অমানিশার সুখ

আব্দুস সালাম

34

সেই দুপুর থেকে রাহিল নদীর পাড়ে নির্জন স্থানে একাকী বসে আছে। অনুশোচনার দহনে পুড়ে পুড়ে ছাই হচ্ছে। কমরেও জোর পাচ্ছে পাচ্ছে না যে সে উঠে দাঁড়াবে। ক্লান্ত সূর্যটা পশ্চিম আকাশে পা বাড়িয়েছে। তাই সূর্যের তেজটাও কমে গেছে অনেকখানি। আর কিছুক্ষণ পরেই পৃথিবীটা কালো আঁধারে ঢেকে যাবে। তারপর কী করবে রাহিল? নদীর পাড়ে বসে বসেই কী সারারাত কাটিয়ে দেবে? নাকি উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আরও ঘৃণ্য পথ বেছে নেবে? থরে থরে সাজানো পরিকল্পনাগুলো একটার পর একটা তার সামনে এসে দাঁড়ায়। সে কী করবে তা হিসাব-নিকাশ করেও কোন কূলকিনারা করতে পারে না। একটা জায়গায় এসে পরিকল্পনাগুলো থমকে দাঁড়ায়। অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় কেউ যদি একটা উপায় বাতলে দিত ভুলের প্রায়শ্চিত্য করার জন্য তাহলে রাহিল মরেও শান্তি পেত। বড্ড ভুল করে ফেলেছে আজ রাহিল। ঝর্ণার গায়ে হাততোলা তার মোটেও ঠিক হয়নি। হাত তোলার আগে আর একটু ধৈর্য ধারণ করা উচিত ছিল তার। ভেবেচিন্তে তারপর না হয়…। ইস! তার একটু ভুলের জন্য সবকিছু এলোমেল হয়ে গেল।
দুঃশ্চিন্তার বোঝা মাথায় নিয়ে রাহিল ঘনিষ্ট বন্ধু রাফির বাসার দিকে হাঁটা দিল। রাফিকে না পেয়ে সে বারান্দায় পড়ে থাকা চেয়ারের উপর বসে তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ততক্ষণে আঁধার নেমে এসেছে। আকাশের তারাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চারিদিকে ঝিঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। গালে হাত দিয়ে বসে আছে রাহিল। এমনসময় কাঁধে রাফির হাত পড়তেই তার চেতনা ঘুম ভেঙে যায়। উৎফুল� কণ্ঠে রাফি বলে উঠল- “কিরে দোস্ত কখন এলি? আমাকে একটা মোবাইল করতে পারতিস?”
: এই তো এখনই এলাম। খুব বেশি অপেক্ষায় করতে হয়নি।
ঘরের তালা খুলে রাফি ঘরে প্রবেশ করে। পিছন পিছন রাহিলও ঢোকে। রাফি চেয়ারটি টেনে রাহিলকে বসতে দেয়। সে রাহিলকে বলে, কীরে তোকে এত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন? কোন সমস্যা? “দোস্ত খুব ভুল করে ফেলেছি। ঝর্ণার গালে খুব জোরে একটা থাপ্পড় দিয়েছি।” “কিন্তু কেন?” ও সবসময় আমাকে সন্দেহ করে। এত সেজেগুজে কার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি বলে জানতে চাইলে আমার ভীষণ রাগ হয়ে যায়। আর মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। ভাবলাম ও আমাকে ক্রিটিসাইজ করছে। তাই…। কিছুটা মুচকি হেসে রাফি বলে। “আরে তুই রাগছিস কেন? সন্দেহ করাতো সৌভাগ্যের বিষয়। তোকে সে খুব ভালোবাসে। ও চায় না যে তোর প্রতি কারোর নজর পড়ুক। তবে কাজটা তুই ঠিক করিসনি। তুই ওকে সরি বল। নিজের স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাইলে কিছু হয় না। তুই যা। দেখবি ঠিক হয়ে যাবে।”
রাফির কথাগুলো শুনে রাহিলের মনের মধ্যে একটা ভিন্ন স্বাদের ভালোবাসার বীজ অঙ্কুরিত হয়। ঝিমিয়ে পড়া শিরা-উপশিরাগুলো সজাগ হয়ে গেল। এরকম একটি পরামর্শ পাওয়ার জন্যই যেন সে অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। ঝর্ণার সম্মুখে হাজির হওয়ার জন্যই সে দ্রæত বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। দরজায় তালা দেওয়া দেখে মনের মধ্যে একটি অজানা ভয়ের বিস্ফোরণ ঘটে। বুকের মধ্যে মৃদু কম্পন শুরু হয়। কম্পমান হাতে তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করতেই দেখে টেবিলের উপরে পেপার ওয়েটে চাপা দেওয়া একটা চিরকুট। তাতে লেখা- তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য দুঃখিত। আপাতত বাবার বাড়েই যাচ্ছি। সাড়ে ১১টায় ট্রেন। ইতি- ঝর্ণা। ট্রেন ছাড়ার এখনও প্রায় ঘণ্টা খানিক বাকি। এখনই স্টেশনে যেতে হবে। কালবিলম্ব না করে রাহিল দ্রæত স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। স্টেশনে পৌঁছে সে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে ঝর্ণাকে। তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। বুকের কাঁপুনিটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার। স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা গাছের নিচে সহসায় তার দৃষ্টিটা আটকে যায়। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় তার দিকে। যতই এগুতে থাকে হৃদকম্পের বেগটা ততই প্রশমিত হতে থাকে। সে কোন ভিন্ন নারী সে নয়, ঝর্ণা। তখনও দুই কপোল বেয়ে অশ্রুর বন্যায় বুকের বসন ভিজাচ্ছে সে। কণ্ঠস্বর শুনেই ঝর্ণা রাহিলের দিকে মুখ তুলে তাকায়। অভিমানের সাগরে ঝর্ণা আবার মুখ লুকিয়ে রাখে। নয়নের তপ্ত বারি মুছিয়ে দু’বাহুর বন্ধনে আবদ্ধ করে রাহিল ঝর্ণাকে। আর বলে আমার ভুল হয়েছে। সরি ঝর্ণা সরি। ট্রেনের হর্ন শোনার পর ঝর্ণা নিজেকে মুক্ত করে। ঝর্ণার হাত থেকে ট্রেনের টিকিটটা ছিনিয়ে নেয় রাহিল। সেটি টুকরা টুকরা করে শূন্যে ছুঁড়ে দেয়। অবশেষে ঝর্ণাকে নিয়ে সে বাড়ি ফিরে যায়।
ঝর্ণার চাঁদ মুখে যে গ্রহণ লেগেছিল তা এতক্ষণে কেটে গেছে। অভিমান ভুলে ঝর্ণা রাহিলকে জিজ্ঞাসা করে ভাত খেয়েছ? “খাওয়ার কথা ভুলে গেছি।” রাহিল উত্তর দেয়। “রান্নাঘরে তোমার খাবার ঢাকা আছে। খেয়ে নাও।” একথা শুনে ঝর্ণার প্রতি রাহিলের ভালোবাসা শতগুণে বেড়ে যায়। একসময় একে একে সকল অভিমান পর্বের অবসান ঘটে। অতীতের সকল ভাললাগাকে হার মানায় আজকের এই অমানিশা। আজকের মতো এত মধুর অমানিশা সে আগে কখনও উপভোগ করেনি। রাহিলের কাছে মনে হয় ঝর্ণাই তার জীবনের সকল সুখের উৎস।