আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু পরিপূর্ণ রাজনীতিকের পথিকৃৎ

প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

12

যেকোন সমাজ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক কর্ম ও নেতৃত্বে দলীয় ক্ষমতায়ন বা সুসময়ের প্রেক্ষিতে নয়, বরং বিভিন্ন নির্যাতন, নিপীড়ন, যন্ত্রণা, বঞ্চনা সহ্য করে শাসকগোষ্ঠির সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে দলীয় দুঃসময়ে যিনি নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তিনি যথার্থ অর্থে একজন পরিক্ষিত নেতার মর্যাদার সমাসীন হন। পরবর্তীতে তাঁকে কেন্দ্র করে দলীয় কর্মীদের অনুপ্রেরণা, উৎসাহ এবং পরিচ্ছন্ন রাজনীতির ধারা গতিশীল হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শিক রাজনীতির এক যুগসন্ধিক্ষণে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আওয়ামী লীগে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতিতে তাঁর যাত্রার সূচনা করেন।
অভিন্ন জাতির সমাজ ইতিহাস বিশ্লেষণে কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাঁদের অসাধারণ বীরত্ব গাঁথার জন্য ইতিহাসে একটি অধ্যায় হয়ে যান। চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস দর্শন ও সামগ্রিক রাজনৈতিক কর্মকান্ডে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নিজেকে এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় নিছক কোন ঘটনার ধারাবাহিকতা নয়, হাজার বছরের ইতিহাসে অত্যুজ্জ্বল এক অভাবনীয় অর্জন। এই অর্জনের নিকটতম পূর্বশর্ত ছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু জয়যুক্ত হয়ে পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।


সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ঐতিহ্যের দিক থেকে অতি প্রাচীন কাল থেকেই চট্টগ্রামের ইতিহাস নৈপুণ্য, বৈচিত্র্য ও সংগ্রামী চেতনায় সমৃদ্ধ। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন ‘ঈযরঃঃধমড়হম ঃড় ঃযব ভড়ৎব’ অর্থাৎ ‘চট্টগ্রাম সর্বাগে’। সমুদ্র বন্দরের কারণে প্রাচ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম। ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকেও বৈশ্বিক পরিমÐলে ছিল সুপ্রসিদ্ধ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, পরবর্তীতেও সকল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে চট্টগ্রামে অবদান সকীয় সত্তায় ভাষার। স্বর্গীয়/প্রয়াত যাত্রামোহন সেন, শেখ-এ চাটগাম কাজেম আলী, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, মাস্টারদা সূর্য সেন, লোকনাথ বল, আবদুল হক দোভাষ, রফি উদ্দিন সিদ্দিকী, সিরাজুল হক, ডা. এমএ হাশেম, খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার আনোয়ারুল আজিম, প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার, কল্পনা দত্ত, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, বাদশা মিয়া চৌধুরী প্রমুখ চট্টগ্রামের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস সৃজনে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।
উল্লেখিত ধারাবাহিকতায় যাদের অবদান অবিস্মরণীয়, তাঁরা হলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম, আবদুস সাত্তার, পূর্ণেন্দু, কাননগো, শহীদ শেখ মোজাফফর আহমদ, মাহবুবু উল আলম চৌধুরী, আবদুল খালেদ ইঞ্জিনিয়ার, জননেতা এম এ আজিজ, আলহাজ জহুর আহমদ চৌধুরী, ডা. আবু জাফর, এম আর সিদ্দিকী, এম এ হান্নান, এম এ মান্নান, আখতারুজ্জামান চৌধুরী, আতাউর রহমান খান কায়সার, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ আরো অনেকেই চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে সামগ্রিক বিবেচনায় কিংবদন্তী/জীবন্ত কিংবদন্তীর আসনে সমাসীন। এঁদের মধ্যে থেকে যাঁর অবদানকে স্বাধীনতা সময়কাল থেকে বিশেষ করে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আওয়ামী রাজনীতির দুঃসময়ে অনস্বীকার্য, তাঁর নাম প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।
বস্তুত: পক্ষে চট্টগ্রামের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নে আখতারুজ্জামান চৌধুরীর একনিষ্ঠ কর্মকাÐ এবং নির্ভীক অংশগ্রহণ তাকে বহুলাংশে স্বতন্ত্র চরিত্রের রাজনীতিক হিসেবে চিত্রিত করা যায়। মহান স্বাধীনতার মাস অর্থাৎ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এম আর সিদ্দিক, জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ হান্নান, এম এ মান্নান ও অধ্যাপক মো. খালেদকে নিয়ে একটি সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। ২৫ মার্চ থেকেই চট্টগ্রাম শীর্ষ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এমআর সিদ্দিকীর টাইগার পাসের বাসায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পাকিস্তানিদের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা করেছিলেন। রাত ১.০০টায় দিকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে জহুর আহমদ চৌধুরী বরাবরে একটি ওয়ার্লেস বার্তার মাধ্যমে বহু আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তাটি পৌঁছানোর পরপরই ২৬ মার্চ চট্টগ্রামকে চারটি সেক্টরে ভাগ করে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চট্টগ্রামের শহর এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয় জননেতা মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ মান্নান ও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকে।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার এই ঘোষণা বেতারে প্রচার করার সিদ্ধান্ত হয় বান্ডেল রোডস্থ আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর বাসগৃহে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমআর সিদ্দিকী, জহুর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক মো. খালেদ, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। যদিও ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি বাংলা ও ইংরেজিতে প্রচারপত্রের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিলি করা হয়। এই বিবেচনায় আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ও তার বান্ডেল রোডস্থ বাসভবন স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ে পরিণত হয়ে যায়। পরবর্তীতে তার আবাসিক ভবন জুপিটার হাউজ ছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও গেরিলা কর্মকাÐ পরিকল্পনা ও বৈঠকের কেন্দ্রস্থল। মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ছোট ভাই বশিরুজ্জামান চৌধুরী লাল সবুজের পতাকায় স্বাধীন বাংলাদেশের পরিচিতিতে লাখো শহীদের একজন হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
মাটি ও মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে তাদের সুখ-দুঃখের জীবন গাঁথায় আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এমনভাবে অচ্ছেদ্য হয়ে আছে, যে কারণে তাঁর জন্মস্থান বা নির্বাচনী এলাকা আনোয়ারা-পটিয়া আসনে সাধারণ জনগণের হৃদমাঝারে চিরনন্দিত হয়ে রয়েছেন। ১৯৭৫ পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে যথাযথ পথে পরিচালনা ও দলকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর অবদান সর্বজন স্বীকৃত। ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ২০০৮ সালে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সাংসদ নির্বাচিত হয়ে জনগণের কল্যাণে এবং এলাকার উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। ১৯৭৮ সাল থেকে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘ কাল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বদান ছাড়াও তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পর্ষদের সদস্য, শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক এবং ২০১১ প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের উচ্চমার্গে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
১৯৪৫ সালের ৩ মে আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর গ্রামে জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। ১৯৫৮ সালে পটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করে ঢাকা নটরডেম কলেজে ভর্তি এবং ১৯৬৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ (এসোসিয়েট) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি বড় ভাই বশিরুজ্জামানের সাথে ব্যবসায় যোগ দেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রামসহ পুরো বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অভুতপূর্ব নেতৃত্বদানের জন্য দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যবসায়ী নেতার আসনে মর্যাদাসীন হন। তিনি দু’বার চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি ও আইসিভুক্ত ইসলামী চেম্বারের সহ-সভাপতি দায়িত্ব পালন করে দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী নেতা ও প্রতিনিধি হিসেবে বরেণ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন।
চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে শিল্পবাণিজ্যের অগ্রগতিতে প্রয়াত এ কে খান, এম এম ইস্পাহানি, মির্জা আবু আহমদ, এম আর সিদ্দিকীসহ প্রমুখের ন্যায় আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর অবদান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। উল্লেখযোগ্য যে, বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও তার সার্থক পরিচালনায় আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশের বেসরকারি খাতের দ্বিতীয় ব্যাংক তথা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) প্রতিষ্ঠাতা। তিনি জনতা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডেরও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। দেশের একজন বরেণ্য এবং নন্দিত রাজনীতিক হিসেবে নয়, একজন শিল্প উদ্যোক্তা এবং ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর অবদান দেশবাসির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার স্বাধীনতা চেতনা, নির্ভীক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একজন পরিক্ষিত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দুর্জয় সৈনিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন বলেই গণতন্ত্রের মানসকন্যা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন অতি বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। আমি তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, চবি