অভিবাসীদের আর্তনাদ পৃথিবীর দেশে দেশে

মোতাহার হোসেন

7

বিশ্বের দেশে দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যুদ্ধবিগ্রহ, সন্ত্রাস, সহিংসতা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, প্রাকৃতিক কারণ , বর্ণবৈষম্য, রাজনৈতিক, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির কারণে মানুষ বিভিন্ন সময়ে নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকা ও বাঁচবার প্রয়োজনে নিজ জন্ম এলাকা ছেড়ে শহরে বসত গড়তে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে ভ‚মধ্যসাগরে নৌকা ডুবির ঘটনায় অভিবাসী মৃত্যুর হার বাড়ছে মর্মে সম্প্রতি একটি খবর বেরিয়েছে। এটি উদ্বেগের। এক কথায় বলা যায়, ‘আজ বিশ্বের দেশে দেশে অভিবাসীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে আসছে আকাশ,বাতাস। আর্তমানবতার ক্রন্দনে বিশ্ব বিবেক অনেকটাই নিঃশ্চুপ। যদিও জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে কথা বলছে- কিন্তু কে শোনে কার কথা! যাক বলছিলাম কেন মানুষ অভিবাসী, উদ্ভাস্তু হয় সে প্রসঙ্গে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অভিবাসী মানুষের সংখ্যা যেমনি বাড়ছে তেমনি তাদের জীবন, জীবিকায় দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। বিশ্বের অধিকাংশ ধনী রাষ্ট্র অভিবাসীদের আশ্রয়ের পরিবর্তে ‘অভিবাসী বোঝাই ট্রলার, নৌকা নদীতে, সাগরে ডুবিয়ে মানুষ মারছে। সম্প্রতি জার্মানির ‘সুদ ডয়চে জাইটুং’ পত্রিকায় ‘আত্মশুদ্ধি’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয়, দুইশ বছর আগে ১৮২৪ সাল থেকে লাখ লাখ ইউরোপীয় নাগরিক অভাব-অনটনের কারণে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল জীবন বাঁচাতে। ১৮২৪ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ১০০ বছরে ৫ কোটি ২০ লাখ ইউরোপীয় নাগরিক আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করেছিল। এখন যেসব দেশ ও রাষ্ট্রনায়কের সিদ্ধান্তে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও বিরুদ্ধে অবস্থান তাদের অনেকেই এক সময় অভিবাসী হয়েও নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রিত হয়ে বর্তমান অবস্থানে এসেছেন। বিশ্বে এখন অভিবাসীর সংখ্যা ২৫ কোটিরও বেশি এবং তাঁরা বিশ্ব জনসংখ্যার ৩ শতাংশ। তবে বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের (গেøাবাল জিডিপি) ১০ শতাংশ হচ্ছে তাঁদের অবদান। এই তথ্য জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের।
পাশ্চাত্যজুড়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যখন অভিবাসনবিরোধী বর্ণবিদ্বেষী রাজনীতির উত্থান ঘটছে, তখন সদ্য সমাপ্ত ‘ফুটবল বিশ্বকাপে’ ফ্রান্স ও ইউরোপকে মনে করিয়ে দেয়, এই অর্জনে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে ফরাসি দলের হয়ে যাঁরা খেলেছেন, তাঁদের ৭৮ শতাংশই হচ্ছে অভিবাসী। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ফ্রান্স দলেই অভিবাসীর সংখ্যা বেশি। আবার এই অভিবাসীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই মুসলমান।
অভিবাসন, বিশেষত মুসলমান অভিবাসনের বিরুদ্ধে ইউরোপে বর্তমানে যে রাজনৈতিক হাওয়া উঠেছে, এর সূত্রপাত কিন্তু ফ্রান্সেইনমেরি লোপেনের দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের উত্থানের মাধ্যমে। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই বর্ণবিদ্বেষী দল দ্বিতীয় এবং তার আগের নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। আর এই দলের রাজনীতি মোকাবিলায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফ্রান্সের মূলধারার ডানপন্থী ও বামপন্থী উভয় দলই অভিবাসন বিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটিতে মুসলমানরা আগে যেসব ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতেন, সেগুলোর বেশ কয়েকটিই তাঁরা হারিয়েছেন। এঁদের মধ্যে কেউ লিখেছেন, ‘অভিবাসীরা ফ্রান্সকে শক্তিশালী করেছে’, ‘আফ্রিকান এবং মুসলমানরা তোমাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছে, তুমি এখন তাদেরকে ন্যায়বিচার দাও’ ইত্যাদি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রকাশনায় বলা হয়, এবারে যাঁরা বিশ্বকাপ দেখছেন, তাঁরা সম্ভবত অভিবাসীদেরকেই দেখছেন (ফলোয়িং দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ: দেন ইউ আর ওয়াচিং হাই পারফরমিং মাইগ্রেন্টস অ্যাট ওয়ার্ক)। তাদের হিসাবে এবারের বিশ্বকাপে মোট ৩২টি দলের মোট ১ হাজার ৩২ জন খেলোয়াড় অংশ নিয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ৯৮ জনের জন্ম অন্য কোনো দেশে, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ১০-এর কাছাকাছি। এমনকি আফ্রিকার দেশগুলোতেও ছিলেন অভিবাসী ফুটবলার।
মরক্কো দলে অভিবাসীর হার ছিল ৬১ শতাংশ এবং সেনেগালে ৩৯ শতাংশ। সেমিফাইনালে আসা চারটি দলের মধ্যে একমাত্র ক্রোয়েশিয়া ছাড়া বাকি তিনটিতেই। এ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জের মরমি কবি, গবেষক, সাধক ইবনে সালেহ মুনতাসির রচিত ‘রোহিঙ্গা সমস্যা; লিরিকটি প্রাসঙ্গিক। তাঁর লিরিকটি হচ্ছে,আয়রো তোঁরা আয় দেখবে তোঁরা আয় গণতন্ত্রের পরিখায়/সারা দুনিয়াটা ঘুরপাক খাচ্ছে কেমনে বিশ্ব রাজনীতির খেলায়/ভারত মহাসাগরের তীরে শ্বেতহস্তীর দেশে হিমালয়ের আদুরিতায়/ব্রম্ম দেশের কুহেলিকায় অং সান সু চি’র দেশ রোসাং রাজসভায়। হাজার হাজার বছর ধরে গ্যাড়েছে বসতি যারা রোসাং এ/ব্যবসা বাণিজের মাধ্যমে জয় করেছে তাঁরা সিল্করুট বাহুবন্ধনে/চিনা পরিব্রাজক হিউয়েনসাং ইবনে বতুতা আরবীয় বণিকরা চলেছে যে পথে/মধ্যযুগের রোসাং রাজসভায় বিকশিত হয়েছে বাংলা সাহিত্য রথে রথে/ বিশ্ব পরাশক্তিদের রাজনীতি আর বর্ণবাদের খেলায়/রোসাং এর সমৃদ্ধ রোহিঙ্গা জাতি আজ পরবাসী হলো নিজভ‚মে/বিশ্ব বর্ণবাদের থাবায় রাজনীতির পাশা খেলায় ব্রম্মদেশ আজ মহাধুমে/সারাবিশ্ববাসী তাকিয়ে দেখে রোহিঙ্গারা কিভাবে বাঁচে মহাসন্তরণে। চীনা মার্কিনীরা জাতিগত দাঙ্গা সহিংসতা নিষ্ঠুরতায় খেলে দাবার খেলা/অং সান সু চি’দের অসুরতা বর্বরতার শিকার রোহিঙ্গাদের কোথায় ভেলা/হাজার বছরের স্মৃতি ইতিহাস কথা বলে রোহিঙ্গাদের গণতন্ত্রের মেলায়/ঘৃণ্য জাতিগত সহিংসতায় রোহিঙ্গারা কেন হবে খেলায়। বিশ্ব বিবেক জাগ্রত সুরে কেন কথা বলেনা তার সুরে/সেদিন কি খুব বেশি দূরে যেদিন জাতিয়তাবাদীদের দখলে যাবে বিশ্ব দূরে/থামাতে হবে এ বর্বরতা অসুরতা সারা বিশ্বের আনাচে কানাছে/তা নাহলে গণতন্ত্র মানবাধিকারের কথা বলা অসার হবে ধুপনাছে\’’ এটা সত্যি যে, অভিবাসীরা চরম ভাবে বিদ্বেষের মুখে পড়ার তথ্য ওঠে এসেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নিবন্ধে। সুইডেনের মধ্যমাঠের খেলোয়াড় জিমি দারমাজ সিরীয় বংশোদ্ভূত।
জার্মান দল তাঁর কারণে একটি ফ্রি কিক পেয়ে গেলে সুইডেন হেরে যায়। এরপর গালি হিসেবে তালেবান, সন্ত্রাসী ইত্যাদি ডাকার পাশাপাশি তাঁকে নানা ধরনের হুমকিও দেওয়া হয়। পরে সুইডিশ ফুটবল ফেডারেশন পুলিশের শরণাপন্ন হয়। গেøাবাল কমপ্যাক্ট অন মাইগ্রেশন নিয়মমাফিক অভিবাসনের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ করে দেবে এবং একই সঙ্গে তা কোটি কোটি অভিবাসীর অবৈধ পথে দেশান্তরি হওয়ার ঝুঁকি কমাবে। মানুষের বেঁচে থাকা যখন সংকটে পড়ে তখন তা মানবিক বিপর্যয়ে পৌঁছায়। অভিববাসীদের ক্ষেত্রে এই বিপর্যয় শব্দটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাস্তাবে অভিবাসীদের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়েই চলছে নিষ্ঠুরতা, অমানবিক আচরণ। গত কয়েক বছর ধরে নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ দেশান্তরি হচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ২০১৭’র ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ কোটি ৮৫ লাখ মানুষ দেশান্তরি হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৬ লাখ মানুষ ২০১৭ সালে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে সর্বোচ্চ ৬৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করেছে। দেশত্যাগী মানুষ নিরুপায় হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশেই বেশির ভাগ আশ্রয় নিয়ে শরণার্থী হচ্ছে। শতকরা ৮৫ ভাগই পাশের দেশে প্রবেশ করে। আবার কোন কোন দেশ অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবিয়ে তাদের হত্যা করে। এর নজির আছে প্রচুর। তবুও মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে অভিবাসী হয়। এ পর্যায়ে আফ্রিকা, আরব, এশিয়ার শরণার্থীদের বেশ সংখ্যক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে। শুধু আটলান্টিক নয়, সাগর, মহাসাগর পাড়ি দিয়ে লাখ লাখ শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন প্রবেশ করছে। বর্তমান ইউরোপের অনেক দেশে শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে না। অবশ্য জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের উদার নীতির কারণে ২০১৬ সালে ১২ লাখ শরণার্থী জার্মানি প্রবেশ করেছিল। অবশ্য এসময় ইউরোপের অন্যান্য দেশ ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেনসহ অন্যান্য দেশও অনেক শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়। এর আগে ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। অভিবাসীর পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা সর্বাধিক। অনুরূপ জাতিগত নিধনের স্বীকার হয়ে গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে আরো প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের যে বর্বরোচিতভাবে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছে, পৃথিবীর শরণার্থীদের ইতিহাসে এত নির্মম ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি যে সহমর্মিতা দেখিয়েছে তা মানবতার ইতিহাসে নজির বিহীন। বাংলাদেশের এই উদ্যোগ বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হয়েছে এবং হচ্ছে। একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত যে উদার মানবিকতায় এক কোটি বাঙালিকে আশ্রয় দিয়েছিল, তা তো আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ। ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের মাঝে এই উদারতার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন বিপুলভাবে। উত্তর জার্মানির উত্তর সাগরের সমুদ্রবন্দর হচ্ছে ‘ব্রামাহাফেনে’। এখানে একটি দেশান্তরি জাদুঘর রয়েছে। এই জাদুঘরের নাম হচ্ছে ‘দেশান্তরি জাদুঘর’। এই জাদুঘরে রয়েছে ইউরোপীয় দেশত্যাগীদের মর্মন্তুদ কাহিনী, আটলান্টিকের ওপারে তাদের জীবন গড়ার কাহিনি, চিঠিপত্র, দলিল দস্তাবেজ। এই জাদুঘরে প্রবেশ পথে লেখা রয়েছে ‘এই পথ দিয়েই ৭০ লাখ জার্মান ও মধ্য ইউরোপীয় অভিবাসী অজানা পৃথিবীর দিকে পাড়ি দিয়েছিল। জানা যায়, এই পথ দিয়েই আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাদা ফ্রিডরিশ ট্রাম্প ভাগ্যের অন্বেষণে মাত্র ১৬ বছর বয়সে দক্ষিণ জার্মানির রাইনল্যান্ড ফালৎস রাজ্য ছেড়ে আমেরিকা পাড়ি দিয়েছিলেন। অথচ এখন তিনি তাঁর সেই ফেলে আসা অতীত ভুলে উল্টো অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ওঠে পড়ে লেগেছেন সেই দেশে থাকা অভিবাসীদের বের করে দিতে।
এখানে একটি কথা বলা সংগত যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যারাই অভিবাসী হয়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন এক সময় তারা তাদের জীবনাচার বদলে সংগ্রাম ও কষ্টকে মেনে নিয়ে মেধা, মনন, বৃদ্ধি, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা দিয়ে নিজের এবং যে দেশে তারা অভিবাসী হয়ে বসবাস করছেন তাদের দেশের উন্নয়নে, অগ্রগতিতে, সংস্কৃতি, খেলাধুলাসহ সব কর্মকাÐে অসামান্য অবদান রেখেছেন। যদিও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে সেই সৃজনশীলতা, মেধা, সংস্কৃকি, শিক্ষার বালাই নেই। এ কারণে তারা প্রতিবাদি হয়ে নিজ দেশে থাকতে পারেনি। বছরের পর বছর ধরেই তারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তাসহ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর হাতে নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যার স্বীকার। জাতি হিসেবে এটা তাদের জন্য লজ্জার, অপমানের। কারণ তারা নিজদের অধিকার রক্ষায়, নিজ ভ‚মিতে বসবাস করার মতো ক্ষমতা, যোগ্যতা রাখে না। এখানে একটা প্রমাণ তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক যে,পশ্চিম পাকিস্তানের তৎকালীন আয়ুব-ইয়াহিয়া সরকার পূর্ব বাংলার মানুষকে তথা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, মায়ের ভাষা বাংলা কেড়ে নেয়ার অপচেষ্টা করেছে। আর সে কারণেই বাঙালি তার অধিকার আদায়ে, বৈষম্য, অন্যায়, অবিচার, শোষণ, জুলুম, বঞ্চনা থেকে পরিত্রাণে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ মাতৃকাকে স্বাধীন করেছে। এর আগে মায়ের ভাষা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায় করেছে। অবশ্য এই অর্জনের পেছেনে রয়েছে অজুত নিযুত মানুষের আত্মাহুতি,বিপুল বিশাল সম্পদের ক্ষতি, আড়াই লাখ মা বোনের সম্ভ্রমহানি আরো কত রকম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে আমাদের-ইতিহাস তার সাক্ষী।
বিশ্বের দেশে দেশে এখন যে ভাবে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উপর নিধন,নিপীড়ন,নির্যাতন চলছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ১৯৭১ সালের আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ আলোকবর্তিকা হিসেবে অনুপ্রেরণা জোগাবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পাশাপাশি বিশ্বের অপরাপর দেশের উচিত অভিবাসীদের ব্যাপারে মানবিক আচরণ এবং মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গি প্রদর্শন করা। কারণ অভিবাসী হলেই খারাপ, অকর্মন্য,অপদার্থ হয় না তার বড় প্রমাণ বিগত বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপে বিজয়ের নেপথ্যে অভিবাসী ফুটবলাররাই গৌরব উজ্জ্বল ভ‚মিকা রেখেছে। আমরা অভিবাসী মানুষের পক্ষে, মানবতার পক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে। তাই অভিবাসীদের আর্তনাদ, আহাজারিতে বিশ্ববিবেক জাগ্রত হবে, বিশ্ব নেতৃবৃন্দ দাঁড়াবেন তাদের পাশে। তবেই মানবতার জয় হবে- সেই প্রত্যাশাই করছি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট