আনন্দময়ীর আগমনে

রতন চৌধুরী

5

দিন-সপ্তাহ-মাস-বছর পেরিয়ে আবারও ফিরে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের শুভদিন সনাতনী বিশ্ববাসীর মহোৎসবের দিন শারদীয়া দুর্গোৎসব। এবার মা-আসছেন তাঁর সন্তানদের নিয়ে পিতৃগৃহে ঘটক বা ঘোড়ায় চেপে আর পিতৃগৃহ ত্যাগ করবেন দোলা বা পালকি চড়ে। হয়ত ধরনী এবার একটু নাড়া দিয়ে উঠবে মায়ের আগমনে। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত এই ছয় দিন বিশ্বের সমগ্র সনাতনী সমাজে পড়বে সাজসাজ রব ও আনন্দ-উল্লাসে পরম করুণাময়ী জগৎ জননীর আগমনে দুর্গা দুর্গতি-নাশিনী মা আসেন পৃথিবীতে কল্যাণ শান্তি-সুখ ও সমৃদ্ধি নিয়ে। শরতের সুনীল আকাশ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি খেলা, সাদা কাশবনে বাউল বাতাস, এ শরতে মা আসেন, মা আমার আদ্যাশক্তি মহামায়া দুর্গতি নাশিনী দেবী দুর্গা- জগৎ তাঁরই মায়ায় আবদ্ধ যখনই ভক্ত বিপদে পড়ে মাকে ডাকে, তিনি সাড়া দেন, শক্তি দেন, ভক্ত ত্রাণ পায় বিপদ থেকে। দেবী দুর্গা শক্তি ও শান্তি দুরূপেই প্রকাশিত। এ থেকে আমরা শিক্ষা পাই, আমরা যখন কোন সংকটে নিপতিত হই, তখন হতাশার
গ্লানিতে নিষ্ক্রিয় থাকব না, আমরা গ্রহণ করব সক্রিয় উদ্যোগ। আমরা আমাদের ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করব নিরন্তর সাধনার অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। আমরা ঐক্যবদ্ধ হব। আমরা সংহত হওয়ার পর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সকলে নিয়োজিত থেকে সেই সংকটের মোকাবিলায়। অবশ্যই আমাদের বিজয় হবে। ফল হিসেবে আমরা পাব শান্তি। শ্রী শ্রী চন্ডিতে বলা হয়েছে ব্রহ্মার বরে বলিয়ান হয়ে মহিষাসুর নামক এক অসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য দখল করে। দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন, স্বর্গরাজ ইন্দ্রসহ সব দেবতারা মিলিত হয়ে ব্রহ্মা ও শিবের কাছে যান। তারপর ব্রহ্মার পরামর্শে সবাই মিলে বিষ্ণুর কাছে গিয়ে মহিষাসুরের অত্যাচারের কাহিনী বর্ণনা করেন। মহিষাসুরের অত্যাচারের কাহিনী শুনে সব দেবতারা ক্ষুব্ধ হন। তখন তাদের শরীর থেকে তেজ বেরোতে থাকে। সব দেবতার তেজ একত্র হয়ে এক তেজোপুঞ্জের সৃষ্টি হয়। অতঃপর সেই তেজপুঞ্জ অপরূপা নারীর রূপ নেয়। এই নারীই দেবী দুর্গা। দেবী দুর্গার দশ হাত- তাঁর দশ হাত বলেই তাকে দশভূজা বলা হয়। তাঁর তিনটি চোখ- এজন্য তাকের ত্রিনয়না বলা হয়। তাঁর বাম চোখ চন্দ্র, ডান চোখ সূর্য এবং কপালের উপর অবস্থিত চোখকে জ্ঞান চোখ বলা হয়। তাঁর দশটি হাতে দশটি অস্ত্র রয়েছে যা শক্তির প্রতীক। সব চেয়ে শক্তিধর প্রাণী সিংহ তাঁর বাহন। দেবী হিসাবে দুর্গার গায়ের রং অতসী ফুলের মতো সোনালি হলুদ। তিনি তাঁর দশ হাত দিয়ে দশদিক থেকে অকল্যাণ দূর করেন এবং তাঁর ভক্ত সমাজের কল্যাণ করেন। দেবী দুর্গার ডান দিকের পাঁচ হাতের অস্ত্রগুলো যথাক্রমে ত্রিশুল খড়গ চক্র বান ও শক্তি নামক অস্ত্র, দিকের পাঁচ হাতের অস্ত্রগুলো যথাক্রমে শঙ্খ, ঢোল, ঘণ্টা, অঙ্ক্রুশ ও পাশ। এসব অস্ত্র দেবী দুর্গার অসীম শক্তিগুলোর প্রতীক। বছরে দুই বার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। শরৎকাল ও বসন্তকালে। শরৎকালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজাকে শারদীয় দুর্গাপূজা বলা হয়। বসন্ত কালে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজাকে বাসন্তী দুর্গাপূজা বলা হয়। তবে শারদীয় দুর্গাপূজা প্রসিদ্ধ আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। এ পূজা সনাতনী অর্থাৎ হিন্দুদের সবচেয়ে বড় পূজা। এ পূজা এখন রাষ্ট্রীয় পূজায় পরিণত হয়েছে। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে প্রথম সরস্বতী পূজার মাধ্যমে বিকাশ চক্রবর্তী, রতন ভট্টাচার্য ও পিন্টু ঘোষের উৎসাহে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রথম পূজা অর্ঘ শুরু হয়েছিল জেএমসেন হলে। ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রামে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানষপুত্র ও কিংবদন্তি জননেতা সদ্য প্রয়াত সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপনে গোড়াপত্তন করেন। ঐ সময় প্রয়াত বিল্ল মঙ্গল দাশ সাধারণ সম্পাদক ও প্রয়াত শান্তি পদ সেন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে পূজা উদযাপন কমিটির দায়িত্ব পালন করেন। তখন এই উদ্যোগের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন নারায়ন চন্দ্র পাল, অমূল্য চৌধুরী, কানু লাল নাথ, হারাধন আচার্য, ঝুলন কুমার দাশ, আশুতোষ চৌধুরী, সুজিত সিংহ গনেষ ও প্রিয়তোষ চক্রবর্তী সাপ্পি সহ নাম না জানা আরো অনেকে। তাঁদের এ কৃতির কথা আমরা আজীবন স্মরণে রাখবো। স্মরণে রাখবো সাবেক মেয়রদেরও যারা আমাদের এ পূজাকে চট্টগ্রামে শ্রেষ্ঠতম পূজায় পরিণত করেছেন। বর্তমানে এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম নগরীর অভিভাবক মেয়র আলহাজ আ জ ম নাছির উদ্দীন তিনি একজন বিশাল মনের মানুষ হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে সনাতনি ধর্মাবলম্বীদের বিশাল আয়োজনে শারদীয়া দুর্গোৎসবে প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি চট্টগ্রাম নগরীতে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম নগরীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব ও প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। মায়ের আগমনীতে নগরপিতা আ জ ম নাছির উদ্দীনকে প্রনতি জানাই।

লেখক : আলোকচিত্রী