আকবর আউলিয়া মাওলানা ইয়াকুব আলী শাহ্ (রহ.)

35

আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন আকবর আউলিয়া শাহসুফি হাফেজ ক্বারী মাওলানা ইয়াকুব আলী শাহ আল মাইজভান্ডারী (র.)। ১২৯০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার অন্তর্গত ৫নং হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের হুলাইন গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মুছা খাঁর বংশে এ মহান অলির জন্ম। ওনার পিতার নাম মরহুম মৌলভী ইজ্জত আলী এবং মাতার নাম মরহুমা রহিমুন্নেছা। তিনি ‘ফকির মৌলানা’ নামে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পটিয়া উপজেলার হুলাইন গ্রামের একটি আলাদা ঐতিহ্য আছে। কারণ এই গ্রামে শায়িত আছেন বার আউলিয়ার অন্যতম অলি মুশকিলকোশা আউলাদে রাসূল (দ.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইয়াছিন আউলিয়া (র.), হযরত মাওলানা সৈয়দ আবদুল হামিদ, ষোড়শ শতাব্দীর হযরত শাহ্ মুহাম্মদ ইদ্রিস (র.) ও তাঁর পরবর্তীতে আলেম পুরুষ, সপ্তদশ শতাব্দীর হযরত হুছন ফকির ও হযরত গাজী লস্কর শাহ্ রহমতুল্লাহে আলাইহি, অষ্টদশ শতাব্দীর হযরত কবি মুহাম্মদ ফাজিল, সৈয়দ শাহ নজু ফকির, মাওলানা আছদ আলি, মাওলানা সৈয়দ আবদুল আজিজসহ বর্ণাঢ্য ব্যক্তিবর্গ।
শিক্ষাজীবন : ছোট বেলা হতেই আকবর আউলিয়া শাহসুফি হাফেজ ক্বারী মাওলানা ইয়াকুব আলী শাহ্ আল মাইজভান্ডারী (র.) ছিলেন অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও প্রখর মেধাবী। ওনার স্বভাব-চরিত্র, আদব-আখলাক, আচার-ব্যবহার ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও কোমল প্রকৃতির। স্থানীয় মক্তব ও বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ওনার শিক্ষা জীবন শুরু হয়, তিনি স্থানীয় স্কুলে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন, এরপর ওনার পিতা ওনাকে দারুল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। পড়ালেখায় অত্যন্ত মেধাবী হওয়ার ওনার পিতা ওনাকে উচ্চতর শিক্ষার জন্য কলকাতার আলীয়া মাদ্রাসায় প্রেরণ করেন, অতঃপর সেখান হতে কোরআন, হাদিস, ফিকাহ্, মুনতেক ও অন্যান্য বিষয়ের উপর অগাধ পান্ডিত্য অর্জন করে কৃতিত্বের সাথে টাইটেল পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ন হন। তিনি কয়েক বছর ঐ মাদ্াসায় শিক্ষকতা পেশায় কর্মরত ছিলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা লাভের পর তিনি ইউনানী হেকিমী শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন, অধ্যয়ন শেষ করে তিনি নিজ দেশে ফিরে এসে দ্বীন ইসলামের খেদমতে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।
জীবনাদর্শ : মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ এবং তার প্রিয় রাসূল (দ.) এর আদর্শের রূপরেখা হিসেবে তিনি সারাজীবন ইবাদত বন্দেগী এবং রেয়াজতের মাধ্যমে অতিবাহিত করেছেন। তিনি সারা রাতদিন হুজরার মধ্যে ইবাদত বন্দেগীতে মগ্ন থাকতেন। আওলাদে রাসূল (দ.), ইউছুফে ছানী, জামালে মোস্তফা শাহসুফি সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবা ভান্ডারী কেবলা কাবা (ক.ছি.আ.) হতে প্রাপ্ত ফয়েজে তিনি নিজেকে আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে অধিষ্টিত করেন। তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, নফল ইবাদত, জিকির মশগুল থাকতেন। তিনি অত্যন্ত সাধারন জীবন-যাপন করতেন। রাতের বেলা মশারি টাঙিয়ে তাঁকে খাটের উপর শোয়া অবস্থায় কখনো কেউ কোনদিন দেখেনি। তিনি কখনো সুসজ্জিত বিছানায় ঘুমাতেন না। তিনি প্রায় সময় মাগরিবের ওযু দিয়ে ফজরের নামায আদায় করতেন। ওনার খাওয়া দাওয়া এবং ঘুম এর প্রতি আগ্রহ খুব কম ছিল। জানা যায় তিনি গভীর রাতে কড়ি গাছের শলা কুড়াতেন। তৎকালীন বিভিন্ন মানুষ রাতে চলাফেরা করার সময় এভাবে দেখছেন বলে জানা যায়। তিনি শলা কুড়িয়ে বান্ডিল করতেন এবং দোয়া দরুদ পাঠ করতেন। তিনি সবসময় পায়ে চাঁদর রাখতেন, মাথায় পাগড়ী, হাতে লম্বা লাঠি এবং একটি সাদা ছাতা নিয়মিত ব্যবহার করতেন। উল্লেখ্য যে, তিনি সফরে যাওয়ার সময় ২/৩ টা জামা একত্রে গায়ে দিতেন।
কর্মজীবন : কর্মজীবন বলতে তেমন কিছুই ছিল না, মসজিদে ইমামতি ও মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে কয়েক বছর দায়িত্বরত ছিলেন।
বায়াত গ্রহণ ও আধ্যাত্মিকতা লাভ : প্রথমে তিনি চট্টগ্রামের অন্তর্গত রাউজান থানার অধীনে কদলপুর গ্রামের হযরত মাওলানা এজাবত উল্লাহ শাহ (র.) সুলতান পুরী এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। সংসার জীবন শুরু হওয়ার ২/১ বছর পর তিনি মজ্জুব হালতে থাকা অবস্থায় বাড়ি ত্যাগ করেন। এমনকি সুদীর্ঘ ৬ মাস পরও তাকে বাড়িতে থাকা অবস্থায় কেউ দেখত না। মাঝে মধ্যে ২/৩ মাসও চলে যেত। কোন প্রকার খোঁজ খবর ছাড়াই থাকতেন। সুদীর্ঘ ছয় মাস পর একদিন সন্ধ্যা বেলায় হঠাৎ মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সময় তার নিজ বাড়ীর উঠানে কালো জুব্বাধারী একজন লোককে দেখতে পাওয়া যায়। অতঃপর পরিবারের সদস্যরা কাছে গিয়ে দেখতে পেলেন ইনিই হুজুর সাহেব এবং উনাকে হুজরার মধ্যে নিয়ে যান। তিনি প্রায় সময় রাতে পুকুর ঘাটে পূর্বমুখী হয়ে বসে থাকতেন এবং বড় বড় কবরস্থানে নতুন কবর বুকে নিয়ে সারারাত কাটিয়ে দিতেন। তিনি বছরে ২/১ বার মশারী টাঙ্গিয়ে ৪১ দিন যাবৎ ঘর ছিল্লায় থাকতেন। সেই সময় তিনি নিরামিষ ভোজন করতেন এবং দুনিয়াবী সব কিছু হতে নিজেকে বিরত রাখতেন। এই ঘর ছিল্লায় থাকা অবস্থায় তিনি ইবাদত, দোয়া-দরুদ, জিকিরে নিমজ্জিত থাকতেন। এই মহান আল্লাহর অলীর রুহানী ফয়েজের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ দ্বীন ও দোজাহানের কামিয়াবী হাসিল লাভ করতে সক্ষম হন।
কারামত : আকবর আউলিয়া শাহ্ সুফি হাফেজ ক্বারী মাওলানা ইয়াকুব আলী শাহ্ (রা.)’র অসংখ্য কারামত ¯্রষ্টার এই অপরূপ পৃথিবীতে দৃশ্যমান হয়েছে। যা শতভাগ সত্য এবং প্রমানিত। আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর দোয়া ও নজওে এলাকা থেকে কলেরা রোগ উচ্ছেদ হয়, মহিলা ছদ্মবেশী মানুষ খেকো হতে গ্রামবাসীকে রক্ষা, পুকুওে পড়ে মৃত আপন ভাতিজিকে রক্ষা, জিন ও ভুতের ভয় থেকে বাড়ীর লোকজনকে মুক্তি দান, গভীর রাত পর্যন্ত একদল অগন্তুক পাগড়ীধারী লোকের সাথে আলোচনা, সর্বশেষ হুজুরের ইন্তেকালের পর দাফনের সময় আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এই গ্রামের একজন প্রতিবেশী জানান যে, হুজুরের মরদেহ বাড়ী থেকে মুছা খাঁ মসজিদে জানাযার সময় শেষ হওয়ার পর দাফন কার্য চলাকালনি পর্যন্ত আকাশের এক টুকরা মেঘের ছায়া ঘাটের উপর বিরাজমান ছিল বলে জানা যায়।
ইন্তেকাল : এই মহান অলি ১৩৬০ বাংলা ৯ শ্রাবণ রোজ বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজের সময় তার প্রভুর সান্নিধ্যে মিলিত হন। ঐ দিন শুক্রবারে ঐতিহ্যবাহী মুছা খাঁ জামে মসজিদের পার্শ্বে কবরস্থানে হুজুরকে সমাহিত করা হয়।
ওরশ মোবারক : প্রতি বৎসর ৯ শ্রাবণ এবং স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশিত ১৭ মাঘ পটিয়া থানার অন্তর্গত হুলাইন গ্রামের ইয়াকুব ভান্ডার দরবার শরীফে ওনার পবিত্র ওরশ মোবারক মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত ওরশ শরীফে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা এই মহান আল্লাহর অলীর ফয়েজ হাসিলের উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণ করেন। হুজুরের ইন্তেকালের পর উনার সুযোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে ছোট ছাহেবজাদা মজ্জুবে ছালেক শাহজাদা ফরিদ আহমদ আল হাছানী আল মাইজভান্ডারী (ম.জি.আ.) ইয়াকুব ভান্ডার দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন হিসেবে দ্বীন ও মাজহাবের খেদমত আন্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ৬৫ বছর যাবত শাহজাদা ফরিদ আহমদ আল হাছানী আল মাইজভান্ডারী (ম.জি.আ.) ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে নিয়ে ওরশ মোবারক যথাযোগ্য ভাব গাম্ভীর্যের মাধ্যমে পালন করে আসছেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক