীবনের মোড় ঘুড়িয়ে দিলেন
আনোয়ারা মধ্য ইংরেজী স্কুল

বলা যায় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেই আবদুল করিমের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি আবদুল করিম লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করলেন, সাথে সাথে অসামান্য সাফল্য অর্জন করলেনা পুঁথি সংগ্রহের মত এক দুঃসাধ্য কাজেও। আনোয়ারা থেকে তিনি অসংখ্য পুঁথি সংগ্রহ করেছিলেন। এমনকি মহাকবি আলাওলের বিখ্যাত সেই ‘পদ্মাবতি’ পুঁথিটিও তিনি আনোয়ারার ডুমুরিয়া গ্রাম থেকে সংগ্রহ করেছিলেন, এটিই তার সংগৃহীত পুথিসমূহের প্রথম সংগ্রহ নিদর্শন। আবদুল করিম নিজেই স্বীকার করেছেন আনোয়ারা স্কুলের শিক্ষকতার কালই তাঁর পুথি সংগ্রহ ও লেখক হিসেবে পরিচিত হওয়ার স্বর্ণযুগ বলে। ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তিনি আনোয়ারা মধ্য ইংরেজী স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্টার সাথে। ড. মোঃ এনামুল হক আবদুল করিমের জীবনে আনোয়ারা স্কুলে শিক্ষকতার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,
‘The years (1899-1905) spent at Anwara, Chittagong. were the most fruitful and significant period of Abdul Karim’s life. At least, he regarded it as such and fondly pined for it as long as he was alive. In a sense, this was partially true : the period afforded him opportunity (i) to lay the foundation of a personal library of old manuscripts collected from the locality and the places around, (ii) to enrich him by reading all sorts of books both text and non-text, available in the library of the school, (iii) to learn the technique of editing old manuscripts of Middle Bengali literature, and (IV) to establish himself as a research scholar and a writer of informative articles.”

আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ১৯০৫ সালে আনোয়ারা স্কুল থেকে বিদায় নেয়ার পর ইন্সপেক্টর অব স্কুল্স অফিসে কেরানি পদে নিযুক্ত হন। রামচন্দ্র সেন সাময়িক ভেঙে পড়লেও তিনি থেমে থাকেননি। ১৯০৬ সালে এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে স্কুলটি দৈন্যদশায় পতিত হয়। এ দুঃসময়ে স্কুল পরিচালনায় এগিয়ে আসেন তৈলারদ্বীপ গ্রামের প্রখ্যাত জমিদার এরশাদ আলী সরকার। তিনি পুনরায় মাটির দালান নির্মাণ করে দেন এবং স্কুলের উন্নয়নে সাড়ে ছয় একর জমি জেলা বোর্ডের মাধ্যমে স্কুলের নামে দান করে দেন। উচ্চবিদ্যায় পর্যায়ে উন্নয়নে প্রচেষ্ঠা শুরু করেন। পরবর্তীতে জমিদার এরশাদ আলী সরকার হাই স্কুলের ভবন নির্মাণে হাত দেন, এ সমযে স্কুলের নতুন নামকরণ করা হয় ‘আনোয়ারা রাজচন্দ্র-এরশাদ আলী মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়’। কলিকাতা শিক্ষাবোর্ড থেকে উচ্চ-বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভের আবেদন করা হয়। কিন্তু আপত্তি ওঠে কোন ব্যক্তির নামে হলে স্বীকৃতি দেয়া হবে না। তখন স্কুলের আবারো নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘আনোয়ারা আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়’। ফলে অনেক কাটখড় পুড়িয়ে ১৯১৪ সালে বিদ্যালয়টি উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হল। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন আদ্যনাথ চক্রবর্তী। কিন্তু দুর্ভাগ্য ঐ বছর জমিদার রাজচন্দ্র সেন প্রয়াত হন এবং এর কিছুদিন পর ১৯১৫ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি জমিদার এরশাদ আলী সরকারও পরলোক গমন করেন। প্রধান শিক্ষক অদ্যনাথ চক্রবর্তী বিদায় নেয়ার পর প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তারানাথ দে। তার পরবর্তীতে নকুল চন্দ্র নাগ দীর্ঘ সময় ধরে উক্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবং ১৯৬৩ সালে তিনি স্কুল থেকে বিদায় নেন।
তার প্রশংসা এখনো আনোয়ারা থানায় কিংবদন্তীর ইতিহাস হয়ে আছে। তার পরেই নিশীঘোষ, শামশুদ্দিন আহমদ, নুরুদ্দীন আহামদ, আবদুল মোতালেব, সৈয়দ আহমদ চৌধুরী, অজিত বিকাশ দাশ, মোহাম্মদ ইসহাক প্রমুখ প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পারন করেন। প্রয়াত উকিল আবদুল জলিল চৌধুরী ও যোগেশ চন্দ্র সেন এবং এডভোকেট ফজল করিম পরিচালনা কমিটির সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
আনোয়ারা গ্রামের জমিদার রাজচন্দ্র সেন স্কুল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নে অসমান্য অবদান রেখে গেছেন। আনোয়ারা গ্রাম হতে তখনকার দিনে চট্টগ্রাম শহরে যেতে হলে কৈনপুরা পেশকার হাট পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ মাইল পথ পায়ে হেঁটে যেতে হত। সড়ক বলতেই ছিলনা। খাল, নালা, কর্দমাক্ত দীর্ঘপথ সীমাহীন কষ্টে পেরিয়ে পেশকার হাট থেকে সাম্পানে শহরে যাতায়াত ব্যতিত অন্য কোন উপায় ছিল না। জনশ্রুতি আছে যে, তিনি স্কুল সংলগ্ন ইছামতি খালটি ভরাট হয়ে গেলে খালটি নয়া রাস্তার মোড় পর্যন্ত পুনঃখনন করে দেন। বাসন্তী পূজার সময় অশোকাস্টমীর দিন এই ইছামতি খালে ম্লান করে অশোককলির জলপান করে সকলে ইছামতি দেবীর পুজা দিত। পূণ্যাথীদের সুবিধার্থে ইছামতি ঘাট পর্যন্ত একটি সড়কও নিমাণ করেছিলেন তিনি। এই রাস্তা ও খাল তৈরি করতে গিয়ে অনেক চাষীর জমিও সাধারণ লোকের ঘরবাড়ির ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তিনি তাদেরও ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন। জমি ক্ষতি হয়েছিল সে রকম ১০০ জন গরীব চাষীকে তিনি জনপ্রতি ১ খানা সাম্পান কিনে দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে প্রতি বছর দুর্গা পূজার মহাষ্টমীদিনে এই মাঝিরা প্রত্যেকে কাঁধে একজোড়া করে নারিকেল ঝুলিয়ে ঢোল বাজিয়ে এসে হাজির হত রাজচন্দ্র সেনের বাড়িতে। কথিত আছে শিক্ষার সম্প্রসারণ ও এলাকার উন্নয়নে অকাতরে অর্থ ব্যয় করতেন, তা যোগাবার জন্যে তিনি মহেশখালী দ্বীপের নিজের জমিদারী প্রজা হাজি মুহাম্মদ ও তাঁর ছোট ভাইয়ের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তৎকালে এলাকার উন্নয়নের জমিদারী খোয়ানোর মত এ এক বিরল ঘটনা। শেষ জীবনে তিনি তীর্থস্থান সীতাকুন্ডে বাড়ি তৈরি করেই বসবাস করতেন, সেখানেও তিনি অনেক জনহিতকর কাজ করেছেন। ১৯১৪ সালের শেষদিকে তিনি সেখানেই প্রয়াত হন। তাঁর সহধর্মীনি ছিলেন প্রাণকিশোরী দেবী। পিতার নাম কাশীমোহন সেন, মাতার নাম বাঁশি দেবী। কাঁশী-বাশী এও এক অদ্ভুত মিল। এবং তাঁরই প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির বয়স এখন ১২৮ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররা শতবর্ষ উদযাপনে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অচিরেই
তা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।