আগুন ঝরা ফাগুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

25

দেশের সোনার ছেলে খুন করে রুখে মানুষের দাবি/ দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?/ না, না, না, না, খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই/ একুশে ফেব্রূয়ারি, একুশে ফেব্রূয়ারি/ সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা/ তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভাইয়ের চরম ঘৃণা/ ওরা গুলি ছুঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবিকে রুখে/ ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই বাংলার বুকে/ ওরা এ দেশের নয়/ দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়/ ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি/ একুশে ফেব্রূয়ারি, একুশে ফেব্রূয়ারি…
বাঙালির ভাষা আন্দোলন শুধুমাত্র বাংলাদেশই নয়, উপমহাদেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন বৈকি! বৃটিশ শাসনের যাঁতাকল থেকে মুক্তির পর বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ নিজের সংগ্রামী শক্তির প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটায় অবিস্মরণীয় এ আন্দোলনের মাধ্যমে। বাংলাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির গণদাবি ধীরে ধীরে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রূয়ারি বাঙালির ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। সেদিন থেকে বাঙালির কাছে ফেব্রূয়ারি মানে মাতৃভাষার মাস, ফেব্রূয়ারি মানে আগুন ঝরা ফাগুনের স্পর্ধিত সাহস ও অবিনাশী চেতনা।
বিশ্ব পরিমন্ডলের ইতিহাস পাঠে জানা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতের আসাম ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশ ও জাতির জীবনে ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য এমন আন্দোলন ও আত্মত্যাগের নজির নেই। পাকিস্তান আমলের এই আন্দোলনকে সীমিত অর্থে দেখলে সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু এতে বিষয়টি খন্ডিত হয়ে পড়ে। এটি ক্ষণস্থায়ী পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে স্মরণ করিয়ে দেয়। জানিয়ে দেয় এ অঞ্চলের মানুষের মনস্তাত্বিক সংকটও। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কোনোভাবেই এর থেকে বিচ্যুত করা যায় না। এমনকি উপমহাদেশে বাংলার বিশিষ্টতা একুশে ফেব্রূয়ারির দান।
দুইশ’ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তানের উদ্ভব হয়। পাকিস্তানের দুটি অংশ- পশ্চিম ও পূর্ব। দুই অংশের মধ্যে দূরত্ব হাজার মাইলেরও বেশি। দূরত্ব শুধু ভৌগোলিকই ছিল না, দুই ভূগোলের ছিল আলাদা সংস্কৃতি। ভাষাকেন্দ্রিক সমস্যা আসলে মৌলিক পার্থক্যগুলোর প্রকাশ মাত্র। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই অন্যান্য পার্থক্যগুলো বিকট চেহারা নিয়ে হাজির হয়। যার প্রথম প্রকাশ ভাষাকেন্দ্রিক। ভাষাকেন্দ্রিক বিতর্ক হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা বা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বরং, দেশভাগ হওয়ার আগেই ভাষাকেন্দ্রিক বিতর্ক জেগে ওঠে। ১৯৪৭ সালের ১৯ মে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা।’ একই বছরের ২২ ও ২৩ জুন লেখক ও সাংবাদিক আবদুল হক দুই কিস্তির একটি নিবন্ধ লিখেন। ‘বাংলা ভাষাবিষয়ক প্রস্তাব’ শিরোনামের ওই নিবন্ধে তিনি বাংলা ভাষা কেন রাষ্ট্রভাষা হবে তার স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
দেশভাগের এক বছরের মধ্যেই ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এমন হঠকারী ঘোষণা মেনে নেয়নি পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ। বাংলাভাষার সমমর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নানা সংগঠন। আয়োজিত হতে থাকে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ। লেখা হয় প্রবন্ধ, কবিতা ও গান। অর্থাৎ, সমাজের সর্বস্তরে ভাষা প্রশ্নটি গুরুত্ব লাভ করে। এর সর্বোচ্চ বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রূয়ারি। সেদিন সরকারি ১৪৪ ধারা আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বহু সংখ্যক ছাত্র, জনতা ও রাজনৈতিক কর্মী বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিলে পুলিশ গুলি করলে নিহত হন রফিক, সালাম, বরকতসহ নাম না জানা আরও অনেকে। এ ঘটনায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে মিছিল ও বিক্ষোভ হয়। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৩ সাল থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রূয়ারিতে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।