অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সময়ে নৈতিক বিচ্যুতির কবলে বাংলাদেশ

এস. এম. ওমর ফারুক

46

চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে ধাওয়া করে স্কুলছাত্র খুন-কিশোরটি বাঁচার আকুতি জানালেও কেউ এগিয়ে আসেনি। (দৈনিক প্রথম আলো: ১ম পৃ: ১৭/০১/২০১৮ খ্রি); আইভীর (নারায়ণগঞ্জের মেয়র) ওপর সশস্ত্র হামলা-মুক্ত ফুটপাতের জন্য রক্ত ঝরল নারায়ণগঞ্জে (ঐ); চট্টগ্রামেও গ্যাং কালচার-৪১ ওয়ার্ডে শতাধিক গ্রæপ, বড়ভাইদের ছত্রছায়া; পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা বড় কারণ (দৈনিক আজাদী, ১ম পৃ: ২০/০১/২০১৮ খ্রি.); ছিনতাইকারীদের অবিশ^াস্য বর্বরতা-নারীকে গাড়ির চাকায় পিষে, যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা (দৈনিক প্রথম আলো, ১ম পৃ: ২৭/০১/২০১৮ খ্রি.); অভিভাবকরা সচেতন না থাকায় কিশোররা বিপথে-খুন ও জঙ্গিবাদে সম্প্রতি গ্রেপ্তার প্রায় সবাই কম বয়সী (দৈনিক পূর্বকোণ, ১ম পৃ: ২২/০১/২০১৮ খ্রি.); লাখ টাকা ঘুষ দাবি ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে (দৈনিক আজাদী, ১ম পৃ: ১৫/০১/২০১৮ খ্রি.); ইত্যাদি প্রতিনিয়ত ঘটে চলা সামাজিক বিচ্যুতিজনিত অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাবলীর মাত্র দু’সপ্তাহের আংশিক চিত্র। দেশব্যাপী প্রতিদিনই এরকম হাজার ঘটনা ঘটে চলেছে।
বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে, গউএ বা সহ¯্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ঠিক সে সময়ে দেশের সর্বত্রই ঘটে চলেছে ভয়াবহ সামাজিক ও নৈতিক বিচ্যুতি (উবারধহপব) । শত শত বছর ধরে আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে কিছু রীতি-নীতি, মূল্যবোধ ও আদর্শ। এদেশে বহুবছর ধরে ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ও খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীরা নিজ নিজ ধর্ম মেনে ও চর্চা করে কিছু অভিন্ন রীতি-নীতি, মূল্যবোধ ও আদর্শ ধারণ করে আসছিল। যেমন- এ দেশের সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছেই ছাত্র-ছাত্রীর কাছে শিক্ষক পিতৃতুল্য, শিক্ষকের কাছে ছাত্র-ছাত্রী পুত্র-কন্যাতুল্য, আত্মহত্যা মহাপাপ; মানব হত্য মহাপাপ; দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ; চরিত্রহীনতা-পাপাচার, নীতিহীনতা; গুরুজন অবাধ্যতা; ঘুষ-দুর্নীতি বেহায়াপনা; সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি ঘৃণিত নিন্দনীয় ও দোষণীয় ছিল আমাদের সামাজিক মূল্যবোধে। আর সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের ঐতিহ্যমন্ডিত এই মূল্যবোধ থেকে ভয়াবহ বিচ্যুতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে মফস্বলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত। নেশা দ্রব্য (মাদক) চোরাচালান যে সমাজে জঘন্য ঘৃণিত বিষয় ছিল, সে সমাজ আজ নেশাদ্রব্য আর চোরাচালানের কবলে আকন্ঠ নিমজ্জিত। টেকনাফের মুর্খ কিশোর, প্রভাবশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে জাতীয় পতাকাবাহী একমাত্র বিমান সংস্থার সুশিক্ষিত ঊধ্বর্তন কর্তাব্যক্তি পর্যন্ত ইয়াবা আর সোনা চোরাচালানীতে যুক্ত হয়ে পড়েছে বলে যা পত্রিকান্তরে দেখা যায়।
শতাব্দী ধরে যে আত্মহত্যা মহাপাপ হিসেবে ঘৃণিত ছিল, তা যেন আজ সর্বত্রই এক গৌরবের বিষয় হয়ে পড়েছে। পত্রিকায় এত ব্যাপক অপমৃত্যুর খবর বের হচ্ছে যা পড়ে মনে হয় এদেশ যেন এক মৃত্যুপুরী।
যে ব্যবসাকে এক সময় অতি পূত পবিত্র ভাবা হত, তা যেন আজ মানুষ ঠকানোর এক আধুনিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। অনেক বয়স্ক মুরব্বী মনে করছেন সমাজের প্রতিটি সেক্টরে পচন ধরেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কেউ কথা বলছে না কেন? সবাই কি অর্থের পিছনে দৌঁড়াচ্ছে ? নাকি এই বিচ্যুতিকে প্রযুক্তি ও বিশ্বাসনের আবশ্যিক অনুষঙ্গ হিসেবে মেনে নিচ্ছে? নাকি সব কিছুকে রাজনীতির সাথে গুলিয়ে ফেলছে।
বাংলাদেশে চলমান ভয়াবহ ‘সামাজিক ও নৈতিক’ বিচ্যুতি থেকে যুবসমাজ, ছাত্র-সমাজসহ সর্বস্তরের জনগণকে রক্ষার জন্য পরিবার ও সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় অন্যতম শর্ত হচ্ছে স্থিতিশীল সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ। এক্ষেত্রে সরকারের নীতি নির্ধারকরা সমস্যাকে ড়াবৎষড়ড়শ (ওভারলুক) না করে ‘সামাজিক নিয়ন্ত্রণে’ সমাজ বিজ্ঞানী ও ধর্মীয় নেতাদের পরামর্শ গ্রহণ করলে নির্দেশনা মিলবে।
বলাবাহুল্য, পৃথিবীর উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ বিচ্যুতি থেকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাজটি করে থাকে সাধারণত : বিধিবদ্ধ আইন ও প্রতিষ্ঠান দ্বারা। অর্থাৎ আইন-আদালত, থানা-পুলিশ কিংবা অনুরুপ প্রতিষ্ঠান দ্বারা। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ বিষয়ে এ লেখায় বিস্তারিত না বললেও সরকার নিজের একান্ত দর্পণে বিষয়টি সম্যক অনুধাবনে সক্ষম হবে নিঃসন্দেহে।
বর্তমান অস্থিরতা ও বিচ্যুতি থেকে বাংলাদেশের জনগণকে রক্ষার জন্য সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বাহন হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তথা ধর্ম এবং আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক বন্ধন তথা পরিবার।
আমাদের দেশের প্রায় সকল ধর্মের মানুষই ধর্মভীরু। এদেশে ধর্মকে তথা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী সহজ সরল মানুষকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের যে পরিমাণ প্রবণতা দেখা যায়, তার যৎ সামান্য পরিমাণ ব্যবহার দেখা যায় না মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সংরক্ষণে। অথচ বর্তমান ভয়াবহ বিচ্যুতি থেকে এ দেশের মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে উদ্ধার করতে পারে ধর্ম। কারণ সকল ধর্মই পার্থিব জীবনে ব্যক্তিকে সৎ, কর্তব্যপরায়ণ, সত্যবাদী, বিনয়ী, দেশপ্রেমিক হওয়ার শিক্ষা দেয়। ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ জানে-তার কাজ-কর্ম,আচার-আচারণ সমাজের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে গোপন করা গেলেও মহানষ্টার কাছ থেকে গোপন রাখা যাবে না। ফলে মানুষ নিজ থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। এক্ষেত্রে বর্তমান অবক্ষয় থেকে দেশের জনগণকে রক্ষার জন্য মসজিদ, মন্দির, গির্জার প্রধানের ভূমিকা, ধর্মীয় পন্ডতিদের লেখালেখি এবং শিক্ষাদান ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক সমাজের প্রায় পরিবার এর কর্তারা টাকা পয়সা, ভোগবিলাস, গাড়ি-ফ্ল্যাট এসবের পিছনে মাত্রাতিরিক্ত মনোনিবেশ করতে গিয়ে নিজেই সামাজিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে অনৈতিকতার পথে পা বাড়ান। ফলে তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ সন্তান-সন্ততি হয় আত্মহত্যা করছে, না হয় পিতা-মাতাকে বৃদ্ধানিবাসে পাঠাচ্ছে। অথচ হাজার বছর ধরে এদেশের পরিবার ছিল একটি শাসত প্রতিষ্ঠান। পরিবার থেকে মানবশিশুর শিক্ষা, ধর্ম, ন্যায়-নীতি, মূল্যবোধ ইত্যাদি শিখে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় সমাজের সদস্য হয়ে দায়িত্ব পালন করে। এদেশের পরিবারের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা গেলে বর্তমানের ভয়াবহ বিচ্যুতি থেকে সমাজ ও সামাজিক মূল্যবোধকে রক্ষা করা যাবে। লেখা শেষ করার আগে সকলকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই শত বছর আগের এক জ্ঞানীর কিছু প্রশ্নঃ দেশের বিদ্বান ব্যক্তি লোভী হলে কে দেশের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করবে? দেশের নেতৃবৃন্দ ঐশ^র্যের পিছনে ছুটলে সাধারণ মানুষ কাকে অনুসরণ করবে? দেশের ব্যবসায়িগণ অসাধু হলে মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে? দেশের সৈন্যদল দেখবার শোভা হলে কে দেশকে রক্ষা করবে? দেশের প্রশাসন, বিভাগীয় প্রধান কর্মকর্তাগণ এবং ন্যায়দন্ড দায়ী বিচারকমন্ডলী দায়িত্বহীন হলে কে নিপীড়িত জনগণকে রক্ষা করবে ?

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক