আতঙ্কের জনপদ হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প

শফিক আজাদ, উখিয়া

35

আতঙ্কের জনপদ হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সম্প্রতি উখিয়ার মধুরছড়া, লম্বাশিয়ার কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও দেশী-বিদেশী লোকজন আতঙ্কে আছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠার ফলে দিন দিন পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিদেশী দাতা সংস্থাগুলোর রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সুশীল সমাজের লোকজন।
রোহিঙ্গাদের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন আরিফ উল্লাহ (৩৮)। উচ্চ শিক্ষিত এই রোহিঙ্গা নেতা ছিলেন উখিয়ার বালুখালী-২ ক্যাম্পের হেড মাঝি। গত ২০১৮ সালের ১৮ জুন রাতের আঁধারে তাকে গলা কেটে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তার পরিবারের সদস্যরা ভয়ে পালিয়ে গেছে টেকনাফের লেদায়। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের আরেক শীর্ষ মাঝি আবু ছিদ্দিক। ক্যাম্পের ভেতরেই তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে চলে যায় সন্ত্রাসী বাহিনী। পরে তাকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় হাসপাতালে। আবু ছিদ্দিক বেঁচে গেলেও দুই হাত হারিয়ে পঙ্গু অবস্থায় জীবনযাপন করছে।
বালুখালী ক্যাম্পের ডি ব্লকের নুর আলম (৪৫), মো. খালেক (২২) ও কুতুপালং ই-ব্লকের মো. আনোয়ারকে (৩৩) গত ২ সেপ্টেম্বর ক্যাম্প থেকে ধরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসী বাহিনী। পরের দিন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পারিয়াপাড়ার পাহাড়ি এলাকা থেকে গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এই তিন রোহিঙ্গাকে। উখিয়ার এমএসএফ ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে দুইজন সুস্থ হয়ে উঠলেও মারা গেছে আনোয়ার। যে দুইজন বেঁচে আছে, আতঙ্কে তারাও ক্যাম্প ছেড়ে অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে গেছে।
২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর বালুখালী ১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যশোর থেকে আসা নলকূপ মিস্ত্রিদের উপর হামলা চালিয়ে চারজনকে রক্তাক্ত জখম করা হয়। ‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়িয়ে রোহিঙ্গারা হামলা চালায়। পরে পুলিশ তাদেরকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে।
সর্বশেষ গত ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি বালুখালী ক্যাম্পের মো. রফিক ও মো. আলমের লাশ উদ্ধার করে স্বজনরা। রফিকের লাশ উদ্ধার করা হয় টেকনাফের চাকমারকূল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অদুরে গভীর জঙ্গল থেকে। আর আলমের লাশ উদ্ধার করা হয় বালুখালী থেকে।
স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, লম্বাশিয়া ও মধুরছড়া ক্যাম্পের হেড মাঝি জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে কয়েক’শ রোহিঙ্গা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে ক্যাম্পের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। গত ১৯ ফেব্রæয়ারি মধুরছড়া ক্যাম্পের পাশে স্থানীয় দিলদার আলম ও আনোয়ারের বাড়ীতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলা চালিয়ে তাকে আহত করে। এভাবে প্রতিনিয়ত ছোট-খাটো ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন ক্যাম্পে।
গত বৃহস্পতিবার একটি গুজব ছড়িয়ে রোহিঙ্গারা ৩ জন জার্মান সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করে। এরা হলেন- ইয়োরিকো লিওবি (৪৪), এস্টিপেইন্স এ্যাপল (৪৯) ও গ্রার্ডার স্টেইনার (৬১)।
এসময় আরো আহত হন তাদের দোভাষী মো. সিহাবউদ্দিন (৪১), গাড়ী চালক নবীউল আলম (৩০) এবং পুলিশ সসদ্য জাকির হোসেন (৩৩)। এমন পরিস্থিতির শিকার হলে হয়তো আগামীতে বিদেশীরা ক্যাম্প পরিদর্শনের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হবেন। এর ফলে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
উখিয়া ও টেকনাফে ৩০টি ক্যাম্পে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। প্রতি ক্যাম্পে একজন করে হেড মাঝির অধীনে ৪ শতাধিক মাঝির মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা চলছে। ত্রাণ তৎপরতাও চালানো হচ্ছে তাদের সহযোগিতায়। তবে বিশাল এই ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ মাঝি ও হেড মাঝিদের হাতে যেমন নেই, তেমনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও এখানে অসহায়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝিদের সন্ত্রাসী গ্রুপের নির্দেশ মতো চলতে হয়। নিয়মিত তাদের দিতে হয় চাঁদা। তাদের কথার হেরফের হলেই গলায় ছুরি চালানো হয়। কুপিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অনেক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক রোহিঙ্গা জানান, সন্ত্রাসী গ্রুপের চাহিদা মতো চাঁদার টাকা না দিলে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও তাদের কাছে অসহায়।
উখিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যাপক তহিদুল আলম তহিদ জানান, রোহিঙ্গারা নানা অপরাধ করলেও তাদের পুলিশে দেওয়া যায় না। বিশাল ক্যাম্পে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, দিনের বেলায় যেমন তেমন, রাত নামলেই রোহিঙ্গা ক্যাম্প যেন এক আতঙ্কের জনপদ। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এমন পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলে ভবিষ্যতে চরম মাশুল দিতে হবে সরকার এবং স্থানীয়দের।
উখিয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল খায়ের জানান, বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানে অপরাধের পরিমাণ প্রতিদিন বাড়ছে। ৩জন সাংবাদিক রোহিঙ্গাদের হাতে আক্রান্ত হয়েছে, এটি খুবই দুঃখজনক। এ ঘটনায় ১১জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ।