আজ ভয়াল ২৯ এপ্রিল উপকূলবাসীর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে

17

ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ। এটি ছিল ইতিহাসের এক প্রাকৃতিক তাÐবের দিন । ১৯৯১ সালের এ দিনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজরসহ দেশের সবকটি উপক‚লীয় জেলা-উপজেলায় আঘাত হেনেছিল মহাপ্রলঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡¡াস। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল মানবসম্পদের। ধ্বংস হয়েছিল ফসলি জমি, বেড়িবাঁধ ও গবাদিপশু। বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে থাকিয়ে দেথেছিল সেই ধ্বংসলীলা। হু হু করে কেঁদে উঠেছিল বিশ^ বিবেক। সেই দিনের ধ্বংসলীলার ২৯ বছর পার হতে চলছে আজ। আজ আমরা বিন¤্রচিত্তে¡ স্মরণ করছি দুর্যোগে নিহত সেইসব মানুষগুলোকে। এর সাথে জানতে ইচ্ছে হয়, কেমন আছেন সেইসব মানুষগুলো, যারা সেদিন স্বজন আর সম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলেন ? এছাড়া দুর্যোগ মোকাবেলার কী অবস্থা এখন উপক‚লের? প্রশ্ন এজন্যই যে, এখন চলছে ঘূর্ণিঝড় মৌসুম। আবহাওয়া অধিদপ্তরে পূর্বাভাসে এপ্রিল-মে মাসে একাধিক নিম্নচাপের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছে। কিন্তু আমরা যতদূর জানি, এখনো অনেকাংশ অরক্ষিত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপক‚ল। বাংলাদেশের অন্যতম সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের বন্দরনগরীর পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী, আনোয়ারা, সীতাকুÐ, মিরসরাই, স›দ্বীপ, কক্সবাজারের পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালীসহ উপক‚লীয় এলাকার লোকজন এখনো রয়েছে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡¡াসের আতঙ্কে। ’৯১ সালে এ ভয়াল রাতে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াসে এসব এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলেও এখনও পর্যন্ত সেখানে নির্মিত হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও নানা উদ্যোগের কথা আমরা জানি, তবে সরকারের পরিকল্পনাগুলো স্বচ্চতার সাথে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, সেটা দেখার বিষয়। অতীতে লক্ষ্য করা গেছে, ঘোর বর্ষাকালে জোয়ারের পানি ঠেকানোর নামে রিংবাঁধ নির্মাণ, মেরামত, সংস্কারসহ নানা নামে প্রতি বছরই নেয়া হয় বিভিন্ন প্রকল্প। কিন্তু এসব প্রকল্পে ঘটে সরকারি বরাদ্দকৃত অর্থ নয় ছয় এর ঘটনা। নিরীহ উপক‚লবাসীর জীবনের ভাগ্য নিয়ে চলে নানান খেলা। বৃষ্টি হলে ভেঙে যায় বাঁধ। আবারো নতুন নতুন প্রকল্পের নামে নতুন বরাদ্দ। এভাবেই বছরের পর বছর উপক‚লীয় বাঁধের কাজের নামে চলে আসছে সরকারি অর্থের অপচয়। জাতীয় রাজস্বের শতকরা ৮০ শতাংশ অর্থ যোগানদাতা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। কিন্তু এ শহর রক্ষা বাঁধ হিসেবে পরিচিত বন্দর নগরীর পতেঙ্গা বেড়িবাঁধটি রিংরোড নামে দফায় দফায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ও ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের কাজ কিছুটা বাস্তাবায়নদৃশ্যমান হলেও কখন যে তা শেষ হবে বলা যাচ্ছে না। ’৯১ সালের মহাপ্রলঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াসে এ বাঁধটি ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছিল পতেঙ্গা, বন্দর, হালিশহর ও পাহাড়তলী এলাকা। হাজারো মানুষের প্রাণের সাথে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল শিল্প কারখানা ও স্থাপনার। এছাড়া সমুদ্র উপকূলীয় উপজেলা বিশেষ করে বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া ও মহেশখালী উপক‚লীয় এলাকা মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছিল। ভয়াবহ প্রাণহানি আর বসতভিটা লÐভÐ করে এসব উপক‚লকে তছনছ করে দিয়েছিল প্রলংকারী ঘুর্ণিঝড়। সেইদিন থেকে এলাকাবাসী সবকিছু হারানোর নীরব দুঃখ-কষ্টের এত বছরের জোরালো দাবি ছিল টেকসই স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করার। বর্তমান সরকার বাঁশখালীসহ উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকল্পগুলো অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। এতে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে, এ বাঁধগুলো আদৌ টেকসই হবে কিনা। উপকূলীয় এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি ছিল প্রয়োজনে সেনাবাহিনী বা নৌবাহিনীর মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিলে অনিয়ম ও রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত থেকে প্রকল্পটির কাজ সঠিক ও যথাসময়ে শেষ হত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা না করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ শেষ করেছে। এতে একদিকে সরকারের আর্থিক ব্যয় বাড়লেও বাঁধের অবস্থা নড়বড়ে অবস্থায়ই রয়ে যাবে বলে মনে করছেন অনেকে। সর্বোপরি বেড়িবাঁধ টেকসই না হলে আগামীতে ব্যাপকহারে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
আমরা মনে করি, সরকার বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নে যে ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলছে তাতে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলেও বেড়িবাঁধ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দায় নিতে হবে। আমরা আশা করি, সরকার বেড়িবাঁধ প্রকল্পের কার্যক্রম তদারকিতে আরো বেশি মনোযোগী হবে। এক্ষেত্রে যেকান অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত করে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অবশ্যই আমরা একবাক্যে স্বীকার করব যে, অরক্ষিত উপকূলকে সুরক্ষা দিতে টেকসই বেড়িবাঁধের বিকল্প নেই। আমরা সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় উপকূলবাসীর জীবন আরো নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দময় করা হবে-এমনটি প্রত্যাশা করি।