অভ্যাস বদলের গল্প

সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্

6

রাত এগারোটা। মা ওয়াক ওয়াক, গগগ করতে করতে এক দৌড়ে এসে বেসিনে বমি করে দিলেন। আমরা দুই ভাই-বোন রিডিং রুমে পড়ছিলাম। দৌড়ে গেলাম। ঘটনার কিছুই বুঝতে পারছি না।
ভাইয়া মার মাথাটা একটু ধরতে গেলেন। কিন্তু মা বিছার মতো লাফিয়ে উঠে একটা ঝেংরা মেরে বললেন, সর, সর আমার সামনে থেকে, সর। ধরতে হবে না। আমার ধারে কাছে আসবি না তোরা। ভাইয়া ভয়ে দুই পা সরে গিয়ে বলল, আমার সাথে এভাবে কথা বলছ কেন মা? কী হয়েছে তোমার, বলো।
মা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আমার মুখের ভিতরে সিগারেটের ধুয়া দিছে।
ভাইয়া বলল, সিগারেটের ধুয়া দিছে বলে এক্কেবারে এমন করতে হবে নাকি তোমার?
মা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, এমন করতে হবে না মানে? পচা ইঁদুরের গন্ধ। ওয়াক থু।
তারপর মা ডাইনিং টেবিলের সামনে একটা চেয়ার টান দিয়ে কোনাকুনি হয়ে বসলেন। কপালে হাত। রাগে কাঁপছে। নাক মুচছে আর বিড়বিড় করে বাবাকে কি যেন বলছে।
আর সম্ভব না। আমি আলাদা থাকব। যার ইমান আমল নেই, তার সাথে কীসের সংসার? একশ বার কিরা কসম কেটে সিগারেট খাওয়া ছাড়ে আবার একশবার সিগারেট খাওয়া ধরে। বিদ্যা নিয়ে কিরা, পশ্চিম দিকে ফিরে কিরা, কানে ধরে কিরা, আমার মাথায় ধরে পর্যন্ত কিরা কসম কেটেছে। কিরা কেটে সিগারেট ছেড়ে ধরে পান। কদিন বাদে দেখি, পান সিগারেট দুটোই খায়। আজব কারবার!
দুই.
বাবা খুব রাগী মানুষ হলেও মাঝে মধ্যে খুব দুষ্টুমি করে আমাদের সাথে। আমি ভয়ে ভয়ে বাবার ঘরে চুপি দিয়ে দেখি বাবা সিগারেট টানছে শুয়ে শুয়ে। পায়ের উপর পা দোলাচ্ছে। আর মুখে মুচকি হাসি। হাসি দেখে সাহস করে গিয়ে বললাম, কিরা কেটে কেটে সিগারেট খাও আবার মাকেও খাওয়াও, নাহ্? এহ্, আবার হাসছ কেন? এ কথা বলে এক দৌড়ে আমার রুমে চলে এলাম। ভাইয়া বলে, তোর তো সাহস কম না! এখন না দুজনেই থাপ্পড় খামু। ভাইয়া ভয়ে জোরে জোরে বই পড়তে লাগল।
বাবা কিছুই বললেন না। মা হনহন করে এসে বললেন, বালিশ দেও, অই রুমে কেউ যাবে না। রুমে বিষ। আমি অন্য রুমে গিয়ে থাকব। মা বালিশ নিয়ে অন্য রুমে গিয়ে ঠাস করে শুয়ে পড়লেন।
সব কিছু নীরব হয়ে গেল।
তিন.
দাদুর ডাক পড়ল।
খোকা, আমার ঘরে আসো। বাবার ডাকনাম খোকা। বাবা সার্ট পরে মার ঘরে গিয়ে সালাম দিয়ে দাঁড়ালেন। দাদু বললেন, তিন দিনের মধ্যে ধূমপান ছাড়বে। এটা আমার নির্দেশ।
বাবা কী যেন বলতে চাইলেন, দাদু বললেন, কোনো কথা শুনতে চাই না আমি। যাও। বাবা মুখটা ইঁদুরের মুখের চোখা করে বেরিয়ে এসে চুপ করে শুয়ে রইলেন।
দাদু আমাদের ডাকলেন, গালিব সুমাইয়া আমার কাছে আসো।
আমরা বেজার মুখে দাদুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দাদু বললেন, আজ কোনো পড়া হবে না। যাও, শুয়ে পড়ো গিয়ে।
সকালবেলা। দেখি, মা কফিতে টোস্ট ভিজিয়ে বাবার মুখে দিচ্ছে। আর হাসি হাসি মুখে কথা বলছে। দেখে রাগের আমার শরীর কাঁপছে।
ভাইয়া দরজায় একটা কাগজ টানিয়ে দিল। তাতে লেখা আছে, “আমাদের ঘরে ঝগড়া করা মহিলা ও ধূমপান করা পুরুষের প্রবেশ নিষেধ”।
মা দুধের বাটি নিয়ে দরজায় দাড়িয়ে লম্বা করে বললেন, মে আই কাম ইন মাই ডিয়ার চাইল্ড? ভাইয়া বলল, নোটিশ দেখেন প্লিজ। মা আমাদের ঝাপটে ধরে বলছেন, আর এমনটি হবে না। এবার দুধ খাও। আমি বললাম, এখন যতো আদরই করো আমরা খেতে পারবো না। রাগের চোটে গলায় কি জানি গুটি পাকিয়ে আছে। তবে ভাইয়া বলল, আরেক দিন যদি খালি ঝগড়া করতে দেখি তো আমরাও ঝগড়া করবো। আমরা ঝগড়া করে বালিশ ছিঁড়ে সারা ঘরে তুলা ছড়িয়ে রাখবো। আমাদের মধ্যে কথা হবে না কমপক্ষে বাইশ দিন। তখন কিছু বলতে পারবে না, বলে দিলাম, হু।
বাবা অফিস থেকে বাসায় দেরি করে এলেন। মা বলেন, এতো দেরি কেন আপনার? বাবা বলে নিউ মার্কেট গিয়েছিলাম। নিউ মার্কেটে কেনো?
বাবা কিছু না বলে ব্রিফকেস থেকে একে একে বের করতে লাগল ইয়া বড় বড় সিগারেট। দেশ-বিদেশের যত পদের সিগারেট আছে সব কিনে এনেছেন। কোনটা মশলার তৈরি। কোনটা চিকন, কোনটা আবার ছয় ইঞ্চির মতো লম্বা, কোনটা মোটা শুকনো পাতামোড়ানো সিগারেট। আমরা তো অবাক।
পাঁচ.
বাবা বললেন, জীবনের শেষ টানা টানবো এই তিন দিন। আমাকে কিছু বলতে পারবে না কেউ। মা তিন দিন সময় দিয়েছেন। এটা আমি ষোলো আনা কাজে লাগাবো। এমন খাওয়া খাবো, যাতে আফসোস করে বলতে না হয়, আহারে, এই সিগারেটটা তো খেলাম না!
আজ তিনদিনের শেষ দিন। আজকেও আনলেন নানা পদের সিগারেট। এমনভাবে সিগারেট টানলেন যে, ঠিক বারোটাও বাজল, বাবা সিগারেটে শেষ টান দিলেন।
বাবা বললেন, তোমরা আমার পাশে এসে বসো।
আমরা হাসি হাসি ভাব নিয়ে বসলাম। মা-ও এলেন।
বাবা বিনয়ের সাথে বললেন, আজ তোমাদের সবার সামনে শপথ করে বলছি, আমি আর ধূমপান করবো না।
আমরা আনন্দে হাততালি দিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।