আগামী দিনের শিক্ষা নিয়ে কিছু স্বপ্ন, কিছু ভাবনা

ড. রাগিব হাসান

18

একবিংশ শতকে শিক্ষাদীক্ষা কতটা পাল্টে গেছে এবং যাবে? এই প্রশ্নের জবাব দিতে হলে গত ২৫ বছরে পৃথিবীটা কতটা পাল্টে গেছে, তা একবার দেখা যাক। ২৫ বছর আগে যখন আমি স্কুলে বা কলেজে পড়তাম, তখন ইন্টারনেট আমজনতার কাছে আসেনি; গুগলের মতো সার্চ ইঞ্জিন, অথবা ফেসবুকের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তো দূরের কথা। ফলে আমরা যারা শিক্ষার্থী ছিলাম, তারা পড়ালেখা করতাম মোটামুটি বিগত কয়েক হাজার বছরে শিক্ষার্থীরা যেভাবে পড়ে এসেছে, সেভাবেই—বই পড়া, খাতায় লেখা, হাতে ছবি আঁকা, পরীক্ষা দেওয়া। শিক্ষকেরাও পড়াতেন হাজার বছরের পুরোনো ধারায়, ক্লাসে সরাসরি লেকচার দিয়ে। কিন্তু গত ২৫ বছরে সারা বিশ্বটা পাল্টে গেছে ইন্টারনেট আর মোবাইল ফোনের জাদুকরী ছোঁয়ায়। যে তথ্য খুঁজতে হলে এক সময় লাইব্রেরিতে পড়ে থাকার দরকার ছিল, এখন গুগল এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে সারা বিশ্বের সব তথ্যভান্ডার ঘেঁটে সেটা হাতের মুঠোয় এনে দিচ্ছে। কোর্সেরা, খান একাডেমি, অথবা শিক্ষকডটকমের মতো অনলাইন শিক্ষার সাইট তো আছেই। আর একসময়ে কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেট কেবল বিত্তশালীদের নাগালে থাকলেও এখন মোবাইল ফোনের কল্যাণে সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে তথ্যপ্রযুক্তির এই বিপ্লব। একবিংশ শতকের ১৫তম বছরে আমরা পা দিয়েছি। এখন যদি সামনের দিকে তাকাই, শিক্ষাব্যবস্থায় দেখতে পাই আমূল পরিবর্তন। প্রথাগত শিক্ষার গন্ডি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে শুরু করছি, কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা হলো, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষাক্ষেত্রের বৈষম্যকে দূর করতে খুব সফলভাবে আমরা কাজে লাগাতে পারি এই তথ্যপ্রযুক্তিকে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো বড় একটা সমস্যা হলো গ্রাম ও শহর, অথবা আরও ভালো করে বলতে গেলে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ কয়েকটি বড় শহর বনাম বাংলাদেশের বাকি অংশের পার্থক্য। বিশেষ করে গণিত, বিজ্ঞান, কিংবা ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের স্কুল কলেজে যথাযথ সুযোগ নেই। শিক্ষকডটকম প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশের নানা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষকদের কাছ থেকে বার্তা পেয়েছি।
এই সুযোগটা আমরা পৌঁছে দিতে পারি তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অবদান হলো যোগাযোগ বা তথ্য আদান প্রদানকে সহজ করে তোলা। গ্রামের একটি স্কুলে গণিতের শিক্ষক যদি নাও থাকে, তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আমরা সেই সুযোগটা এনে দিতে পারি। শহরের স্কুলে যা পড়ানো হয়, সেটার ভিডিও রেকর্ড করতে খরচ একেবারেই নগণ্য। সেই লেকচারগুলোকে দেশের নানা জায়গার স্কুলে সরবরাহ করা, এবং প্রতিটি স্কুলে একটি ডিজিটাল ক্লাসরুম করে সেখানে সেটা শিক্ষার্থীদের কাছে এনে দেওয়াটা খুব বেশি খরচ সাপেক্ষ না। ডিজিটাল বলতে কিন্তু আমি অত্যাধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের কথা বলছি না, সামান্য একটা টিভি আর ভিডিও দেখানোর জন্য একটা ডিভিডি প্লেয়ার, এই দুইটা জিনিস থাকলেই চলে, যার খরচ এখনকার যুগে অনেক কমে এসেছে।
দেশের সর্বত্র শিক্ষা উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার আরেকটা সহজ উপায় হলো দেশের মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা। দেশের সব জায়গায় বিদ্যুত্ না গেলেও মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক গেছে। সেটাকে এবং দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রতিটি বাজারের মোবাইল ফোনের যেসব খুচরা দোকান আছে, যেখানে সবাই নিয়মিত ফোন কার্ড কিনতে বা অন্য কারণে যান, সেগুলাকে খুব সহজে কাজে লাগানো যেতে পারে। স্কুল-কলেজের নানা বিষয়ের লেকচার ভিডিওগুলোকে মোবাইল ফোনের উপযোগী করে এসব দোকানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। এর পাশাপাশি সরকারি ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রগুলোকেও লাগাতে হবে কাজে।
সামনের দিকে তাকিয়ে আমাদের আরো একটু বাস্তববাদী হতে হবে। বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরী, শিক্ষার্থী এদের সংখ্যা বিশাল। আর আমাদের দেশের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে এদের সবার মৌলিক অধিকার শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করা অসম্ভব।
দেশের সর্বত্র স্কুল বা কলেজ ভবন গড়ে তোলা অথবা সবখানে প্রশিক্ষিত ভালো শিক্ষকদের নিয়োগ করার মতো ব্যয়সাপেক্ষ কাজের বদলে আমরা খুব অল্প খরচে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে শিক্ষাকে এনে দিতে পারি। আগামী দিনের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাতে, মন জাগাতে, জ্ঞানের জগতে তাদের প্রবেশ করাতে তাই চাই তথ্যপ্রযুক্তির সফল প্রয়োগ, সর্বত্র।