আত্মহত্যা কখনো প্রতিবাদের ভাষা নয়

চন্দন কুমার বড়ুয়া

28

‘আত্মহত্যা’ একটি ভয়ঙ্কর ও বেদনাদায়ক শব্দের নাম। আত্মহত্যা বা ঝঁরপরফব মানে নিজেকে নিজে খুন করা। ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বিশে^ গড়ে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করেন। সে হিসাবে প্রতিদিন ২১৬০ জন মানুষ অসময়ে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ জন বছরে প্রায় ১২ হাজার ৮শ মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বিশে^ ৪০ লাখ টিনএজার বিভিন্ন কারণে আত্মহননের প্রচেষ্টা চালায়। তাতে প্রায় একলাখ সফল হয়ে অকালে পরাপারে চলে যান। ফলে প্রিয়জনের আত্মহত্যার যন্ত্রণার পেরেক বুকে নিয়ে ৬০ লাখেরও বেশি স্বজন ধুকে ধুকে জীবন অতিবাহিত করে। এটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক সামাজিক সমস্যা।
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশেও দিন দিন আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক’দিন পূর্বে এইচ এস সি’তে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় রাউজানে প্রিয়া দে নামক এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়। গেল বছরে ঢাকার ভিকারুন্নেসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী চোখের সামনে পিতাকে অসম্মানের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেকে বলিদান দেন। আর চট্টগ্রামে ডা. আকাশ পেশায় একজন চিকিৎসক হয়েও অতিরিক্ত মানসিক চাপে ঠিকে থাকতে না পেরে নিজেকে ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তে নিয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মাহুতি দিলেন। এতেই প্রতীয়মান হয় যে প্রতিটি মানুষই কোন কোন সময় চরম ভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, আবেগীয় চাপে ঠিকতে পারে না। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই বেদনাদায়ক সংবাদটি সবার নজর কাড়ে। আহারে বেচারা —- বলে দীর্ঘ নিশ^াস ছেড়ে তার স্বজনের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন ব্যতীত কিছুই করার থাকে না। আদৌ কি কিছু করার নেই ? অবশ্যই অনেক করনীয় আমাদের রয়েছে যেন কোন প্রিয়জনই অকালে হারিয়ে না যায়।
এবার দেখা যাক কেনই বা মানুষ এই চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হন- সাধারণত অন্যায় অপবাদ, অসম্মান চরম পর্যায়ের তিরস্কার, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পাওয়া, অবহেলা, ইভটিজিং, যৌন উৎপীড়নসহ ইত্যাদি কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা নিজের পূর্ব পরিকল্পিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। অতিরিক্ত উত্তেজনা, তাড়নায় ইমপালসিভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ভুক্তভোগী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া প্রেমে অসফল, পছন্দের পাত্র/পাত্রীকে না পাওয়া, যৌতুক, নারী নির্যাতন, প্ররোচনার কারণেও আত্মহত্যা সংগঠিত হয়। পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, সামান্য ইস্যুতে মা-বাবার সাথে অভিমান, এমনকি পছন্দের বিষয়ে ও কলেজে ভর্তি হতে না পেরেও টিনএজদের আত্মহত্যা করার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়।
ইদানীং পরিবার কর্তৃক সন্তানদের উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার ফলে লেখাপড়ার চাপ সন্তানদের মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তান লেখাপড়ায় কতটা পারঙ্গম, তার বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পরিবেশ কতটুকু ইতিবাচক, লেখাপড়ার পাশাপাশি সন্তান খেলাধুলা-বিনোদনের সময় পাচ্ছে কি না তা না দেখে বাবা-মায়ের চাহিদা আমার সন্তানের এপ্লাস চাই চাই। এই ধরনের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিয়ে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে পরে পরিবার ও শিক্ষকদের কটুক্তির-তিরস্কারের মুখোমুখি হন। এর ফলেও অনেক সময় শিক্ষার্থীকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। অথচ আমাদের সন্তানদের জানা উচিত বিশ^খ্যাত বিজ্ঞানী নিউটন, আইনস্টাইন, আব্রাহাম নিংকন, বিল গেটস, বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী কাগজ কলমের পরীক্ষায় পাস করেননি। এমনকি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল তো কলেজে পড়ার সুযোগও পাননি। অথচ তার লেখা কবিতা কলেজ-বিশ^ বিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে। আবার অনেকে কলেজে ভর্তি হয়েও পাস করতে পারেন নাই যেমন বিল গেটস। আরো আশ্চর্যের বিষয় যে, পদার্থ বিজ্ঞানের বরপুত্র আলবার্ট আইনস্টাইন এন্ট্রাস এসএসসি পাস করেছিলেন তিনবার পরীক্ষা দেবার পর। সুতরাং কোন এক লক্ষ্যে পোঁছতে না পারা মানে জীবনে হেরে যাওয়া নয়, প্রতিটি শেষের মুহুর্তে নতুন করে শুরু করা দরকার। এই মনীষীদের জীবনী আমাদের শিক্ষার্থীদের বেশি করে জানানো প্রয়োজন। এতে তাদের আত্মবিশ^াস আর মনোবল দুটোই বাড়বে।
সমাজের ঋণগ্রস্ত তৃণমূল মানুষের সংখ্যাও কম নয়। সমাজের বিত্তশালীদের কাছে কোটি কোটি টাকা ঋণ থাকলেও তাদের আত্মমর্যাদার হানি ঘটে না। অথচ ক্ষুদ্রঋণ হলেও সমাজের নিকট নানান হেয় পতিপন্ন হবার আশঙ্কা তার নিকট অনেক বড়। অতিরিক্ত ঋণের বোঝা বইতে না পেরে এলাকা ত্যাগকারীর সংখ্যা অনেক। উপায়ন্তর না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে চায় অসহায় ঋণী। বর্তমান সমাজে ধনী গরিব নির্ণয়ের নির্দেশক বড়ই অসম। কোটি কোটি সরকারি টাকা আত্মসাতের পরও কোন শাস্তি তার শরীরের উপর দিয়ে যায় না। কারণ তারা সমাজের উঁচু তলার মানুষ। অথচ পেটের দায়ে সামান্য মোবাইল চুরির ঘটনায় গণপিটুনিতে জায়গাতেই প্রাণ যায় সমাজের সবচেয়ে নিচু শ্রেণির মানুষটির।
শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও নারীরা অনেক সময় আত্মহননের পথ বেছে নেয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপড়েন, পরস্পরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ^াস, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি, প্রতিপক্ষের প্ররোচনায়ও বিবাহিতদের জীবনে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে বিবাহ পরবর্তী অবস্থা ও শ^শুরবাড়ির পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে কিছু পরিবারের সংস্কৃতি এমন যে, নিজের মেয়ে যেন স্বামীকে নিয়ে আলাদা থাকে, আর ছেলে বউ নিয়ে আলাদা থাকলে সব বউয়ের দোষ। নিজের ছেলে মেয়ের অসংখ্য ত্রæটি মার্জনীয় হলেও বউয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমার অযোগ্য এই মানসিকতা সেকাল থেকে একাল এখনো সমান আছে। এই সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে প্রিয়জনকে আমরা হারাতেই থাকবো বৈকি।
কিশোর-কিশোরী বয়সে আত্মহত্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কেননা এই সময়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সাধিত হয়। নিজের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়,আবেগীক চাপ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। কোন কিছুতেই তারা ধৈর্য ধারণ করতে পারে না। নিজেকে সবসময় হিরোহিক ভাবতে ভালবাসে। সে যেই সিদ্ধান্ত নেয় তাই সঠিক বলে মনে করে। কেউ তার যৌক্তিক বিরোধিতা করলেও তার কাছে প্রতিপক্ষের মতো বোধ হয়। এসময়ে নিজের প্রিয়জন এমনকি বাবা-মা, ভাই-বোনের কাছেও নিজের বিষয়ে গোপন রেখে চলতে চায়। বয়সের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কখন ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয় কেউ টের পায় না। তাই এই বয়সে আত্মহত্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সুতরাং কিশোর-কিশোরী বয়সে পরিবারের বাবা-মা, অভিভাবক কিংবা যতœকারীদের অবশ্যই বেশি বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তার আবেগকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করুন। দ্বিমত পোষণ করার ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প অপশন উপস্থাপন করুন। সে যাতে বুঝতে পারে আপনি কখনো তার প্রতিপক্ষ নন। তবেই সে আপনাকে বিশ^স্থ প্রিয়জনের একজন ভাববে। সতর্ক থাকা দরকার সহপাঠির সাথে কখন মিশছে, স্কুল-কলেজে যাবার নাম করে বন্ধুদের সাথে অন্য কোথাও যাচ্ছে কি না। সে যা বলছে তা কতটা সঠিক কিংবা আপনাকে কতটা বিশ^স্থ মনে করছে বিষয়গুলো সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। আবার এমন কোন আচরণ করা যাবে না যাতে সে মনে করে আপনি সবসময় তাকে সন্দেহ-অবিশ^াস করছেন। মা-বাবাকে কিশোর-কিশোরী ছেলে-মেয়েদের সাথে বন্ধুর মত, সহপাঠির মতবিশ^স্থ সঙ্গী হিসাবে চলতে হবে। সন্তানদের সাথে এমন বিশ^স্থ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে যে, সে স্কুল-কলেজের সহপাঠি ছেলে বন্ধুটির নিছক দুষ্টুমী কিংবা কোন অফারের কথাও যাতে আপনাকে নির্দ্বিধায় নিঃসংকোচে বলতে পারে। এছাড়া কেউ যদি কখনো কথার ছলে বলে থাকেন, “এই না হলে আমি আত্মহত্যা করব, কিংবা তাকে না পেলে আমি নিজেকে শেষ করে ফেলবো” অনুরূপ সংলাপ বলতে শোনা যায়, তবে সেসব মানুষদের প্রতি আরো সতর্ক হয়ে তাদের আচরণের গতিবিধি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন।
জীবন দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের কিশোর-কিশোরীদের এই বেদনাদায়ক করুণ পরিণতি থেকে অনেকটা রক্ষা করা সম্ভব। ইউনিসেফ এর সংজ্ঞায় জীবন দক্ষতা হচ্ছে, সেই সব মনোসামাজিক বা বুদ্ধিজাত ও আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ দক্ষতা যা আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে ও সমস্যা/চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে। জীবন দক্ষতার ১১টি উপাদান আছে। যেমন: সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মসচেতনতা, আবেগীয় চাপে টিকে থাকা, মানসিক চাপে টিকে থাকা, কার্যকরী যোগাযোগ, আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক, গভীর ভাবে চিন্তা, সৃজনশীল চিন্তা, সহমর্মিতা, সমস্যা সমাধান এবং সমঝোতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারলে শুধু কিশোর-কিশোরী কেন যেকোন বয়সী মানুষই যেকোন পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবেন। তাই জীবন দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রত্যেক মানুষের খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যা বা নিজেকে খুন করার বিষয়ে ইসলাম ধর্মে কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ আছে, আত্মহননকারী জান্নাত পাবেন না। তাদের জানাজা পড়ার বিষয়েও বিধি নিষেধ আছে। হিন্দু ধর্মে আত্মহত্যা নিষিদ্ধ আছে। বৌদ্ধ ধর্মে আত্মহত্যা করা মহাপাপ। যে নিজেকে খুন করে সে কখনো মুক্তি পায় না। খিষ্ট ধর্মে আত্মহত্যাকে খুন হিসাবে উল্লেখ করে নিজেকে হত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ আছে, এমনকি আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান না করার কথাও বলা আছে। আইনের চোখে আত্মহত্যা প্রচেষ্টাকারী একজন অপরাধী। কেউ এমন আত্মহত্যার প্রচেষ্টার উদ্যোগ নিলে থানায় খবর দেবার নিয়ম আছে। আত্মহত্যা করার চেষ্টা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এই আইন দেশে প্রয়োগ নেই। আত্মহত্যা সংগঠিত হবার পর প্ররোচিত দায়ী ব্যক্তি কদাচিৎ শাস্তি পেলেও আত্মহত্যা ঠেকাতে আইনের প্রয়োগ একেবারেই দেখা যায় না।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়েছে, মনোজগতে অতিরিক্ত চার্পে ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে। মানুষের আবেগীয় অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিক পদার্থ জড়িত। নিউরোট্রান্সমিটারের গোপন সংশ্রব বিদ্যমান থাকে। এই পদার্থগুলোর মধ্যে সেরোটোনিন ও নরএড্রিনালিনের মাত্রা হ্রাস পেলে মনোজগতে নি¤œচাপ সৃষ্টি হয়। এই নি¤œচাপ থেকে আসে বিষন্নতা। আর গুরুতর বিষন্ন মনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মহত্যা ইচ্ছা জেগে উঠে। সাধারণত এই অবস্থা থেকে ভুক্তভোগী সহজেই বেড়িয়ে আসতে পারে না। এই বের হয়ে আসতে না পারার নেতিবাচক চিন্তনের গোলকধাধায় যদি সে আটকে যায়। এসময় মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের অসামঞ্জস্যতা ঘটে যায়। এসময় যেকোন মানুষ আত্মহত্যার জন্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারে।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী আত্মহননে যে দশটি দেশ এগিয়ে আছে, সেসব দেশ হলো: গুয়েনা, জাপান, সাউথ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, লিথুয়ানিয়া, সুরিনাম, মোজাম্বিক, তানজানিয়া, নেপাল ও কাজাকিস্তান। আত্মহননের পেছনের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, দেশ যত ধনী-দরিদ্র হোক না কেন সব জায়গাতেই আত্মহত্যার কারণ সমান সাদৃশ্যতা রয়েছে।
আত্মহত্যা একটি সামাজিক ব্যাধি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন, নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা, গুরুতর বিষন্নতা দুর করা, অসহায়বোধ ও নিঃসঙ্গতা দূর করা, বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবারের সদস্যদের পরস্পরের মধ্যে বিশ^স্থ সম্পর্ক স্থাপন, আবেগীয় ও মানসিক চাপে টিকে থাকার দক্ষতা, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার দক্ষতা, উত্তেজনা উদ্ভবের পূর্বে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোন প্রকার দূরত্ব তৈরির সুযোগ না রাখা। মনে রাখতে হবে যেকোন উদ্ভুত পরিস্থিতি হোক না কেন আত্মহত্যা কখনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।

লেখক : উন্নয়ন সংগঠকচন্দন কুমার বড়–য়া

‘আত্মহত্যা’ একটি ভয়ঙ্কর ও বেদনাদায়ক শব্দের নাম। আত্মহত্যা বা ঝঁরপরফব মানে নিজেকে নিজে খুন করা। ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বিশে^ গড়ে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করেন। সে হিসাবে প্রতিদিন ২১৬০ জন মানুষ অসময়ে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ জন বছরে প্রায় ১২ হাজার ৮শ মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বিশে^ ৪০ লাখ টিনএজার বিভিন্ন কারণে আত্মহননের প্রচেষ্টা চালায়। তাতে প্রায় একলাখ সফল হয়ে অকালে পরাপারে চলে যান। ফলে প্রিয়জনের আত্মহত্যার যন্ত্রণার পেরেক বুকে নিয়ে ৬০ লাখেরও বেশি স্বজন ধুকে ধুকে জীবন অতিবাহিত করে। এটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক সামাজিক সমস্যা।
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশেও দিন দিন আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক’দিন পূর্বে এইচ এস সি’তে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় রাউজানে প্রিয়া দে নামক এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়। গেল বছরে ঢাকার ভিকারুন্নেসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী চোখের সামনে পিতাকে অসম্মানের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেকে বলিদান দেন। আর চট্টগ্রামে ডা. আকাশ পেশায় একজন চিকিৎসক হয়েও অতিরিক্ত মানসিক চাপে ঠিকে থাকতে না পেরে নিজেকে ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তে নিয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মাহুতি দিলেন। এতেই প্রতীয়মান হয় যে প্রতিটি মানুষই কোন কোন সময় চরম ভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, আবেগীয় চাপে ঠিকতে পারে না। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই বেদনাদায়ক সংবাদটি সবার নজর কাড়ে। আহারে বেচারা —- বলে দীর্ঘ নিশ^াস ছেড়ে তার স্বজনের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন ব্যতীত কিছুই করার থাকে না। আদৌ কি কিছু করার নেই ? অবশ্যই অনেক করনীয় আমাদের রয়েছে যেন কোন প্রিয়জনই অকালে হারিয়ে না যায়।
এবার দেখা যাক কেনই বা মানুষ এই চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হন- সাধারণত অন্যায় অপবাদ, অসম্মান চরম পর্যায়ের তিরস্কার, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পাওয়া, অবহেলা, ইভটিজিং, যৌন উৎপীড়নসহ ইত্যাদি কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা নিজের পূর্ব পরিকল্পিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। অতিরিক্ত উত্তেজনা, তাড়নায় ইমপালসিভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ভুক্তভোগী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া প্রেমে অসফল, পছন্দের পাত্র/পাত্রীকে না পাওয়া, যৌতুক, নারী নির্যাতন, প্ররোচনার কারণেও আত্মহত্যা সংগঠিত হয়। পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, সামান্য ইস্যুতে মা-বাবার সাথে অভিমান, এমনকি পছন্দের বিষয়ে ও কলেজে ভর্তি হতে না পেরেও টিনএজদের আত্মহত্যা করার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়।
ইদানীং পরিবার কর্তৃক সন্তানদের উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার ফলে লেখাপড়ার চাপ সন্তানদের মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তান লেখাপড়ায় কতটা পারঙ্গম, তার বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার পরিবেশ কতটুকু ইতিবাচক, লেখাপড়ার পাশাপাশি সন্তান খেলাধুলা-বিনোদনের সময় পাচ্ছে কি না তা না দেখে বাবা-মায়ের চাহিদা আমার সন্তানের এপ্লাস চাই চাই। এই ধরনের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিয়ে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে পরে পরিবার ও শিক্ষকদের কটুক্তির-তিরস্কারের মুখোমুখি হন। এর ফলেও অনেক সময় শিক্ষার্থীকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। অথচ আমাদের সন্তানদের জানা উচিত বিশ^খ্যাত বিজ্ঞানী নিউটন, আইনস্টাইন, আব্রাহাম নিংকন, বিল গেটস, বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী কাগজ কলমের পরীক্ষায় পাস করেননি। এমনকি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল তো কলেজে পড়ার সুযোগও পাননি। অথচ তার লেখা কবিতা কলেজ-বিশ^ বিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে। আবার অনেকে কলেজে ভর্তি হয়েও পাস করতে পারেন নাই যেমন বিল গেটস। আরো আশ্চর্যের বিষয় যে, পদার্থ বিজ্ঞানের বরপুত্র আলবার্ট আইনস্টাইন এন্ট্রাস এসএসসি পাস করেছিলেন তিনবার পরীক্ষা দেবার পর। সুতরাং কোন এক লক্ষ্যে পোঁছতে না পারা মানে জীবনে হেরে যাওয়া নয়, প্রতিটি শেষের মুহুর্তে নতুন করে শুরু করা দরকার। এই মনীষীদের জীবনী আমাদের শিক্ষার্থীদের বেশি করে জানানো প্রয়োজন। এতে তাদের আত্মবিশ^াস আর মনোবল দুটোই বাড়বে।
সমাজের ঋণগ্রস্ত তৃণমূল মানুষের সংখ্যাও কম নয়। সমাজের বিত্তশালীদের কাছে কোটি কোটি টাকা ঋণ থাকলেও তাদের আত্মমর্যাদার হানি ঘটে না। অথচ ক্ষুদ্রঋণ হলেও সমাজের নিকট নানান হেয় পতিপন্ন হবার আশঙ্কা তার নিকট অনেক বড়। অতিরিক্ত ঋণের বোঝা বইতে না পেরে এলাকা ত্যাগকারীর সংখ্যা অনেক। উপায়ন্তর না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে চায় অসহায় ঋণী। বর্তমান সমাজে ধনী গরিব নির্ণয়ের নির্দেশক বড়ই অসম। কোটি কোটি সরকারি টাকা আত্মসাতের পরও কোন শাস্তি তার শরীরের উপর দিয়ে যায় না। কারণ তারা সমাজের উঁচু তলার মানুষ। অথচ পেটের দায়ে সামান্য মোবাইল চুরির ঘটনায় গণপিটুনিতে জায়গাতেই প্রাণ যায় সমাজের সবচেয়ে নিচু শ্রেণির মানুষটির।
শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও নারীরা অনেক সময় আত্মহননের পথ বেছে নেয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপড়েন, পরস্পরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ^াস, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি, প্রতিপক্ষের প্ররোচনায়ও বিবাহিতদের জীবনে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে বিবাহ পরবর্তী অবস্থা ও শ^শুরবাড়ির পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে কিছু পরিবারের সংস্কৃতি এমন যে, নিজের মেয়ে যেন স্বামীকে নিয়ে আলাদা থাকে, আর ছেলে বউ নিয়ে আলাদা থাকলে সব বউয়ের দোষ। নিজের ছেলে মেয়ের অসংখ্য ত্রæটি মার্জনীয় হলেও বউয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমার অযোগ্য এই মানসিকতা সেকাল থেকে একাল এখনো সমান আছে। এই সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে প্রিয়জনকে আমরা হারাতেই থাকবো বৈকি।
কিশোর-কিশোরী বয়সে আত্মহত্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কেননা এই সময়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সাধিত হয়। নিজের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়,আবেগীক চাপ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। কোন কিছুতেই তারা ধৈর্য ধারণ করতে পারে না। নিজেকে সবসময় হিরোহিক ভাবতে ভালবাসে। সে যেই সিদ্ধান্ত নেয় তাই সঠিক বলে মনে করে। কেউ তার যৌক্তিক বিরোধিতা করলেও তার কাছে প্রতিপক্ষের মতো বোধ হয়। এসময়ে নিজের প্রিয়জন এমনকি বাবা-মা, ভাই-বোনের কাছেও নিজের বিষয়ে গোপন রেখে চলতে চায়। বয়সের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কখন ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয় কেউ টের পায় না। তাই এই বয়সে আত্মহত্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সুতরাং কিশোর-কিশোরী বয়সে পরিবারের বাবা-মা, অভিভাবক কিংবা যতœকারীদের অবশ্যই বেশি বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তার আবেগকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করুন। দ্বিমত পোষণ করার ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প অপশন উপস্থাপন করুন। সে যাতে বুঝতে পারে আপনি কখনো তার প্রতিপক্ষ নন। তবেই সে আপনাকে বিশ^স্থ প্রিয়জনের একজন ভাববে। সতর্ক থাকা দরকার সহপাঠির সাথে কখন মিশছে, স্কুল-কলেজে যাবার নাম করে বন্ধুদের সাথে অন্য কোথাও যাচ্ছে কি না। সে যা বলছে তা কতটা সঠিক কিংবা আপনাকে কতটা বিশ^স্থ মনে করছে বিষয়গুলো সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। আবার এমন কোন আচরণ করা যাবে না যাতে সে মনে করে আপনি সবসময় তাকে সন্দেহ-অবিশ^াস করছেন। মা-বাবাকে কিশোর-কিশোরী ছেলে-মেয়েদের সাথে বন্ধুর মত, সহপাঠির মতবিশ^স্থ সঙ্গী হিসাবে চলতে হবে। সন্তানদের সাথে এমন বিশ^স্থ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে যে, সে স্কুল-কলেজের সহপাঠি ছেলে বন্ধুটির নিছক দুষ্টুমী কিংবা কোন অফারের কথাও যাতে আপনাকে নির্দ্বিধায় নিঃসংকোচে বলতে পারে। এছাড়া কেউ যদি কখনো কথার ছলে বলে থাকেন, “এই না হলে আমি আত্মহত্যা করব, কিংবা তাকে না পেলে আমি নিজেকে শেষ করে ফেলবো” অনুরূপ সংলাপ বলতে শোনা যায়, তবে সেসব মানুষদের প্রতি আরো সতর্ক হয়ে তাদের আচরণের গতিবিধি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন।
জীবন দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের কিশোর-কিশোরীদের এই বেদনাদায়ক করুণ পরিণতি থেকে অনেকটা রক্ষা করা সম্ভব। ইউনিসেফ এর সংজ্ঞায় জীবন দক্ষতা হচ্ছে, সেই সব মনোসামাজিক বা বুদ্ধিজাত ও আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ দক্ষতা যা আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে ও সমস্যা/চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে। জীবন দক্ষতার ১১টি উপাদান আছে। যেমন: সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মসচেতনতা, আবেগীয় চাপে টিকে থাকা, মানসিক চাপে টিকে থাকা, কার্যকরী যোগাযোগ, আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক, গভীর ভাবে চিন্তা, সৃজনশীল চিন্তা, সহমর্মিতা, সমস্যা সমাধান এবং সমঝোতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারলে শুধু কিশোর-কিশোরী কেন যেকোন বয়সী মানুষই যেকোন পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবেন। তাই জীবন দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রত্যেক মানুষের খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যা বা নিজেকে খুন করার বিষয়ে ইসলাম ধর্মে কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ আছে, আত্মহননকারী জান্নাত পাবেন না। তাদের জানাজা পড়ার বিষয়েও বিধি নিষেধ আছে। হিন্দু ধর্মে আত্মহত্যা নিষিদ্ধ আছে। বৌদ্ধ ধর্মে আত্মহত্যা করা মহাপাপ। যে নিজেকে খুন করে সে কখনো মুক্তি পায় না। খিষ্ট ধর্মে আত্মহত্যাকে খুন হিসাবে উল্লেখ করে নিজেকে হত্যা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ আছে, এমনকি আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান না করার কথাও বলা আছে। আইনের চোখে আত্মহত্যা প্রচেষ্টাকারী একজন অপরাধী। কেউ এমন আত্মহত্যার প্রচেষ্টার উদ্যোগ নিলে থানায় খবর দেবার নিয়ম আছে। আত্মহত্যা করার চেষ্টা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে এই আইন দেশে প্রয়োগ নেই। আত্মহত্যা সংগঠিত হবার পর প্ররোচিত দায়ী ব্যক্তি কদাচিৎ শাস্তি পেলেও আত্মহত্যা ঠেকাতে আইনের প্রয়োগ একেবারেই দেখা যায় না।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়েছে, মনোজগতে অতিরিক্ত চার্পে ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে। মানুষের আবেগীয় অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের জৈব রাসায়নিক পদার্থ জড়িত। নিউরোট্রান্সমিটারের গোপন সংশ্রব বিদ্যমান থাকে। এই পদার্থগুলোর মধ্যে সেরোটোনিন ও নরএড্রিনালিনের মাত্রা হ্রাস পেলে মনোজগতে নি¤œচাপ সৃষ্টি হয়। এই নি¤œচাপ থেকে আসে বিষন্নতা। আর গুরুতর বিষন্ন মনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মহত্যা ইচ্ছা জেগে উঠে। সাধারণত এই অবস্থা থেকে ভুক্তভোগী সহজেই বেড়িয়ে আসতে পারে না। এই বের হয়ে আসতে না পারার নেতিবাচক চিন্তনের গোলকধাধায় যদি সে আটকে যায়। এসময় মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের অসামঞ্জস্যতা ঘটে যায়। এসময় যেকোন মানুষ আত্মহত্যার জন্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারে।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী আত্মহননে যে দশটি দেশ এগিয়ে আছে, সেসব দেশ হলো: গুয়েনা, জাপান, সাউথ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, লিথুয়ানিয়া, সুরিনাম, মোজাম্বিক, তানজানিয়া, নেপাল ও কাজাকিস্তান। আত্মহননের পেছনের কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, দেশ যত ধনী-দরিদ্র হোক না কেন সব জায়গাতেই আত্মহত্যার কারণ সমান সাদৃশ্যতা রয়েছে।
আত্মহত্যা একটি সামাজিক ব্যাধি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন, নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা, গুরুতর বিষন্নতা দুর করা, অসহায়বোধ ও নিঃসঙ্গতা দূর করা, বৈষম্যহীন দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবারের সদস্যদের পরস্পরের মধ্যে বিশ^স্থ সম্পর্ক স্থাপন, আবেগীয় ও মানসিক চাপে টিকে থাকার দক্ষতা, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার দক্ষতা, উত্তেজনা উদ্ভবের পূর্বে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোন প্রকার দূরত্ব তৈরির সুযোগ না রাখা। মনে রাখতে হবে যেকোন উদ্ভুত পরিস্থিতি হোক না কেন আত্মহত্যা কখনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।

লেখক : উন্নয়ন সংগঠক