বিশ্ব হাতি দিবস কাল

অভয়ারণ্যের হাতি ৯ কারণে লোকালয়ে

রাহুল দাশ নয়ন

14

বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাতটি অভয়ারণ্যের মধ্যে ছয়টিকেই হাতির বিচরণক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে কিছু হাতি পাশ্ববর্তী দেশ থেকে নেমে আসলেই বেশিরভাগ দেশীয় হাতির বিচরণ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের চরিহরিৎ বনাঞ্চলে। অভয়ারণ্যে এক সময় হাতির অবাধ বিচরণ দেখা গেলেও তার সংখ্যা দিনদিন কমছে।
খাদ্যোপযোগী উদ্ভিদের অভাব, হাতি চলাচল রাস্তা পরিবর্তন, বসতি স্থাপনসহ নয় কারণে অভয়ারণ্যের বন্যহাতি প্রায় সময় লোকালয়ে চলে আসে। সার্কাস ও চাঁদাবাজিতেও বনাঞ্চলের হাতি ব্যবহার হচ্ছে নিয়মিত।
এভাবে ভয়ানক সংকটকাল পার করলেও বনাঞ্চলে বন্যহাতি সংরক্ষণে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই বন বিভাগের।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের উপ-বন সংরক্ষক মো. ছায়ীদুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘শুধু হাতি নয়, সব ধরনের প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণে আমরা তৎপর। হাতি নিয়ে কিছু বেসরকারি সংস্থা কাজ করে। আমরা তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে থাকি। বনাঞ্চলে খাবার সংকট দেখা দিলে মাঝেমধ্যে বন্যহাতি লোকালয়ে চলে আসে। এগুলোকে আবার বনে ফিরিয়ে দিতে বন বিভাগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।’বন বিভাগের মাঠ পর্যায়ের তথ্য ও আইইউসিএন এর জরিপ প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশে ২০০ থেকে ২৫০টি স্থায়ী বাসিন্দা হাতি এবং ৮০ থেকে ১০০টি অস্থায়ী কিংবা ভ্রমণহারী হাতি আছে। যারা ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম রাজ্য ও মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করে। কয়েক বছর পূর্বে বিশ^ব্যাংক সহায়তাপুষ্ট স্ট্রেংদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রটেকশন প্রকল্পের আওতায় আইইউসিএন হাতি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এতে দেশের ১১টি বন বিভাগে ২৭৯-৩২৭টি হাতির বিচরণের কথা উল্লেখ করা হয়। আইইউসিএন’র জরিপে জানানো হয়, চট্টগ্রামের দক্ষিণ বনাঞ্চলে ৩০ থেকে ৩৫টি হাতি থাকলে উত্তর বনাঞ্চলে হাতি নেই বললেই চলে। অথচ ২০০১ সালের দিকে এ অঞ্চলে ২০টির মতো হাতি দেখা গিয়েছিল। কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বনাঞ্চলে ৪০ থেকে ৪৫টি হাতি, পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর বনাঞ্চলে ৬০ থেকে ৬৫, দক্ষিণ বনাঞ্চলে ২২ থেকে ২৮টি, লামা বন বিভাগে ৩৫ থেকে ৪০টি ও বান্দরবান বন বিভাগে ১২ থেকে ১৫টি হাতির বিচরণ দেখা যায়।জানা যায়, বনাঞ্চলে হাতি না থাকা ও ঘনঘন লোকালয়ে হাতি চলে আসার পেছনে নয়টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- আবাসস্থল খÐায়ন ও হ্রাস, খাদ্যোপযোগী উদ্ভিদের অভাব, বাধাগ্রস্ত চলাচল পথ ও করিডোর, কৃষিকাজ, একক প্রজাতির উদ্ভিদ চাষ, জুম চাষ, হাতি চলাচল পথে মানব বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ, সীমান্ত এলাকায় কাটতারের বেড়া স্থাপন এবং হাতি হত্যা।এসব কারণে বনাঞ্চলে হাতি সংখ্যা দিনদিন কমে আসছে। গত দুই মাসে বাঁশখালী ও আনোয়ারায় লোকালয়ে হাতি প্রবেশ করে ব্যাপক ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে।বাঁশখালীর কালীপুর বন বিভাগের রেঞ্জার রঈছ উদ্দিন পূর্বদেশকে বলেন, বনাঞ্চলের হাতি মাঝেমাঝে লোকালয়ে এসে হানা দিচ্ছে। এখানে আমাদের উদ্যোগের কিছু নাই। জনগণকে হাতি তাড়ানোর কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেয়া আছে। এছাড়াও আইউসিএন নামে একটি সংস্থা হাতি নিয়ে কাজ করছে। তাঁরা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে।হাতির চলাচল পথে বাধা : হাতি চলাচলের পথ ও করিডোর চিহ্নিত করা আছে। বর্তমানে অধিক জনবসতি, সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণের কারণে হাতি চলাচলের পথে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনাঞ্চলে আগে রাঙ্গুনিয়া থেকে রাজস্থলী ও চুনতি থেকে নাইক্ষংছড়ির দুটি পথে হাতি চলাচল করতো। এ পথ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে দুধপুকুরিয়া-সুখবিলাস-খুরুশিয়া-কমলছড়ি-পদুয়া-ভেন্ডালছড়ি-রাঙ্গুনিয়া-দোহাজারী এবং বাঁশখালীর জলদী-চুনতি-লামা রুটে হাতির দুটি দল চলাচল করে। চট্টগ্রাম উত্তর বনাঞ্চলে আগে বাটনা-ঢাকাইয়া কলোনি-কালাপানি-সরথা-রাউজানে অংশ হাতি চলাচল করলেও এখন রুট পরিবর্তন হয়ে তা রামগড়-নেপচুন চা বাগান-আচিয়া চা বাগান-দুলু রাবার বাগান-ধুরন- গোলপাহাড়-মানিকছড়ি-ল²ীছড়ি-লামুছড়ি-বরকল-সরথা-কাউখালী-রাউজান রাবার বাগান-রাম পাহাড় অংশে চলাচল করে। অধিক জনবসতির কারণে বর্তমানে সেখানে হাতির বিচরণ নেই।কক্সবাজার উত্তর বনাঞ্চলে ফাসিয়াখালী, ডুলাহাজার, খুটাখালী, ঈদগাঁও, বাইসারী, গিলাতলী, রামু, রাজারখুল বনাঞ্চলে হাতির বিচরণ আছে।কক্সবাজার দক্ষিণ বনাঞ্চলে টেকনাফ-কক্সবাজার-নাইক্ষংছড়ির পরিবর্তে টেকনাফ, শিলখালী, বাহারছড়া, রঙ্গিখালী, হরিণখোলা, মনখালি, ইনানি, পানেরছড়া বনাঞ্চলে হাতি বিচরণ করে। সারা বছর এ বনাঞ্চলে হাতির বিচরণ থাকলেও রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পের কারণে হাতি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের হাতি চলাচল পথেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।