আইসিজির কাঠগড়ায় মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আদালতেই হোক রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান

13

মিয়ানমার সরকার দেশটির রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধনের জন্য অবশেষে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে। গতকাল বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে নেদারল্যান্ডসের হেগের পিস প্যালেসে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস-আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। মামলার বাদীপক্ষ গাম্বিয়ার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুনানি শুরু হয়েছে। চলবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। আজ হবে মিয়ানমারের শুনানি, যাতে অংশ নেবেন অং সান সু চি। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে গাম্বিয়া এবং বিকেলে মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন ও চ‚ড়ান্ত বক্তব্য পেশ করবে।
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের উপর অকথ্য নির্যাতন শুরু করেই কান্ত হয়নি; তাদেরকে চিরতরে ধ্বংস করে দেশটিকে রোহিঙ্গামুক্ত করার সব ষড়যন্ত্র মিয়ানমার সরকার ও তাদের সামরিক বাহিনী করেছে। বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিভিন্নভাবে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ ও বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেও কোন বিহীত করতে পারেনি। সর্বশেষ ওআইসির তৎপরতায় এ জেনোসাইডের আড়াই বছরের মধ্যেই মিয়ানমার কে বিচারের মুখোমুখি করা হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে এত স্বল্প সময়ে বিচারের উদ্যোগ নজিরবিহীন। এটিকে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর জেনোসাইড ও অন্যান্য নিপীড়ন চালানোর দায়ে ৫৭টি মুসলিম দেশের জোট ওআইসির পক্ষে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট মুসলিম রাষ্ট্র গাম্বিয়া গত মাসে আইসিজেতে মামলা করে। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার আন্তর্জাতিক আদালতে দায়ের করা মামলায় সমর্থন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ, কানাডা ও নেদারল্যান্ডস।
আইসিজেতে মিয়ানমারের বিপক্ষে দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশ সরাসরি কোনো পক্ষ নয়, তবে গাম্বিয়ার পক্ষে এ ব্যাপারে লজিস্টিক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ। জাতিগতভাবে নিধনের উদ্দেশে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে কয়েক দশক ধরে। কিন্তু ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে এবং সর্বশেষ গত বছরের ২৫ আগস্টের পর থেকে অভিযানের নামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু করে নির্মমভাবে। সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা, ধর্ষণের শিকার হয়েছে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী। সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে থেকেই আরো অন্তত ৪ লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রতি সমবেদনা এবং মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি সংহতি এবং রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের তাগিদ জানিয়ে আসছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। দুই দফা সময় দিয়েও তারা রোহিঙ্গাদের ফিরে নিতে টালবাহানা শুরু করে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস থেকে শুরু করে মানবাধিকার পরিষদের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বেশ সরব রয়েছেন। চীন, ভারত, জাপানের মতো দেশগুলো চায় এ সংকট এ অঞ্চলের মধ্যেই সমাধান হোক। মানবিক কারণেই প্রতিবেশী মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বাড়তি দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই বড় বোঝা। আমরা আশা করছি, এই সংকটের দ্রুত সমাধান হবে। এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, স্থিতি এবং নিরাপত্তার জন্য রোহিঙ্গা ইস্যুর রাজনৈতিক সমাধান অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক আদালতে দ্রুত বিচারের মধ্য দিয়ে সংকটের সমাধান হোক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।