অবশেষে অভিভাবক পেল নগরীর উড়াল সেতু

রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিককে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেছে সিডিএ

ওয়াসিম আহমেদ

20

নগরীতে অবকাঠামোর উন্নয়ন করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। উন্নয়ন শেষে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হস্তান্তর করবে- এটায় আইন। তবে সবকিছুর বেলায় আইন মানতে সমস্যা না থাকলেও ফ্লাইওভার নিয়ে হঠাৎ নাটকীয়তা শুরু করেন সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। তবে পরবর্তী চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষের উদ্যোগে নগরীর বহদ্দারহাটের এমএ মান্নান ফ্লাইওভার, মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, কদমতলী ও দেওয়ানহাট ওভারপাস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক) হস্তান্তর করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
গতকাল রবিবার বিকেলে টাইগারপাসে চসিকের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ চারটি ফ্লাইওভার হস্তান্তর করা হয়। এ সময় চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, সিডিএ এ নগরে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ৪টি ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছিল। এগুলো হচ্ছে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, এমএ মান্নান ফ্লাইওভার, কদমতলী ও দেওয়ানহাট ওভারপাস। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে এসব ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চসিকের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এগুলো আমরা রক্ষণাবেক্ষণ করবো।
তিনি বলেন, হস্তান্তরের আগে উভয় প্রতিষ্ঠানের টিম আলাদা আলাদাভাবে সার্ভে করেছে। কদমতলী ও বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে আমাদের কিছু সংস্কার কাজ করতে হবে। উপরেও করতে হবে, নিচেও করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব আমরা কাজগুলো করবো। আমাদেরও (চসিক) আর্থিক সীমাবদ্ধতা আছে। পাশাপাশি জনবলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অন্যদিকে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর একটি অ্যাক্টে দেখলাম সিডিএ সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন সংস্থা। নিয়ম হচ্ছে সরকার সিডিএর মাধ্যমে সরাসরি উন্নয়ন কাজ করে। কোন প্রকল্প করার পর স্থানীয় সরকার বিভাগের সংস্থা সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদকে হস্তান্তর করার নিয়ম রয়েছে। আমি দেখলাম ৪টি ফ্লাইওভার নির্মাণের ২-৩ বছর হয়ে গেছে কিন্তু হস্তান্তর করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখলাম। মন্ত্রণালয় সভা ডাকলো। মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দিয়েছে চসিককে হস্তান্তর করার। এরপর আমরা চসিককে চিঠি দেই। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
অবশ্য, সিডিএ ফ্লাইওভারগুলোর বাস্তবায়নের পর সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করতে নারাজি প্রকাশ করে আসছিল। নিজস্ব ‘ক্রেডিট’ হিসেবে দাবি করতে মূলত এমন নাটকীয়তার জন্ম দেন তৎকালীয় সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটাতে না পেরে বেকায়দা পড়ে সংস্থাটি। ফলে কখনও ফ্লাইওভারে নিচে দোকান বসানো, আবার কখনও টোল আদায়ের চেষ্টা চালায়। নগরীর অন্যান্য সেবা সংস্থা ও জনরোষের মুখে এসব সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় সিডিএ। অবশেষে এসব নাটকীয়তার শেষে রক্ষণাবেক্ষণের অভিভাবক পেয়েছে চট্টগ্রামের চার ফ্লাইওভার।
জানা গেছে, বাস্তবায়নের পর থেকে সিডিএ ফ্লাইওভারগুলো রক্ষণাবেক্ষণসহ সার্বিক দেখভালের দায়িত্বও পালন করতে পারেনি। এতে ফ্লাইওভারগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে আসছে। ফ্লাইওভারগুলোতে ব্যবহৃত লাইটগুলোর অনেকগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিলের অভাবে অন্ধকারচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ফ্লাইওভারটি। ফলে রাতে যানবাহন চলাচল অনেকটা ঝুঁকিতে পড়তে হয়। এছাড়া ফ্লাইওভারগুলোর রেলিংয়ের অনেক অংশে স্টিল ও লোহার পাইপসহ লৌহজাত সামগ্রী চুরি হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাতে ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রতিটি ফ্লাইওভারের ওপর বালির স্তর-ময়লা-আবর্জনার স্ত‚প জমে আছে। ফলে বৃষ্টিতে ফ্লাইওভারের পানি নির্গমনের বিভিন্ন পথ বন্ধ হয়ে যায়। নিচের সড়কের মতো ফ্লাইওভারের ওপরও পানি জমে যায়। একইভাবে ফ্লাইওভারসমূহ নির্মাণের সময় ওপর থেকে নিচে পানি প্রবাহের যে নালা তৈরি করা হয়েছিল রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে ফ্লাইওভারের ওপরে এবং নিচে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার ছাড়া বাকি তিনটি ফ্লাইওভারের নিচের অংশে করা ফুলের বাগানসমূহ বর্তমানে ময়লা-আবর্জনা এবং বখাটেদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
নগরীর মূল সড়কের ওপর দিয়ে নির্মাণ করা ফ্লাইওভারগুলো নিয়ে প্রথম থেকেই নগর পরিকল্পনাবিদদের একটি বিরাট অংশের আপত্তি ছিল। কিন্তু এরপরও বিপুল অর্থ ব্যয়ে সিডিএ কর্তৃক ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণের পর একাধিকবার ব্যবহার সীমিত পর্যায়ে দেখা যায়। তাছাড়া ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণের সময় এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সঠিক পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এ সব দুর্ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। এছাড়া ড্রেনেজ সিস্টেমের ত্রæটির কারণে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
এ ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ফ্লাইওভারের নিচে ১৪টি দোকান ও তিনটি সুপারশপ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। পরে জাস্টিস ফাউন্ডেশন নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের করা রিটে ফ্লাইওভারের নিচে সড়ক বিভাজকের ওপর দোকান নির্মাণের ওপর ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। পরে চলমান গাড়ি থেকে টোল আদায় করে খরচ মেটাতে চেয়েছে সিডিএ। তৎকালীন চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলে মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মতামত চায়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন টোল ছাড়াই ফ্লাইওভারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণে নিজেদের মতামত প্রদান করে। মতামত পাওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে ফ্লাইওভারসমূহ সিটি কর্পোরেশনের নিকট হস্তান্তরের অনুরোধ জানায়।
এদিকে সিডিএর পক্ষ থেকেও ফ্লাইওভারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি কর্পোরেশনের নিকট হস্তান্তরের ব্যাপারে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে পত্র দিয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ফ্লাইওভারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়।
রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল সোহেল আহমেদ পূর্বদেশকে বলেন, আমরা ফ্লাইওভারগুলোতে সার্ভে করেছি। এখানে ইলেকট্রিক সিস্টেমে প্রচুর সমস্যা রয়েছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে অনেক কাজ করতে হবে। আপাতত আমরা নিজস্ব অর্থায়নে কাজগুলো করবো। তবে পরবর্তীতে বড় কোন কাজ করতে হলে আমাদের নতুন প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে হবে।