আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন!

20

দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর গুটিকয়েক সদস্যদের নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি খুন, ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এবং নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার প্রেক্ষাপটে এসব অভিযোগ এসেছে। গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে ট্রাফিক পুলিশের ‘চাঁদাবাজি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন এবং বরগুনার রিফাত হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্রে জানা যায়, পুলিশের কিছু সদস্যের সঙ্গে অপরাধীদের যোগসাজশ রয়েছে। অবশ্যই পুলিশের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ অনেক পুরনো। পুলিশের মদ্যে ব্যাপক সংস্কার ও চেষ্টা-তদ্বিরের পরও এধরনের অভিযোগ থেকে কোনোভাবেই মুক্ত হতে পারেনি আমাদের পুলিশ বাহিনী। সম্প্রতি দেশের মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সরকারে জিরো টলারেন্স নীতিতে অ্যাকশান শুরু হলে তখন মাদকের কারবারে অনেক পুলিশ সদস্যের নাম উঠে আসে। নগরীর বাকলিয়াসহ কয়েকটি থানার কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে মাদকসহ হাতেনাতে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এছাড়া আমরা লক্ষ্য করছি, এলাকার বখাটে, দুষ্কৃতকারী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের সঙ্গেও পুলিশের কিছু সদস্যের সখ্য থাকার বিষয়টি বিভিন্ন সময় নানাভাবে আলোচনায় এসেছে। যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।
আমাদের পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা আছে। জঙ্গি দমন থেকে শুরু করে বড় বড় অপরাধমূলক তৎপরতা নস্যাৎ করে দিয়েছে যে পুলিশ বাহিনী, কিছু কারণে তাদের ব্যর্থতার প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বরগুনার ঘটনাটি উল্লেখ করা যেতে পারে। গত বুধবার সকালে প্রকাশ্য রাস্তায় এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর গত রবিবার পর্যন্ত আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ নিয়ে রিফাত হত্যা মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। সর্বশেষ ঘাতক সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডকে গ্রেফতার করা হয়, তবে পুলিশ থেকে বলা হয়েছে, নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এর আগে নয়ন বন্ডসহ আলোচিত তিনজন সোমবার দুপুর পর্যন্ত গ্রেফতার না হওয়ায় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা এই অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে বলে বরগুনা থানার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে, তাতে স্বস্তিতে থাকার কোনো সুযোগ নেই। একের পর এক হত্যাকাÐের ঘটনা ঘটছে। থেমে নেই ধর্ষণ। এমনকি ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে। গত সোমবার নগরীর আকবর শাহ থানা এলাকায় এক যুবলীগ কর্মীকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর আগের দিন রবিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দিনে-দুপুরে এক বৃদ্ধা বিড়ি শ্রমিককে করাত দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহতের পরিবারের দাবি, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের লোকজন এ হত্যাকাÐ ঘটিয়েছে। পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে পাঁচজনকে আটক করেছে। নওগাঁর নিয়ামতপুরে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শরীয়তপুরের জাজিরায় কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে স্থানীয় পৌর মেয়রের ছেলেকে। নবম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলায় কামরাঙ্গীর চর আলীনগরের এক স্কুলের প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
স্পষ্ট করেই বলা যায়, অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশ থাকলে অপরাধ ও অপরাধীদের দমন করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যও সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পুলিশ যখন অপরাধের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়বে তখন অপরাধ দমন করা সহজ হবে না। আমরা জানি, আমাদের পুলিশ বাহিনীর একটি গৌরবজনক ইতিহাস আছে। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর প্রথম আঘাতটি আসে পুলিশ বাহিনীর উপর। তাদের আত্মত্যাগের উপর ভর করে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বশস্ত্র বিপ্লব। আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দেশ। বঙ্গবন্ধুর কন্যার নেতৃত্বে দেশ অর্থনৈতিক মুক্তির যে সফলতা দেশবাসী অর্জন করতে যাচ্ছে, তাতে আইন-শৃঙ্খলা ক্রমাবনতি ঘটতে থাকলে এর সুফল থেকে দেশ ও দেশের মানুষ বঞ্চিত হবে। আমরা আশা করব, অপরাধ দমনে পুলিশ একাত্তরের আরো একবার একাত্তরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ত্যাগ এবং সততার মাধ্যমে তৎপর হবে। তারা অবশ্যই ব্যর্থতার অভিযোগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।