অবশেষে রোহিঙ্গা গণহত্যার স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র চীন ও রাশিয়ার কাছেও এমনটি প্রত্যাশা

29

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে সৃষ্ট সংকট নতুন না হলেও ২০১৬ সালে এ সংকট আরো বেশি ব্যাপৃত হয়, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দারুণভাবে নাড়া দেয়। মিয়ানমার সরকারের সামরিক বাহিনী দেশটির কিছু সংখ্যক উগ্র ধর্মান্ধ লোকের প্ররোচনায় রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর গণহত্যাসহ দেশ থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে বিতাড়িত করে। যারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মিয়ানমার সরকারের এ বর্বর গণহত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিশ্বের সকল মানবতাবাদী ও শান্তিকামী মানুষ, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রতিবাদমুখর হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া ও চীন অনেকটা মুখে লাগাম দিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছিল। তবে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘসূত্রতা এবং মিয়ানমার সরকারের বিভিন্ন বিভ্রান্তমূলক তথ্য ও বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে ক্রমান্বয়ে তাদের নিরবতা ভাঙতে শুরু করছে বলে আমাদের কাছে প্রতিয়মান হচ্ছে। জানা যায়, চীন ও ভারতের পর এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর তারা মিয়ানমার সামরিক বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা নিপীড়নকে জেনোসাইড বা গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে । সূত্রও জানায় দেশটির কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি সভায় পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি রোহিঙ্গা হত্যা ও বিতাড়নকে গণহত্যা অভিহিত করার পাশাপাশি একইসঙ্গে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর। এ সংক্রান্ত ‘বার্ম ইউনাইটেড থ্রো রিগোরাস মিলিটারি এ্যাকাউন্টিবিলিটি (সংক্ষেপে বার্মা এ্যাক্ট) শীর্ষক একটি আইনের খসড়াও অনুমোদন করেছে। অতঃপর এই আইনটি পাসের জন্য পাঠানো হচ্ছে প্রতিনিধি সভায়। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবকরা প্রয়োজনে সিনেটেও আইনটি পাস হবে বলে আশা করছেন। বার্মা এ্যাক্টটি পাস হলে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধ থাকবে, সে দেশের জেনারেল ও পদস্থ কর্মকর্তাদের ভিসা প্রদান বন্ধসহ। অন্যদিকে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা কিনা, তা নির্ধারণের আহŸান সংবলিত একটি প্রস্তাবও বিবেচনায় নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি। ২৫ জুন ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে সিনেট কমিটির বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। সে দেশের সংবিধান অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর যেকোন স্থানে ‘জেনোসাইড’ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ ঠেকাতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর তাই কোথাও ‘জেনোসাইড’ সংঘটিত হলে এবং তার স্বীকৃতি মিললে যুক্তরাষ্ট্রকে তা ঠেকানোর জন্য অঙ্গীকার পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। এদিকে সোমবার থেকে জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৪১তম অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়টি তোলা হচ্ছে গুরুত্বের সঙ্গে। এবার বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে পারে। ইতোপূর্বে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে গৃহীত প্রস্তাবের বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্প্রতি আমরা লক্ষ্য করছি, দেরিতে হলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়ে জাতিসংঘ যথাসময়ে সজাগ হয়নি। বরং তারা গোপন রেখেছে অনেক কিছু, যার দায়িত্ব নিতে হবে তাদের। ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিশ্ব স¤প্রদায়কে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে অবশ্যই। রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর অমানবিক পরিস্থিতির জন্য ইতোমধ্যে নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর জোট ওআইসি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আহব্বানে সাড়া দিয়ে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। এই মামলা রুজুর বিষয়ে তহবিল সংগ্রহ ও কারিগরি সহযোগিতার বিষয়টি প্রশস্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্য-সহযোগিতাও অবশ্যই কাম্য। রাশিয়া ও চীনের সমর্থনও প্রত্যাশিত বৈকি। জুলাইয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের কথা রয়েছে। সেখানেও প্রধান্য পাবে রোহিঙ্গা ইস্যুটি। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক‚টনেতিক তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে।