অসহায়-অভাজনের গ্রাম আদালত

সুরেশ কুমার দাশ

8

কিছু বিষয় আছে, যারা জানেন, যাদের পড়াশোনা আছে, যাদের ফিল্ড- তারা সেই বিষয়ে লিখলে ভালো। তারা সবচেয়ে বেশি বোঝাতে সক্ষম হবেন টার্গেটগ্রæপকে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়। এবং সাংবাদিক সম্মেলন সে পর্যন্তই, কোনোভাবে ছোট একটু করে নিউজ ধরানো বড়জোর। মিডিয়া ডিলিংটা না বুঝলে, প্রয়োজনীয় বিষয়ে যদি সফলতা না আসে তাহলে জনসমাজের জন্য ক্ষতি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনে করা হয়- মিডিয়া দিয়ে অনেক কিছু আয়ত্বে আনা যায়। কিন্তু বিষয়টা সেরকম সব সময় হয়না। ধরা হয়, টাকা থাকলে বিচার নিজের পক্ষে আনা যায়। সুতরাং বিচারের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হলে যাদের টাকা আছে তাদের জন্য নয়, টাকা দিয়ে যারা সবকিছু পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করে- তাদের দমাতে হবে। তাদের দমাতে হলে যারা টাকাওয়ালা কিংবা নানাভাবে প্রভাবশালীর অবিচারের শিকার তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। সেটা গ্রাম আদালত হোক বা অন্য যে কোনো আদালত। সুতরাং গ্রাম আদালতের সচেতনতা ছড়াতে হলে আগে যাদের টাকা আছে তাদের জন্য নয়, যারা গরিব, টাকা পয়সা নেই, জুরি-মজুরি করে, অজ্ঞ-অশিক্ষিত মানুষ তাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। যাতে বিচার কিভাবে পাবে সেটা বুঝে। বিচার শুধু ন্যায় পাওয়াই নয় একইসঙ্গে অন্যায়ের শিকার ব্যক্তির অধিকারচেতনাও বাড়ে। আর অন্যায় বিচারের মুখোমুখি হলে যাতে সে বলতে পারে- এই বিচার তিনি বা তারা মানেন না। গ্রাম আদালতে কেউ যদি ন্যায় বিচার পায়নি এমন দ্বিধায় থাকে তাহলে সেই বাদী বা বিবাদী সেটা জানাতে পারে। বা পরবর্তি বিচারের জন্য উদ্যোগ নিতে পারে। চেয়ারম্যান ছাড়া স্থানীয় ইউনিয়নের যে কোনো ওয়ার্ডের ১ জন ইউপি সদস্য বাদীর পক্ষে একইভাবে বিবাদীর পক্ষে অপর একজন ইউপি সদস্য, এছাড়া স্থানীয় ২ জন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে দুইপক্ষ নিজেদের পক্ষে মনোনীত করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করার সুযোগ পাবে। এই ৫ জনের বিচারে যদি বিচারের মতামত ৪:১ হয় তাহলে পুনঃবিচার চেয়ে কোনো পক্ষ আবেদন করতে পারবে না। অর্থাৎ ৫ জনের ৪ জন একই মতামত দিলে সেই বিচার মেনে নিতে হবে। আর ৪ জনের সিদ্ধান্তে বিচার হলে সেই বিচার যদি ৩:১ হয় তাহলে সেই বিচার নিয়েও আর পুনঃ আবেদন করা যাবে না। কথা হল- গ্রামে দীন-দুঃখী, অসহায় মানুষ তাদের কয়জন জানেন- বিচারব্যবস্থার এই নিয়মের কথা। তার মানে বিচারে ইউপি চেয়ারম্যান একা রায় দিতে পারবেন না। তিনি সহ ৫ জনের ৪জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই এ বিচারের রায় ইউপি চেয়ারম্যান দিতে পারবেন। এরপর আরও কথা আছে- চেয়ারম্যানের জরিমানা করা ছাড়া আর কোনো শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু এটা কি মানা হয় কিংবা গ্রামের সাধারণ মানুষ এটা জানে? এসব সাধারণ মানুষ বিচার চাইতে গিয়ে যদি হয়রানি ও অবিচারের সম্মুখিন হয় তাদের পরবর্তি প্রজন্মের কাছে ঘৃণা ও বিদ্বেষের শিকার হবে- এ অন্যায় ও অব্যবস্থাপনার চালকরা।
অজ্ঞ ও অশিক্ষিত মানুষের কথা বাদ দিলেও গ্রাম আদালত যে সরকারের একটা বিধি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলে, সেটা অনেক শিক্ষিত মানুষও জানে না। যেখানে বিচার প্রার্থীকে কিংবা যিনি বিবাদী তাকেও অসম্মান ও অপমান করে কথা বলার কোনো নিয়ম নেই। এমনকি বিচারের বাইরে উত্তেজিত হয়ে কথা বলারও অধিকার নেই। বিচারের ফলাফল যেটা সাব্যস্থ হবে সেটা- আলাদা কথা। কিন্তু গ্রামের মেম্বার-চেয়ারম্যানদের আচার-আচরণ, বিচারের ধরন আসলে কেমন। আমাদের সামন্ত প্রথার একটা ভাব-বিহŸলতা, বদঅভ্যাস, বদআচরণ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বভাবে আছে। তারা অনেকেই মনে করেন- এটা ছাড়া মেম্বার-চেয়ারম্যান হওয়ার আর কোনো পথ নেই। ভেলকিবাজি!
গ্রাম আদালতে বিচারের জন্য কোনো টাকা পয়সার প্রয়োজন হয় না- এই কথাও বলা হয়েছে – বিচারের আবেদন লেখার একটা ফরমও গ্রাম আদালত বিনা পয়সায় সরবরাহ করবে। কিংবা এ ফরমটি বিচারপ্রার্থী পাবে। এখানে ফরমের কথা বাদই দিলাম। এখন বিচারের জন্য উভয়পক্ষকে টাকা খরচ করতে হয়। দিন দিন এ বিষয়টি প্রকট আকার ধারণ করছে কোথাও কোথাও। তলে তলে দুই পক্ষকে বিচারের জন্য টাকা খরচ করতে হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এটা ভয়াবহ রূপ পেল- ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যখন স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি আসল। গ্রামের যে একটা নিরপেক্ষ অবস্থান ছিল সেখানে রাজনীতি প্রবেশ করল। গ্রামের কাঠামোটাকে রাজনীতির উর্ধ্বে রাখতে না পারলে গ্রামে সামাজিক মিল-মহব্বত ঠিক রাখা কতটা সম্ভব। সেক্ষেত্রে হয়তো সামাজিক সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখাও কঠিন হয়ে উঠবে। আর রাজনীতিকরণ করলেও সরকারদলীয় যে ব্যক্তি সৎ ও সজ্জন মানুষ হিসাবে পরিচিত তাকে চেয়ারম্যান-মেম্বারের নির্বাচনের জন্য মনোনীত করা হয়েছে কিনা সেটা দেখার বিষয় আছে। শুনেছি সেখানে চেয়ারম্যান মনোনয়নের জন্য দলীয়ভাবে সর্বোচ্চ ভোটে বিজয়ীকে চেয়ারম্যানের জন্য মনোনয়ন দেয় দল। রাজনীতিতে আমরা দেখি- যারা এমপি হন, বা উপজেলা চেয়ারম্যান হন তাদের চেয়ে বুঝ-ব্যবস্থায় অনেক যোগ্যতাসম্পন্নরাও অনেক সময় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের নির্বাচনে আসেন। সেখানে ক্ষেত্রবিশেষে এমপি কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যানরা যেখানে বিচারের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও অনেক সময় জনক্ষতিকর, অন্যায়-অনাচারে জড়িয়ে পড়ে সেখানে কিভাবে একজন ইউপি চেয়ারম্যান তার ইউনিয়নের কাজকর্মে নিজেকে একনিষ্ট সেবক হিসাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারবে। এজন্যই গ্রামের সৎ ও নিরপেক্ষ মানুষ, অনেকটা রাজনীতিবিমুখ, কিংবা রাজনীতি করলেও যিনি গ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক মত-পথের অন্যান্য মানুষের জন্য বিঘœ সৃষ্টিকারি নয় তাকেই গ্রামের লোক বেশি পছন্দ করে। কিন্তু এখন সেই সৎ, নিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক মানুষটিকে আর চেয়ারম্যান হিসাবে পাচ্ছে কিনা গ্রামের মানুষ- সেটা সময়ই বলে দেবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি নিয়েও বলার আছে। একজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা অন্তত ডিগ্রি পাশ হওয়া দরকার। এটাও এখন সময়ের দাবি। রাজনীতিকরণের মাশুলটা যদি শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে উৎরানো যায়, সেই বিষয়টা ভেবে দেখার এখন সময় হয়েছে।
গ্রাম আদালত যারা চালান, মানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে যে আদালত চলে, সেই বিষয়টি। এটা দীর্ঘ সময়ের প্রাচীন একটা বিচারালয়। এই বিচার আদালতের যেমন সুনাম আছে, তেমনি এটার দুর্নামও কম নেই। দুর্নাম থাকার কথা ছিল না। এককথায়- এটা সৃষ্টি করা হয়েছিল মানুষের ন্যায়বিচার সহ অন্যান্য উপকারের জন্যই।
গ্রাম আদালতের একটা বড় সুবিধা হচ্ছে- সাক্ষ্য প্রমাণের বাইরে গিয়েও বিচারটা সুসম্পন্ন করা সম্ভব। এর কারণ হচ্ছে – যারা বিচারক থাকেন তারা তার ইউনিয়ন ও গ্রামের সকল মানুষের আচার আচরণ ও ন্যায় নীতিবোধ সম্পর্কে অবহিত থাকেন। কে কতটা অন্যায় বা অনিয়মে যুক্ত থাকতে পারে তা তাদের চেনাজানার মধ্যে অতি দ্রæত বুঝতে সক্ষম হন।
গ্রাম আদালত সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণ মাধ্যমের ভূমিকা শীর্ষক মত বিনিময় সভা গত কয়েক মাস অনুষ্ঠিত হয়েছিল স্থানীয় সরকারের উদ্যোগে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন আয়োজিত এই মত বিনিময় সভায় কিছু বিষয় সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা হয়। সেখানে তারা সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়েছেন। অশিক্ষিত ও অজ্ঞ মানুষ যারা- পত্রিকা পড়তে পারে না, পড়লেও সকলে খুঁটিয়ে পত্রিকা পড়ে না। গ্রাম আদালত বোঝার মত লেখাপড়াও যাদের নেই-এটা তাদের জন্য কতটা কাজ দেবে। কোন ইউপি মেম্বার-চেয়ারম্যান বিশাল কোনো অবিচার করে বসলে স্থানীয় প্রতিনিধিরা নিউজ করতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় পত্রিকা প্রতিনিধি যদি চেয়ারম্যানের অন্যায়-অবিচার গোপন করার মতলবে থাকে তাহলে সেটা তো আর আসবে না। কিন্তু এরমধ্যেও যারা বিবেকের তাড়নায় – ভালো কাজ করে তাদের তেমন খবর মাঝে মধ্যে পত্র পত্রিকায় আসতে পারে। পত্রিকা গ্রাম আদালত সৃষ্টির আগেও ছিল। কিন্তু পত্রিকা গ্রাম আদালতের বিচার ব্যবস্থাকে পাল্টাতে কি দায় নিয়েছে। কিংবা ভয়ে যারা মেম্বার-চেয়ারম্যানের কাছে যায় না- তাদের মেম্বার-চেয়ারম্যানের কাছে নিতে ভূমিকা পালন করেনি। এটা তাদের দায়িত্ব নয়। বরং সহায়তা হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমরা মিনা কার্টুন দেখি টিভিতে। এই মিনা মেয়েটি গ্রামে বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে বেশ সচেতনতা তৈরি করেছে- আমার মনে হয়। দ্বিতীয়ত মেয়ে ও ছেলের মধ্যে পার্থক্য ঘুচাতে বেশ কাজ করছে। এছাড়া শিক্ষা-স্বাস্থ্যের বিষয়েও মেয়েটি তার মা বাবাকে বোঝায়। পাড়া প্রতিবেশিকে বোঝায়। এই মিনাকে দিয়ে গ্রাম আদালতের বিচার নিয়ে কিছু সিরিজ করা যায়। আর একটা বিষয় হচ্ছে – সরকারের অনেক দপ্তরে সিটিজেন চার্টার আছে- গ্রাম আদালতের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে কিভাবে বিচার পাবে, বা ন্যায় বিচারে ব্যত্যয় ঘটতে পারে প্রক্রিয়াটা নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে সাইনবোর্ড বা ব্যানার ঝুলানোর ব্যবস্থা করা। শুধু ইউনিয়ন পরিষদে নয়, গ্রামের মসজিদের দেওয়ালে, মন্দিরের দেওয়ালে, মক্তবের দেওয়ালে, গ্রামের জনাকীর্ণ চা দোকানে- এটা ঝুলানো থাকবে। গ্রাম আদালতের বিচার ন্যায় হয়েছে নাকি ব্যত্যয় ঘটেছে সেটা যাতে লোকটা বুঝতে পারে, অন্যায় হলে তিনি পরবর্তি কি পদক্ষেপ নিতে পারেন, তা জনগণকে জানাতে এসব গ্রামের জনাকীর্ণ স্থানে সচেতনতামূলক কিছু লাগানো যায়। তাহলে বিচারপ্রার্থী জনগণ চেয়ারম্যান-মেম্বারের অন্যায় অবস্থানের বিপক্ষে মানসিক শক্তি পাবে, নিজেই পরিকল্পনা করতে পারবে। প্রয়োজনবোধে সোচ্চার হতে পারবে। গ্রাম আদালতে চৌকিদারের ভূমিকা কি থাকবে, তার ক্ষমতা কতটুকু, মেম্বারের ক্ষমতা কতটুকু এসব। গ্রাম আদালতের বিচার ব্যবস্থার সুফল পেতে হলে- এই কাজগুলো অত্যন্ত জরুরি। কিছু কিছু দেয়ালে দেয়ালে ব্যাপক স্থায়ী দেয়াল লিখনের ব্যবস্থা করা যায়। যেটা পোস্টার আর লিফলেট দিয়ে কোনো কাজ হবে না। দেয়ালের লেখাটা যাতে ১০ বছর থাকে, এরপর আবার পুনরায় লেখা যাবে। অথবা গ্রামীণ বিচারে অসন্তোষের প্রকাশের জন্য কোনো নম্বরে যদি ফোন করা যায়, সরকার এরকম আইনি সেবা দেওয়ার জন্য একটি ফোন নম্বর চালু করতে পারে।
ন্যায়বিচার শিক্ষার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যায়ের শিকার কারো ভেতরটা নির্জীব হয়ে পড়লে ওই ব্যক্তির পরিবার শিক্ষায় ফিরে আসাও কষ্টকর।
কারণ অন্যায়-অবিচার এতই ভয়ঙ্কর – মানুষের সৃজনশীল শক্তিকে, বোঝার ক্ষমতাকে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তিকে দুর্বল করে তুলে। এতে ভুক্তভোগি ভাবে- তার টাকা কিংবা প্রভাব কিংবা বিদ্যাবুদ্ধি না থাকায় তিনি বিচার পেলেননা। কিন্তু অত্যাচারের শিকার একজন যখন বিচার পাবে, তখন তার আত্মশক্তি জাগরিত হবে। আত্মশক্তির জাগরণ হওয়া মানে কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত না করা। সেখানে টাকার অন্যায় শক্তি তার ন্যায়ের পথরোধ করতে পারবে না। এই বোধটা সৃষ্টির জন্য গ্রাম পর্যায়ে ন্যায় বিচার অত্যন্ত জরুরি।
গ্রাম আদালত হচ্ছে স্থানীয় ঝগড়াবিবাদগুলো স্থানীয় পর্যায়ে মীমাংসা ও সমাধান করার জন্য একটি পুরনো প্রতিষ্ঠান। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এই আদালত পরিচালনা করেন।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকারের গ্রাম আদালত বিষয়ক একটি ত্রৈমাসিক বৈঠকে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল- সেখানে জনপ্রতিনিধিরা কিছু কথা বলেছেন – সেগুলো তুলে ধরছি – থানা -পুলিশ এখন গ্রাম আদালতে বিচারিক কাজগুলো অনেকাংশেই সমাধা করছে। পুলিশের কারণে গ্রাম আদালত গুরুত্ব হারাচ্ছে। এমনকি অস্তিত্ব নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ ও ইউএনও’র কাছে গেলেও গ্রাম আদালতের গুরুত্ব কমছে। চেয়ারম্যানের উচিত- ইউএনও এর কাছে জবাবদিহি করা। গ্রাম আদালতে এজলাশ তৈরি করা। ইউনিয়নে বিচার প্রার্থী কোনো ব্যক্তির সঙ্গে চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈরি সম্পর্ক থাকতে পারে। আর গ্রাম আদালতের উপর প্রভাব খাটানোর জন্য সংসদ সদস্যের হোমরা চোমরা( মানে রাজনৈতিক কর্মি) থাকতে পারে। চেয়ারম্যানের কথা বলা হয়েছে- পাগলও নিরপেক্ষ নয়, সেখানে চেয়ারম্যান কেন? আর এক ইউএনও’র প্রস্তাব গ্রাম আদালতকে জুডিশিয়াল হেল্প দেওয়া। এখন একটু আলোচনায় আসি-আসলে নির্বাচনের আগে নানা কথা বলে নির্বাচন করলেও -পরবর্তিতে সেটা আর দেখা যায় না নির্বাচিতদের কাজকর্মে। কোথাও কোথাও গ্রাম্য টাউটদের মাধ্যমে সবকিছু পরিচালিত হয়। গ্রাম আদালতকেও এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে পৃথক করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটাই গ্রাম্য আদালত। এর ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। সেটা ভাগ্য বরাতের জোরে কালেভদ্রে কোনো কোনো এলাকায় দেখা মিলতে পারে।
এভাবে বলার কারণটা -উপরের জনপ্রতিনিধিদের (তাদের বেশিরভাগ ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান) মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার হবে। তাদের কেউ-আসলে গ্রাম আদালতের উপর আস্থা রেখে কথা বলেননি। রাখা যায়- এমন কোনো আস্থা তাদের নিজেদেরও নেই। এভাবে বলাটা অত্যন্ত হতাশার। কিন্তু গ্রাম আদালতের বাস্তব অবস্থা কি- এজন্য স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের গোপনে খবর নেওয়া দরকার। বিচার পাওয়া না পাওয়া বড় কথা নয়- শুধু বিচারের প্রক্রিয়া তৈরি করার জন্য কত টাকা খরচ করতে হয়। এবং কয় দফায়, কতবার বিচার বসাতে হয়। বিদেশে থাকে দুবাইওয়ালা-মাস্কেটওয়ালা- তার ভাই, মা-বাবা ও বউ-বাচ্চার লাখ লাখ টাকা তখন কোথায় যায়। শেষ পর্যন্তও বিচার না পেয়ে হতাশ হতে হয়। তারপর বড় আশা নিয়ে পুলিশের কাছে যাওয়া হলো- তারপর শুরু হয়- মামলা নয়- পুলিশের ‘মিটমাট’ করে দেওয়ার নতুন খেলা। এই দফায়ও উভয়পক্ষের টাকার শ্রাদ্ধ। প্রথম দফায় ‘শ্রাদ্ধের ভোজ’ খায় গ্রাম আদালতের কোনো কোনো মেম্বার-চেয়ারম্যান এবং তাদের দালালরা। দ্বিতীয় দফায় জনগণের সেবক পুলিশ। তারপর এক পক্ষ টাকা খরচ করতে করতে ফতুর হয়ে গেলে- বিচার অন্য পক্ষের জন্য এক তরফা হয়ে যায়। ভুক্তভোগী চরম হতাশ। আর বেশি বাড়াবাড়ি চালাতে থাকলে ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশ কোনো পক্ষের হয়ে একটা মারামারি, ভাঙাভাঙি প্রক্রিয়া তৈরি করে দেয়। তারপর তার চাহিদামত এক পক্ষকে ভাঙচুর, নারী নির্যাতন, লুটপাট এই ধরনের একটা মামলা নথিভুক্ত করে চালান দিল। আবার বলছি – গ্রাম আদালতের কাছে আশ্রয় না পেয়ে কোথায় গেল, পুলিশের কাছে গেল, সেখানে যাওয়ার পর পুলিশ কি করল। মনে হয় এজন্যই একজন ইউএনও জুডিশিয়াল সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করেছেন। অর্থাৎ গ্রাম আদালতের বিচার পাওয়ার জন্য আর কতদূর যেতে হবে। কেউ তো গ্রাম আদালতকে আস্থায় রাখতে পারলেন না। আমি শেষ কয়েক প্যারা যেগুলো লিখলাম- বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লিখলাম। গ্রামে বিচারের নামে কি হয়- সেটার গুরুত্ব কারো কাছে নেই। দুবাইওয়ালার অন্তত কিছু টাকা আছে-মানলাম। কিন্তু অসহায়, অভাজন, গরিব, ভিক্ষুকের কি হবে। এগুলো এক একটা উপজেলায় এক এক ধরনের সমস্যা। এক এক গ্রামে এক এক ধরনের সমস্যা। কারণ – সংসদ সদস্য থেকে থেকে শুরু করে- উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়র, কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার অনেকেই ক্ষেত্রবিশেষে জড়িয়ে পড়ে। সংসদ সদস্য বা উপজেলা চেয়ারম্যান হয়তো ২/১ শতাংশ ঘটনায় জড়াতে পারেন। কিন্তু তাদের চ্যালা-চামুন্ডাদের শাসানি। প্রভাব খাটানো। আধিপত্য। এমন কিছু ঘটনা দেখা গেছে – যেগুলো ২/৩ বছর ধরে চলছে। আদৌ সমাধান হয়নি। নয়তো এক পক্ষ হতাশ হয়ে চুপ মেরে গেছে। যারা মেম্বার-চেয়ারম্যানের পর আইন আদালত চিনে না। বা আর বেশি ঝামেলায় জড়াতে চায় না। এমন কি জায়গা-জমি সংক্রান্ত মামলা হলে তো কথা নেই- হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট থেকে রায় নিয়ে আসলেও বলে- এগুলো কিছু হবে না। তখন গ্রামের টাউটরা তার পক্ষের হয়ে আর একটা সালিশ বসিয়ে হাইকোর্টের রায় পাওয়া ব্যক্তিকে দমিয়ে দেয়। তার পক্ষের লোকটার হয়ে নতুন ‘ফতোয়া’ জারি করে।
বাউল শাহ আবদুল করিমের সেই গানটা মনে আসছে- আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। ‘কে হবে মেম্বার, কে বা গ্রাম সরকার, আমরা কি তার খবরও লাইতাম’। এখন মেম্বার- চেয়ারম্যানের খবর জানা হয়ে যায়- জানতে হয়। তাদের কর্মগুণে গ্রামবাসী কীর্তনমুখর!
লিখলে আরও লেখা যায়। মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়াতে চাই না। আর যা লিখেছি- তা মানুষ জানে না- তা নয়। তবে সরকার মিনা কার্টুনে গ্রাম আদালত ঢুকাতে পারে। এটা সবচেয়ে ভালো হয়। আর ৫ জন গ্রাম আদালতের বিচারকদের মধ্যে – আমার পক্ষের ২ জন যদি টাকার জোরে বিপক্ষের হয়ে ‘গান গাওয়া’ শুরু করে তাহলে উপায়?
লেখক : সাংবদিক