সড়কে শৃঙ্খলা নেই

আইন না মানার প্রবণতা রোধ করতে হবে

8

গতকাল ২২ অক্টোবর দেশব্যাপী পালিত হয়েছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যেদিয়ে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হলেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। গাড়ি চলাচলে সেই আগের বিশৃঙ্খলা এখনও পূর্ণমাত্রায় রয়ে গেছে। সোমবার একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরুর আগে যে পরিস্থিতি ছিল, তা-ই রয়ে গেছে। উন্নতি একটু যা হয়েছে তা শুধু মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট পরার ক্ষেত্রে। প্রতিবেদকের তথ্য অনুযায়ী মহাসড়কে এখনও অবৈধ ও নিষিদ্ধ যান চলছে। ঢাকার রাস্তায় ভাঙাচোরা, ফিটনেসবিহীন বাস আগেরই মতোই চলছে। চুক্তিতে বাস চলাচল বন্ধ হয়নি। বাসে বাসে রেষারেষি, বিপজ্জনক ওভারটেকিংও বন্ধ হয়নি। যেখানে সেখানে পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধ হয়নি। মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা ও দখল উচ্ছেদ হয়নি। চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ হয়নি। ঢাকার ব্যস্ত সড়কে যেখানে-সেখানে পারাপার আগের মতোই চলছে। প্রতিবেদনটি ঢাকা ও আশেপাশের মহাসড়কগুলো নিয়ে করা হলেও অবস্থা দেখে বুঝা যায় চট্টগ্রামেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। চট্টগ্রাম নগর ও এর সাথে যুক্ত মহাসড়কগুলোতে প্রতিদিন কোন কোন না কোন সড়ক দুর্ঘটনার খবর পত্রিকার পাতায় ছাপানো হচ্ছে। ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামে বরং দূর্ঘটনার স্থানের পরিধি বেড়েছেই বলা যায়, আর তা হল ফ্লাইওভার। দেওয়ানহাট ওভারপাস, আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার ও বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে নিত্য দুর্ঘটনা চলছে। দুর্ঘটনার অধিকাংশই ঘটছে উল্টোপথে গাড়ি চালাতে গিয়ে।
আমরা দেখেছি, নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তদারকির পরও রাস্তায় আগের মতোই নৈরাজ্য রয়ে গেছে। মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচল বন্ধ হয়নি। অতিরিক্ত পণ্য বহন এখনও চলছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সড়কে গাড়ি, যাত্রী, পথচারী; কেউই আইন মানছে না। আন্দোলনের পর সড়কে আইন মানতে কড়াকড়ি করেছিল পুলিশ। প্রথমে ১০ দিনের ট্রাফিক সপ্তাহের পর ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ট্রাফিক সচেতনতা মাস পালন করা হয়। সচেতনতা মাসে ট্রাফিক আইন অমান্যের ঘটনায় সারাদেশে আড়াই লক্ষাধিক মামলা হয়েছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরের পরেই সড়কে আইন প্রয়োগে পুরনো শিথিলতা দেখা দিয়েছে। ফিরে এসেছে পুরনো নৈরাজ্যও। অভিযোগ রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কথায় সড়কে গাড়ি চলে না, বরং মালিক-শ্রমিক নেতাদের কথায় চলছে পরিবহন খাত। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সবকটি কারণই বহাল রয়েছে সড়কে। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৪৭ শতাংশই পথচারী। আগের বছরে নিহতদের ৪০ শতাংশ ছিলেন পথচারী। তাদের আরো একটি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ঢাকায় সড়ক পারাপার উপযোগী ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে ৭২টি। বেশিরভাগই ব্যবহৃত হয় না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় ওভারব্রিজ ব্যবহার বেড়েছিল। আন্দোলন থেমে যাওয়ার পর ব্যবহারও বন্ধ হয়েছে। চট্টগ্রামে ফুট ওভারব্রিজ কম হলেও যে কয়টি আছে পথচারিরা তাও ব্যবহার করেন না। এমনকি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য জেব্রাক্রসিং দিলেও পথচারিরা তা যেন থোড়াইকেয়ার করছেন। অপরদিকে গণপরিবহনসহ সকল প্রকার যানবাহনের প্রতি জেব্রাক্রসিং-এ গাড়ির গতি কমানোসহ পার্কিং না করার কথা থাকলেও গাড়ির চালকরা তা বেমালুম ভুলে গেছেন মনে হয়। ফলে পথচারির দুর্ঘটনাও কমছে না। অথচ একটু সচেতনতা বদলে দিতে পারে চট্টগ্রাম মহানগরের চিত্র। যেসব স্থানে ফুট ওভারব্রিজ ও জেব্রাক্রসিং আছে সেখানে তা ব্যবহার করলে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে। ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস নির্মাণের ক্ষেত্রে বয়স্ক নাগরিকদের কথাও মনে রাখা দরকার। শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনেকেই উঁচু ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে অপারগ হতে পারে। তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের বিষয়টি মাথায় রেখে ফুট ওভারব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি সংযোজন করা যেতে পারে। অন্যদিকে গণপরিবহনের মালিক-শ্রমিকদেরও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধ করা গেলে দুর্ঘটনা অনেক কমবে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আইন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। আর যদি সহজে তা না হয়, তবে ট্রাফিক পুলিশের উচিৎ বিধিমতে আইন মানার প্রবণতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া।