আওয়ামী লীগ নেতারা সন্তুষ্ট হলেও তৃণমূলে হতাশা

রাহুল দাশ নয়ন

23

চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতারা সন্তুষ্ট। তবে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন সাজা হওয়ায় রায় প্রত্যাশিত ছিল না বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। এছাড়াও তারেক রহমানের ফাঁসির আদেশ না হওয়ায় রায় নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা বিরাজ করছে। অনেকেই আশা করেছিলেন, ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় হবে। গতকাল রায়ের পরে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সিনিয়র ও তৃণমূলের নেতারা এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
গতকাল পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রæত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িত থাকার দায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেন। একইসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দেন। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে অপর ১১ আসামিকে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন প্রতিক্রিয়ায় পূর্বদেশকে বলেন,অনেক বিলম্বে এ রায় হয়েছে। অনেক আগেই এ হত্যাকান্ডের বিচার হওয়া উচিত ছিল। এটা ছিল লাইভ গ্রেনেড হামলা। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ আমাদের জাতীয় নেতৃত্বকে ফিনিশ করে দেয়াই ছিল এ গ্রেনেড হামলার উদ্দেশ্যে। শেখ হাসিনা ছিল প্রধান টার্গেট। সেখানে ২৪ জন শহীদ হলেও আল্লাহ শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়েছেন। বর্বরোচিত এ হত্যাকান্ডের বিচার এত দেরিতে হওয়ায় আমি অবাক হয়েছি। এ রায়ের প্রতি সবাইকে শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। রায় মেনে নেওয়া উচিত। এ রায়ের ফলে সামনে আর কেউ এমন ঘটনার দুঃসাহস দেখাবে না। খারাপ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে না। সুতরাং বাঙালি জাতির দুর্ভোগ হবে না।
তারেক রহমানের রায় নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূর্ণতা না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহামান্য আদালত যে রায় দিয়েছেন সেটাই সঠিক বলে আমি মনে করি। এ রায়কে সবার মেনে নেওয়া উচিত। আদালত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে হয়তো তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন দিলেই ভালো হবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ পূর্বদেশকে বলেন, এ রায় বাংলার ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়া ও তারপুত্র তারেক রহমানের নির্দেশে সেসময় আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের হত্যা করতেই এ হামলা চালানো হয়। যে ঘটনায় মারা যান আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী। গ্রেনেড হামলার রায়ে অনেকের মৃত্যুদন্ড হয়েছে। তবে তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে এ শাস্তি প্রত্যাশিত ছিল না। আমরা মনে করেছিলাম তার ফাঁসি হবে। এরপরেও আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। আমি মনে করি উচ্চ আদালতে এ রায় বহাল থাকবে। বিএনপি-জামায়াত মানুষ হত্যার রাজনীতিতে বিশ^াস করে। ওরা ক্ষমতায় গিয়ে শাহ এমএস কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টার ও মমতাজ উদ্দিনের মতো নেতাদের হত্যা করেছিল।
চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন পূর্বদেশকে বলেন, বিচার হওয়ায় মহানগর আওয়ামী লীগ সন্তুষ্ট। এ রায়কে আমরা সাধুবাদ জানাই। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে এ রায়ের অবজারভেশন আরো বেশি স্পষ্ট হতো। যে কোনো সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বিরোধী দলীয় নেত্রীর নিরাপত্তা দেয়া। তখনকার সময়ে আমাদের নেত্রী বিরোধী দলে থাকলেও উনাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়া হয়নি। বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য জজমিয়া নাটক সাজিয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয়েছে তারাই ঘটনার ষড়যন্ত্র করেছে এবং ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। দীর্ঘদিন আইনি প্রক্রিয়া শেষে রায় হওয়ায় মহানগর আওয়ামী লীগ মনে করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। রায় হওয়ার পর এখন নগর আওয়ামী লীগের দাবি হচ্ছে, পরবর্তী আইনি যে ধাপগুলো রয়েছে তা সম্পন্ন করে রায় যাতে দ্রæত বাস্তবায়ন হয়। রায় নিয়ে আইনজ্ঞরাই বিশ্লেষণ করবেন। আমি মনে করি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ফাঁসি হয়েছে, তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন হয়েছে। এখানেই বিএনপির জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এরপরেও তারেক জিয়ার সাজা পর্যাপ্ত না হওয়া নিয়ে যে কথা উঠছে তা সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করলেই বুঝা যাবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে চাকর-বাকরদের ফাঁসি হয়েছে। মূল যে খলনায়ক সেই তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন হয়েছে। এ রায়ে ব্যক্তিগতভাবে আমরা সন্তুষ্ট নই। রায় ঘোষণার পরই আমরা তারেক জিয়ার ফাঁসির দাবিতে সভা-সমাবেশ ও মিছিল করেছি। তার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি না হলে আরো ষড়যন্ত্র বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা উচিত।
এদিকে গ্রেনেড হামলার রায় পরবর্তী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মিছিল সমাবেশ করেছেন উত্তর, দক্ষিণ ও নগর আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। প্রতিটি সমাবেশ থেকেই রায়কে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। এসব সমাবেশে বক্তব্য রাখা নেতাদের অধিকাংশই তারেক রহমানের ফাঁসির রায়ের পরিবর্তে যাবজ্জীবন সাজা হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে দীর্ঘদিন পরে রায় হওয়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ¡াস ছিল বেশি।
নগরীর জিইসি মোড়ে নগর প্রতিবাদী নারী সমাবেশে বক্তব্যকালে নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিন বলেন, ‘নারী জাতি অবমাননাকারী পাকিস্তানী প্রেত্মাতাদের দোসর গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে। তবে মূল অনুকঘটক তারেক জিয়ার যাবজ্জীবন কারাদÐে আমরা সন্তুষ্ট নই। জাতির প্রত্যাশা ছিল সর্বোচ্চ শাস্তির মাধ্যমে ফাঁসির দড়িতে ঝুলানো।’