পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিস

অবিরত সেবাতেও দালালনির্ভর মানুষ

রাহুল দাশ নয়ন

11

‘পাসপোর্ট ফরম পূরণ করেছেন? টাকা জমা দিয়েছেন? এবার তথ্যসেবা কেন্দ্রে যাচাইবাছাই করে লাইনে দাঁড়ান।’-পাসপোর্ট অফিসের করিডোরে কর্তব্যরত এক কর্মচারী গ্রাহককে এভাবেই বলছিলেন। কিন্তু গ্রাহক তথ্যসেবা কেন্দ্রে না গিয়ে এদিকসেদিক ঘুরঘুর করছেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানালেন, ‘এক ব্যক্তির আসার কথা। উনি না আসলে পাসপোর্ট জমা দিবেন না।’ কয়েক মিনিটের মধ্যেই গ্রাহকের মুঠোফোনটি বেজে উঠলো। গ্রাহকের অনুরোধে অপর পাশের ব্যক্তি জানালেন, ‘তিনি ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। লাইনে দাঁড়িয়ে পূরণকৃত ফরমটি জমা দিলেই নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট পেয়ে যাবেন।’ এটি গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসের চিত্র। গ্রাহকের নাম শিরিন আক্তার।
বিকেলে শিরিন আক্তারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘এক দালালের মাধ্যমে এক মাস মেয়াদের পাসপোর্টটি সাড়ে ৬ হাজার টাকার বিনিময়ে করতে দিয়েছি। দালাল নিজে গিয়ে ফরম জমা দেয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তিনি আসেননি। সব কাজ আমাকেই করতে হয়েছে। মাঝখান থেকে টাকাগুলো আয় করেছেন।’
পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মো. আল আমিন মৃধা পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমরা সেবা দিব, আপনারা বুঝে নিবেন। কেউ যদি বাইরে থেকে ফরম ভুল পূরণ করে তাহলে আমাদের কিছুই করার থাকে না। সাধ্যের মধ্যে থাকলে নিজেরাই সংশোধন করে জমা নিই। কিন্তু এমন কিছু ভুল থেকে যায় যেগুলো গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। অনেক শিক্ষিত মানুষও ফরম নিজ হাতে পূরণ না করে অন্যের সহযোগিতা নেন। তখনই ভুলটা হয়।’
বাইরে দালাল থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার অফিসের চার দেয়ালের ভেতরে কোনো দালাল পাবেন না। বাইরে থাকলে তার দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ চাইলে যখন তখন অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করতে পারে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের পূর্ব পাশেই একটি জরাজীর্ণ ভবনের নিচে অফিস করে বসেছে দালালচক্র। কেউ কেউ টেবিল-চেয়ার নিয়েই কর্মকর্তার বেশে অফিস করছেন। যেখানে প্রতিনিয়ত পাসপোর্ট ফরম পূরণসহ দেদারছে টাকার লেনদেন চলছে। পাসপোর্ট অফিসের বাইরে থাকা কয়েকটি ঝুপড়ি দোকানেই তাদের অবস্থান। জাতিসংঘ পার্ক ও পাসপোর্ট অফিসের আশপাশেই তাদের আনাগোনা বেশি। সড়কে দাঁড়িয়েও অনেক সময় গ্রাহকদের সাথে দেনদরবার করতেও দেখা যায় দালালদের।
নাম প্রকাশ না করে একজন দালাল জানান, প্রতিটি একমাস মেয়াদি পাসপোর্ট করতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ছয় থেকে আট হাজার টাকা করে নেয়া হয়। জরুরি পাসপোর্টের ক্ষেত্রে তা দশ থেকে ১২ হাজার টাকা হয়। এ টাকার একটি অংশ পুলিশ ও পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেয়া হয়। আমাদের সংগঠন আছে। সংগঠনের অধীনে পাঁচলাইশ ও মনসুরাবাদ অফিসে প্রায় পাঁচ শতাধিক লোক কাজ করছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দালাল উপাধি শুনতে আমাদেরও খারাপ লাগে। আদালতের দলিল লেখকদের ন্যায় আমরাও ফরম পূরণের মাধ্যমে কিছু টাকা আয় করছি। আদালতের দলিল লেখকরা বৈধতা পেলে আমাদেরও বৈধতা দেওয়া উচিত।
পাঁচলাইশ মডেল থানার পরিদর্শক মহিউদ্দিন মাহমুদ পূর্বদেশকে বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিস থেকে কখনো আমাদের জানানো হয়নি। এরপরেও আমরা আবারো বিষয়টি দেখবো। এর আগে আমরা বিভিন্ন সময় কয়েকজন দালালকে ধরেছিলাম। ডিবিও মাঝখানে একবার অভিযান চালিয়ে দালাল আটক করেছিল।’