আজ দখিণা দুয়ার খুলে দিয়েছে প্রকৃতি

মীর রাতুল হাসান

78

শিমুল-পলাশের বাসন্তী আভায় নিজেকে সাজাতে চলেছে প্রকৃতি। প্রণয়ী কোকিল তার সঙ্গীকে কুহু কুহু সুরে ডাকতে শুরু করেছে। তরুণ-তরুণীর হৃদয়ও আবেগে উচাটন। আজ পহেলা ফাল্গুন। প্রকৃতি আজ দক্ষিণা দুয়ার খুলে দিয়েছে।
‘আকাশে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা, কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে। মধুর অমৃত বাণী, বেলা গেল সহজেই, মরমে উঠিল বাজি- বসন্ত এসে গেছে।’ কালজয়ী এই গানের মাধ্যমে প্রকৃতিতে বসন্তের আগমনের উচ্ছলিত আবেগ ছড়িয়ে দিয়েছেন শিল্পী অনুপম রায়। প্রকৃতিতে এখনো বসন্তের এমন রূপ ফুটে না উঠলেও ক্যালেন্ডারের পাতায় বসন্ত এসে গেছে। শীতের করাল গ্রাস থেকে বসন্তের পূর্ণ রূপে নিজেকে সাজাতে অনেকটা সময় নেয় প্রকৃতি। তাই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন- ‘ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত’।
ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরতে ঘুরতে এসেছে ফাল্গুন মাস। আর ফাল্গুন মাস এনে দিয়েছে ঋতুরাজ বসন্তকে। কদিন আগেও শীতের দাপটে কাঁপছিলো সারা দেশ। বসন্তের আগমনে বাংলার প্রকৃতিতে এসেছে ফাগুনের ছোঁয়া। ঝলমলে রোদের দেখাও মিলছে, বইছে ফালগুনী হাওয়া। ধূসর কুয়াশা সরে গিয়ে বাগানজুড়ে খেলা করছে সোনারোদ। আর ঋতুরাজের রাজসভায় আগমন ঘটেছে রঙিন সব ফুলের। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সবাই সাদরে বরণ করবে ঋতুরাজ বসন্তকে। সেই খুশিতে গাছের শাখে শাখে ফুটছে হরেক রকম ফুল। ফুলের বাগান, বাসা বাড়ি, স্কুল কলেজের আঙিনাসহ বিভিন্ন স্থানে শোভা পাচ্ছে গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানান ফুল। আমগাছে এসেছে মুকুল। পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচ‚ড়াসহ ফাগুনের নানান ফুলের কলিরও উঁকি মারছে। শীতে ঝরে পড়া পাতার ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে গাছে গাছে গজাতে শুরু করেছে নতুন পাতা।
ঋতুরাজ বসন্তের এই আগমনে প্রকৃতির সাথে তরুণ হৃদয়েও লেগেছে দোলা। সকল কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে, বিভেদ ভুলে, নতুন কিছুর প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে বসন্তের উপস্থিতি। মৃদুমন্দা বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যি সত্যি সে ঋতুর রাজা। লাল আর হলুদের বাসন্তী রঙে প্রকৃতির সাথে নিজেদের সাজিয়ে আজ বসন্তের উচ্ছলতা ও উন্মাদনায় ভাসবে বাঙালি।
বসন্ত অনেক ফুলের বাহারে সজ্জিত হলেও গাঁদা ফুলের রঙকেই এদিনে তাদের পোশাকে ধারণ করে তরুণ-তরুণীরা। খোঁপায় শোভা পায় গাঁদা ফুলের মালা। বিশেষ করে এইদিন গাদা ফুলের চাহিদা থাকে একটু বেশি। যার ফলে গাদা ফুলের দোকানদাররা একেবারে মগডালে উঠে বসে থাকেন। একশ টাকায় মিলছে না ফুলের মালা। মেয়েদের মাথা সাজাতে যে ফুলের প্রয়োজন পড়ছে তার দাম ধরা হচ্ছে দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা। গাঁদা ফুলের সাথে এবার বেড়েছে অন্য ফুলের দামও। ৫ টাকার রজনীগন্ধার প্রতিটি স্টিক বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। একটি গোলাপের দাম এসে দাঁড়িয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। তারপরও ভাল মানের গোলাপ পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ফুল ব্যবসায়ীরা বলছেন প্রতিবছর এই সময় ফুলের চাহিদা একটু বেশি থাকে। যার ফলে দাম একটু বেশি হয়। এছাড়াও এবার ফুলের আমদানি থেকে চাহিদার পরিমাণ বেশি। এর ফলে সবধরনের ফুলের দাম একটু চওড়া।
বসন্তের আনন্দযজ্ঞ থেকে বাদ যায় না গ্রাম্যজীবনও। আমের মুকুলের সৌরভে আর পিঠাপুলির মৌতাতে গ্রামে বসন্তের আমেজ একটু বেশিই ধরা পড়ে। বসন্তকে তারা আরও নিবিড়ভাবে বরণ করে।
বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্ত রঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপরও রং ছড়ায়। ১৯৫২ সালের আট ফাল্গুন বা একুশের পলাশরাঙা দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী চ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। বাঙালির নিজস্ব সার্বজনীন প্রাণের উৎসবে এ উৎসব এখন গোটা বাঙালির কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। বাংলায় বসন্ত উৎসব এখন প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও এর শুরুর একটা ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে, যা অনেকের অজানা।
মোগল স¤্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বসন্ত উৎসব। তখন অবশ্য ঋতুর নাম এবং উৎসবের ধরনটা এখনকার মতো ছিল না। তাই পহেলা ফাল্গুন বা বসন্ত উৎসব কেবল উৎসবে মেতে ওঠার সময় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার গৌরবময় ঐতিহ্য, বাঙালিসত্তা। সে ঐতিহ্যের ইতিহাসকে ধরে রাখতে পারলেই বসন্ত উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্ম ছড়িয়ে দিতে পারবে বাঙালি চেতনাকে।
বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয়। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বসন্তের এই দিনে উচ্ছসিত হয়ে উঠে তরুণ-তরুণীরা। পহেলা ফাল্গুনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত উৎসব, অনুষ্ঠান, বই মেলা ও বিনোদন কেন্দ্রগুলিতে ভিড় জমায় তারা। চারিদিকে যেন সাজ সাজ রব। ঋতুরাজ বসন্ত আজ প্রত্যেকের হৃদয়কে করেছে উচাটন। বসন্তের আগমন মানেই তরুণ হৃদয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার। আজ দিনভর চলবে তাদের বসন্তের উচ্ছ্বাস প্রকাশ। ফোন, ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলবে বসন্তের শুভেচ্ছা বিনিময়। আজ নানা আয়োজনে বসন্তকে বরণ করবে বাঙালি।
প্রতিবছর পহেলা ফাল্গুনের একদিন পরই আসে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। তবে এবার বাংলা ও ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হেরফেরে পহেলা ফাল্গুনের সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। যা বাড়তি মাত্রা যুক্ত করেছে। এবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে বসন্তের আগমনী বার্তা মুছে দেবে জীবনের পাওয়া, না পাওয়া ও বিরহের সব গ্লানি।