আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের পরিবর্তন

তুষার আবদুল্লাহ

34

একজন ছাত্রের কাছে সব থেকে শ্রদ্ধাভাজন তার শিক্ষক। এই শিক্ষকের হাতেই গড়ে ওঠে তার সকল নৈতিক মূল্যবোধের কাঠামো। সফল ও সুন্দর ভবিষ্যতের কারিগর এই শিক্ষক। কখনো কখোন সবকিছু ছাপিয়ে একজন শিক্ষক হয়ে উঠেন আদর্শের মাইলফলক। শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি কর্ম জীবনেও থেকে যায় এই আদর্শের ছাপ। সঠিক আদেশ, উপদেশ আর স্নেহময় ভালোবাসা দিয়ে একজন ছাত্রের জীবনকে সফলতার দিকে অনেক ধাপ এগিয়ে দেন শিক্ষক। ঠিক একইভাবে ছাত্রারাও শিক্ষকদের স্থান দেন পিতার আসনে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আমাদের দেশের শিক্ষকরা অনেক বেশি মর্যাদা এবং সম্মান পেয়ে থাকেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সুসর্ম্পক বাড়িয়ে দেয় শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ। শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে তৈরি হয় সেতু বন্ধন। কিন্তু অনেক সময় আমরা এর ব্যতিক্রমও দেখতে পাই। আধুনিক সংস্কৃতির ছোঁয়ায় একদিকে যেমন জীবন ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন তেমনি শিক্ষার্থী -শিক্ষকের সর্ম্পকেও এসেছে নতুন মাত্রা। শ্রেণীকক্ষের বাইরে এখন আর শিক্ষার্থী-শিক্ষকের মাঝে তেমন সুসর্ম্পক ল্যক্ষ করা যায় না। পুঁজিবাদি এই অর্থনৈতিক জীবনে বেড়েছে চাহিদা, যা জন্ম দিয়েছে বহুমুখী ব্যবসার।আজ শিক্ষকরা ছুটছেন টাকার পেছনে আর ছাত্র শিক্ষকের সর্ম্পক নির্ধারীত হচ্ছে অর্থের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। যেখানে সামাজিক কাঠামো একটি মধ্যবিত্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। যোগানের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে চাহিদা। অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর কুসংস্ককার আকড়ে আছে প্রত্যেকটা সমাজ ব্যবস্থার শিকড়ে। যেখানে প্রায় অর্ধেক জনগনই সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত এবং প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোক নিরক্ষর। আর এমন একটা দেশের সমাজ ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করতে এবং সামাজিক উন্নয়নকে তরান্নিত্ব করতে একজন শিক্ষকের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক বছের আগেও আমরা এমন কিছু শিক্ষক পেয়েছি যারা শিক্ষকতার পাশাপাশি অনেক সমাজসেবামূলক কর্মকান্ডে জরিত ছিলেন। বিনামূল্যে পাঠদান, নিজ উদ্যোগে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রমধর্মী বিনোদনের ব্যবস্থা ইত্যাদি ছিল তাদের নেশা। পাশাপাশি সমাজ সংস্কারেও তাঁরা নানা কার্যক্রম হাতে নিতেন।কিন্তু বর্তমানে তা শুধুই খবরের কাগজে কালে ভদ্রে পাওয়া যায়। শিক্ষকদের মানসিকতার যে পরিবর্তন আসছে তা আমরা সহজেই উপলদ্ধ্বি করতে পারছি।
আমি মনে করি, একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে একমাত্র বিনিময়ের মাধ্যম হচ্ছে জ্ঞান। একটা সময় ছিল যখন শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছাকাছি থেকে শুধুই জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করত। আজ শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন। শিক্ষকদের চিাহিদা এখন আর্থিক মুক্তি আর শিক্ষার্থীর চাহিদা কিছু সার্টিফিকেটস। শিক্ষা আজ কোচিং ব্যবসার খাচায় বন্দী। শিক্ষকরা জিম্মী পুঁজিবাদি অথর্নীতির কাছে।
আধুনকি সভ্যতার বদৌলতে সামাজিক সর্ম্পকের পরিধি বিস্তৃত হলেও পালটাচ্ছে সর্ম্পকের ধরন।শিক্ষার্থী শিক্ষকের সর্ম্পক আর সেই জায়গায় নেই। অতি-আধুনিকতা কেড়ে নিয়েছে নৈতিক মূল্যবোধ উপহার দিয়েছে এক বহুমাত্রিক সর্ম্পকের বলয়। যেখানে শিক্ষকরা আজ সকল নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে শোষণ করছেন শিক্ষার্থীদের। এ শোষণ কখনো আর্থিক, কখনো মানসিক আবার কখনো শারীরিক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে যৌন হয়রানি ও যৌন প্রতারনামূলক কর্মকান্ড। প্রায় প্রতিদিনিই খবরের শিরোনাম হচ্ছে নানা অপ্রতিকর ঘটনা। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে খেলা করছেন বিদ্বান রুপী দুর্জনরা। ভাল ফলাফলের আশায় কখনোবা প্রেমের নেশায় এ সব ফাদে পা দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
শুধু তাই নয়, মানুষ গড়ার কারিগররা জড়িয়ে পরছেন নানা রকম দূর্নীতি, অনিয়ম আর অন্যায়ের সাথে। নৈতিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধের পরিবর্তে তারা বেছে নিয়েছেন ক্ষমতার আধিপত্যকে। নিজেদের যুক্ত করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘঠনের সথে। সস্তার বাজারে বিকিয়ে দিচ্ছেন সকল নীতি-নৈতিকতা। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলার পরিবর্তে নিজেরাই জরাচ্ছেন নানা বিতর্কে। এর কালোছায়া পড়েছে সমগ্র শিক্ষা পদ্ধতির উপর যা তীলে তীলে সংক্রমিত হয়ে অসুস্থ করে তুলছে গোটা সমাজকে। শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষক, শিক্ষাথী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবগ কেউই রেহাই পাচ্ছেন না সমালোচনার তীর থেকে। কেউ কেউ সমগ্র শিক্ষা পদ্ধতিকে পরিবর্তন করার কথা বলছেন, কেউ আবার ঢেলে সাজানোর পক্ষে। কিন্তু আদৌতে কোন সমাধান আসবে কিনা আমার জানে নেই। যেখানে সমস্যা, সেখানেই সমাধনটা খুজতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ কে জাগিয়ে তুলতে হবে, আনতে হবে মানসিকতায় পরিবর্তন, সমাজে সুচিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে। এ উদ্যেগ শিক্ষকদেরই নিতে হবে।
এই চলমান ত্রুটির্পূণ অবস্থা যদি র্দীঘ সময় ধরে চলতে থাকে তাহলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বংস অনির্বায। যার প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থীদের উপর যারা আগামী দিনের কর্নদার। যাদের হাতে আগামীর সম্ভাবনা তাদের যদি সঠিক পথের সন্ধান দিতে না পারি তাহলে আমাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হবে। ভেঙ্গে পরবে সামাজিক কাঠামো যার সূদুঢ় প্রসারি প্রভাব জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রযাত্রা টেনে ধরবে।
এখান থেকে উত্তরণ পেতে চাইলে, শিক্ষক সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষকরাই মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে সমাদৃত, সুতরাং তারাই পারবেন শিক্ষার্থীর মনের সকল অশুভ চিন্তা দূর করে সমাজকে সুন্দর পথে পরিচালিত করতে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ম অনুযায়ী যেহেতু ছাত্র ছাত্রীরা দিনের অধিকাংশ সময়ই স্কুল, কলেজ, কোচিং এ থাকে, সেহেতু তাদের মানসিক বিকাশে বড় অবদান রাখার সুযোগ পান এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। আমি কোচিং ব্যবস্থার বিপক্ষে নই। কেননা জ্ঞান অর্জনের কোন সীমানা নেই। কোচিং, প্রাইভেট টিউশন থেকে শিক্ষার্থীরা যদি কিছু শিখতে পারে তবে মন্দ কি। এ ক্ষেত্রে কোচিংগুলোকে বেশি সতক ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জন ও মূল্যবোধ বিকাশে আরও সচেষ্ট হতে হবে।
শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে আমাদের সমাজে পিতা মাতার পরেই তাদের অবস্থান। একজন ধর্মীয় নেতার মতই আমরা শিক্ষদের আদেশ নির্দেশ মেনে চলি। তাই সকল প্রকারের লোভ লালসা পরিত্যাগ করে সমাজকে সুন্দর ও সত্যের দিকে পরিচালিত করতে হবে। নিজের নৈতিক চরিত্রকে সত রাখার পাশাপাশি ছাত্র ছাত্রীদের সুন্দর আখলাক গঠনে শিক্ষকরাই মূখ্য ভূমিকা পালন করতে পারেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে শিক্ষার্থীরাও গুরুত্বর্পূণ আবদান রাখতে পারে। তাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, আমাদের সংস্কৃতি ঐতিহ্যমন্ডিত, পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে গ্রহন করার মাঝে গৌরবের কিছু নেই। পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ প্রদর্শনের মাধ্যমেই আমরা সফল ও গৌরবময় ভবিষ্যৎ গঠন করতে পারবো। ছাত্র ছাত্রীরা যদি তাদের অধ্যবসায় ও কঠোর সাধনার সাথে শিক্ষকদের সঠিক দিক নির্দেশনার সমন্বয় ঘটাতে পারে তাহলেই কেবল তাদের ছাত্রজীবন সার্থক হবে। এক্ষেত্রে অবিভাবকদের মাথায় রাখতে হবে, শুধু একাডেমিক সার্টিফিকেটস কখনোই সফলতার মাপকাঠি হতে পারে না। একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় অর্জন তার জ্ঞান। শিক্ষকদের প্রতি অধিক শ্রদ্ধাশীল হওয়ার দিক্ষাও পরিবার থেকেই দিতে হবে।
সর্বপরি এই সকল উদ্যোগকে একটা নির্দিষ্ট কাঠমোর মধ্যে নিয়ে এসে এমন এক শিক্ষা পদ্ধতি প্রনয়ন করতে হবে যা আধুনিক বিশ্বের কাছে রোল মডেল হয়ে থাকবে। এ ব্যাপারে সরকারকে তার শিক্ষানীতি গ্রহন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষা জাতীর মেরুদন্ড, এই মেরুদন্ডকে সমুন্নত রাখতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে শৃজনশীল, জ্ঞানমূলক এবং সকল প্রকার অনিয়মের উর্ধ্বে। তবেই কেবল শিক্ষক শিক্ষার্থীর সর্ম্পককে পুঁজিবাদি শোষনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব।