অবুঝ শিশুর প্রতি নৃশংসতা কত নিম্নগামী আমাদের সমাজিক মূল্যবোধ

কাজি রশিদ উদ্দিন

10

দেশে অপরাধ প্রবণতা এখন কতটা বেড়ে গিয়েছে তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে তার সমাধান খুঁজে বের করার সময় দ্রæত পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানিরা এ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন কিনা আমাদের জানা নেই। আসলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে অপরাধ প্রবণতা এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতা। তার সাথে যুক্ত হয়েছে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও। এক ঘটনার জের শেষ না হতেই নতুন করে দুঃখজনক ঘটনার অবতারণা হচ্ছে। সম্প্রতি বরগুনায় রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজধানীর ওয়ারিতে ৭ বছরের শিশু সায়মা আফরিন সামিয়া ধর্ষণ ও হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। অবুঝ শিশুর প্রতি এমন নৃশংসতা প্রমাণ করে আমাদের অবক্ষয়ের স্তর কত নিচে নেমে গিয়েছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলেও তারা সে দায়িত্ব পালনে সফলতা দেখাতে পারছে না। ফলে ধর্ষণসহ অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। আইনের প্রায়োগিক জটিলতা, যথাযথ কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা, নিস্ক্রিয়তা ও আইনের শাসনের যথাযথ অনুপস্থিতি এ জন্য প্রধানত দায়ী বলে মনে করা হয়। আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মহলবিশেষে অপরাধ ও অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা দান, বিশেষ মহল কর্তৃক অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এ জন্য প্রধানত দায়ী বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।


রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক আইভাবের মতে, আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ এমন একট সংস্থা যা আইনের যথাযথ শাসন অনুযায়ী কাজ করবে। তাদের কাজই হলো আইনের শক্তির সাহায্যে নির্দিষ্ট ভূখÐের মধ্যে সামাজিক শৃঙ্খলার সর্বজনীন অবস্থা বজায় রাখা দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাসহ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা যে এমন নিয়ন্ত্রণহীন তা সাম্প্রতিক অপরাধপ্রবণতা পর্যালোচনা করলেই উপলব্ধি করা যায়। প্রাপ্ত তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) দুই হাজার ১৫৮টি শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৯৮৮টি শিশু বিভিন্ন ধরনের অপমৃত্যু এবং ৭২৬টি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিভিন্ন বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের এক জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এই বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ হারে। বছরের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯৬ শিশু। যা গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ছিল ৩৫১, এপ্রিল এবং মে এই দুই মাসেই শিশু ধর্ষণ হয়েছে ২৪১টি, যা কিনা মোট ধর্ষণের অর্ধেকেরও বেশি। এই ৪৯৬টি ধর্ষণ হওয়া শিশুর মধ্যে ৫৩টি শিশুকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। ২৭টি প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ২৩টি শিশুকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছে। এই ছয় মাসে ১২০টি শিশু অপহরণ হয়েছে এবং ৭২টি শিশু নিখোঁজ হয়েছে। অপহরণ হওয়া শিশুদের মধ্যে ৬১ জনকে অপহরণের পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর দ্বারা জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে ২৪ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। বিগত বছরগুলোর নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাবিষয়ক অপরাধ বাড়ছে গানিতিক হারে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ২০১৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৩৩ শিশু। এর মধ্যে শুধু ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩৫৬ জন।
ধর্ষণজনিত নির্যাতনে মারা গেছে ২২ শিশু। আর যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের ফলে নিহত হয়েছে ২৪৯ শিশু। এছাড়া ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ চেষ্টা ও নির্যাতনের ফলে আক্রান্ত হয়েছে ১০০৬ শিশু। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ৫৩ জনের ওপর। জাতীয় গণমাধ্যমে ২০১৮ সালে প্রকাশিত খবর পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছে সাত থেকে দুই বছরের শিশুরা এবং সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা। এর মধ্যে শিক্ষকদের দ্বারা ১২৯ শিশু নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে। শিক্ষকদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭টি শিশু। যৌন হয়রানির শিকার ৩৩টি, ধর্ষণচেষ্টা করা হয়েছে সাতজনের ওপর।
আমাদের সমাজে অবক্ষয় বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, মূল্যবোধের অনুপস্থিতির কারণেই অপরাধপ্রবণতাও লাগামীহন। নারী ও শিশুধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনার একটি অনুষঙ্গ মাত্র। ধর্ষণ অভিনব কোনো অপরাধ নয় বরং সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথেই ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আর তা দমন, নিয়ন্ত্রণ করতে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই অপরাধকে দন্ডবিধির আওতায় আনা হয়েছে এবং অপরাধের ধরণ মোতাবেক দÐবিধিতে শাস্তির বিধানও রয়েছে। দন্ডবিধির ৩৭৬ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যতন দমন আইনে ধর্ষণের সর্বেচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদÐ নির্ধারণ করা হয়েছে। ধর্ষণজাতি কারণে ডিকটিমের মৃত্যু হলে প্রাণদÐের বিধানও রয়েছে আইনে। সার্বিক দিক বিবেচনায় আমাদের দেশে ধর্ষণবিষয়ক অইন বেশ সময়োপযোগী বলেই মনে করা যায়। কিন্তু তার পরেও এই অপরাধ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিশ্বের অপরাপর দেশেও এই অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণের নজ্য দÐবিধিতে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
চীনে আইন রয়েছে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ধর্ষককে সরাসরি মৃত্যুদÐে দÐিত করার। ইরানে ধর্ষণের শাস্তি হলো জনসম্মুখে ফাঁসি কিংবা গুলি করে হত্যা। আফগানিস্তানে শাস্তি প্রদানে এ দেশের কোনো বিলম্ব করা হয় না। ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণ চারদিনের মধ্যে ধর্ষককে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। উত্তর কোরিয়ায় দেশের স্কোয়াড আছে, যারা অভিযোগ প্রমাণের সাথে সাথেই ধর্ষকের মাথায় গুলি করে তাকে হত্যা করে। সৌদি আরবে অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হলে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রæততম সময়ের মধ্যে ধর্ষককে জনসম্মুখে শিরোচ্ছেদের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ধর্ষণ কিংবা শ্লীলতাহানির সাজা এ দেশে সরাসরি ফাঁসিকাষ্টে ঝুলিয়ে মৃত্যু। কোনো রকম দেন দরবার বা ক্ষতিপূরণের সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণের ৭ দিনের মধ্যে ধর্ষকের মৃত্যুদÐ কার্যকর করা হয়। মিসরেও একই বিধান মতে চেষ্টা করা হয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করার যাতে পরবর্তীতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পর্যন্ত না পায়। আর তা নিশ্চিত করতে জনসমাবেশের মতো করে। সবার সামনে ধর্ষককে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
দÐবিধি প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণ নিয়ন্ত্রণ ও সীমিত পরিসরে রাখা সম্ভব হলেও আমাদের দেশে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে গোটা দেশই প্রায় ধর্ষকদের অভায়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দ্রæত বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের শাসনের শিথিলতাই এর অন্যতম কারণ। মূল্যবোধের বিচ্যুতি ও মাত্রাতিরিক্ত অবক্ষয়ও এ জন্য কম দায়ী নয়। অবক্ষয়ের মূলে রয়েছে ধর্মবিমুকতা, অসহিষ্ণুতা এবং সর্বগ্রাসী অশ্লীলতার মতো আরো কিছু বিষয়। এ কথা অনস্বীকার্য যে ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধই মানুষের জীবন প্রণালী ইতর প্রাণী থেকে আলাদা করে; মানুষকে সভ্য, সংবেদনশীল ও পরিশীলিত রূপ দেয়। ধর্মহীনতা মানুষকে নামিয়ে দেয় পশুত্বেরও নিম্ন পর্যায়ে।
মূলত প্রতিটি সভ্যতাই গড়ে উঠেছিল কোনো না কোনো ধর্মকে আশ্রয় করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটি সভ্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেটি ধর্মকে বিসর্জন দিয়ে গড়ে উঠেছে। তাই একটি নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠন, অবক্ষয়হীন ও অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্প্রসারণ, লালন ও অনুশীলন করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট