অবক্ষয় হচ্ছে সমাজ ব্যবস্থার সতর্কতা ও সচেতনতা প্রয়োজন

লিটন দাশ গুপ্ত

11

গত কয়েক দিন আগের কথা। চট্টগ্রামের চকবাজার বিএড কলেজের সামনে থেকে রাহাত্তারপুলের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তখন সময় দুপুর ১২ টার কাছাকাছি। চলার পথে কিছুদূর গিয়ে দেখি, ৮/১০ জন ছেলের একটি দল, অন্য একটি ছেলেকে দুচোখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে, ইচ্ছামত হাত পা দিয়ে মারছে; আর মার মার বলে টেনে হিঁচড়ে রাস্তার এক পাশ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের দুজনের হাতে ছিল ৯-এমএম পিস্তল। এই সময় আশে পাশের লোকজন দাঁড়িয়ে দেখছে আর হাসছে। আমিও মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করলাম আর ভাবলাম।
এখানে আশে পাশে লোকজন যারা দাঁড়িয়ে দেখে হাসছে, তাদের ভাবনায় কি ছিল আমি জানিনা; তবে ঐ সময় আমার ভাবনায় যা ছিল তা আজকের এই লেখায় উপস্থাপন করব। তার আগে বলে রাখি, আরো সপ্তাহ দুয়েক আগে, একই রকম আরো একটি ঘটনার কথা।
তখন বিকাল সাড়ে ৫ টা। আমি গাড়ি থেকে নেমে চান্দগাঁও আবাসিক বি-ব্লক দিয়ে হেঁটে চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকায় যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি ৫/৬ জন ছেলে, একটি মেয়েকে টানাহেঁচড়া করছে, মেয়েটি বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। তাদের একজনের হাতে ছিল একে ৪৭ রাইফেল।
এই ঘটনা দুটি আমার মনে দাগ কাটল, তাই আজকের লেখায় উপজীব্য করলাম। নিশ্চয় দিন দুপুরে এই ঘটনা দুটির কথা পড়ে বা জেনে, আপনাদের ভয় রাগ ক্ষোভ বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে মনে। তবে আপনাদের শুনে বা পড়ে যে রকম অনুভূতি, আমার কিন্তু দেখে বা বুঝে ভিন্ন রকম অনুভূতি জেগেছে।
এবার ঘটনা দুটির কথা খোলামেলা ভাবে বলি। উল্লেখিত ঘটনা দুটিতে সংশ্লিষ্ট যে ছেলেগুলোর কথা বলছিলাম তাদের বয়স যতদূর মনে হয়েছিল দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ তাদের বয়স ১০ বছরের নিচে হবে। আর যে সকল অস্ত্রের কথা বলছিলাম, সেই সকল অস্ত্র মার্কেট বা মেলা থেকে কেনা খেলনার অস্ত্র, যা দেখতে একবারে অরিজিনাল। আর মারামারি চিৎকার আর্তনাদ হচ্ছে তাদের মিছামিছি খেলা।
আপনারা যেভাবে পড়ে বাস্তব সন্ত্রাস মনে করে চমকে গেছেন, আমিও সেভাবে চমকে গেছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক অবক্ষয় ও সন্ত্রাসের সূত্রপাতের সাথে সম্পৃক্ত হবার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে। এখনকার সময়ে শিশুদের মাঝে খেলনা নিয়ে কি হচ্ছে এই সব! এরই মধ্যে একাধিকবার আমাদের বাড়িওয়ালার কøাস থ্রি ফোরে পড়–য়া ছেলে দুটিকে দেখেছি, খেলনার পিস্তল নিয়ে একভাই অন্যভাইকে মার মার, ধর ধর বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা ও দৌড়াদৌড়ি করে খেলতে। আবার এই রকমও আমার চোখে পড়েছে, শিশুদের মধ্যে মাদকাসক্তের ভূমিকায় অভিনয় করতে। এইসব দেখে বিষয়টি নিয়ে আমাকে আরো ভাবিয়ে তুলল। এইগুলো কি ডিজিটেল যুগের আধুনিক খেলা! কেন আমরা ছেলেদের হাতে বই কলম শিক্ষাসামগ্রী বা অন্যকোন গঠনমূলক খেলার উপকরণ না দিয়ে অস্ত্র দিয়ে খেলতে দিচ্ছি? কালের বিবর্তনে কি খেলার পরিবর্তন এসেছে!
আমাদের সময়ে ছিল গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্দা, কাবাডি, ডাংগুলি, বৌচি, কপালে টোকা, কানামাছি, কুৎকুৎ, যদুমধু রামশ্যাম, এক্কাদোক্কা, পুতুল বিয়ে, ওপেন্টি বাইস্কোপ, কড়ি বা গুটি দিয়ে হরেক রকম খেলা। মনে পড়ছে আরো সেই সময়ের নাম জানা অজানা বা ভুলে যাওয়া কত রকম খেলনার চিত্রকথা। খেলাগুলি কি সেখালের প্রাচীন খেলা হিসাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এখন? শহরে কি গ্রামে, ইনডোর কি আউটডোর ছয় ঋতুতে খেলার উপযোগি বিভিন্ন ধরনের খেলাগুলো আর কোথাও এখন চোখে পড়েনা। অথচ বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া সেই সময়ের খেলাগুলো সমবয়সী শিশু কিশোরদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করত। যা একে অপরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি হত বা ঐক্যবদ্ধভাবে আবদ্ধ হতে সাহায্য করত। পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পাশাপাশি আনন্দ পাওয়া যেত। ধৈর্য, সৌজন্যতা, উদারতা, মমতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা, দৈহিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেত। তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা, মানবিকতা, নৈতিকতা, নান্দনিকতা, সামাজিকতা বিকশিত হত। এছাড়াও একধরনের ব্রেন স্ট্রর্মিং হত যা শিক্ষায়, জানার ক্ষেত্র সৃজনের পাশাপাশি কৌতুহল সৃষ্টি হত।
আমি মনেকরি আমাদের সময়ের খেলাগুলোতে জাতীয়তবোধ ছিল। বাঙালি জাতির চিরাচরিত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বহন করত এবং প্রতিফলিত হত। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিশুদের খেলার নামে এই সব হচ্ছেটা কি? অস্ত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি এটা দেশি না বিদেশি খেলা, আদি না আধুনিক, অ্যানালগ না ডিজিট্যাল খেলা! তথাতথিত এই ধরনের খেলাগুলো কোন পর্যায়ে পড়ে তা আমার বোধগম্য নয়। তবে একটি বিদেশি খেলনা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই। কারণ ক্রীড়া সংস্কৃতি কোন একটি জাতির নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারক বাহক। আমাদের সময়ে খেলাগুলো জাতীয় ঐতিহ্য জাতীয় কৃষ্টি বহন করত বলে উল্লেখ করেছি।
বছর কয়েক আগে আমার এক বন্ধু থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক গিয়েছিল সরকারি ভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহন করতে। প্রশিক্ষণ শেষে স্বাভাবিকভাবে পরিবার পরিজনের জন্যে স্মৃতিস্বরূপ কিছু কেনাকাটা না করলে নয়। তাই সে ব্যাঙ্ককের এক অভিজাত মার্কেটে গিয়ে পছন্দমত ব্যবহার্য বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটা করে নেয়। পাশাপাশি একটি দোকানে গিয়ে শিশু সন্তানের জন্যে শিশু উপযোগি ভালো কি খেলনা সামগ্রী আছে, দোকানদার থেকে জানতে চাই। দোকানদার সবচেয়ে ভালো খেলনা হিসাবে একটি বক্স দেখালো। বন্ধু বাক্স খুলে দেখল, রবার প্লাস্টিক বা স্থিতিস্থাপক উপাদান দিয়ে তৈরী পুতুলের কিছু বিচ্ছিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অংশ বিশেষ বাক্সে রক্ষিত। বন্ধু অবাক হয়ে দোকানদারের কাছে ইংরেজিতে জানতে চাই, এই সব ভাঙা পুতুলের হাড়গোড় দিয়ে আবার কি খেলা? কিভাবে খেলবে জানতে চাই। ক্রেতা বিদেশি দেখে সৌজন্যতাস্বরূপ বিক্রেতা বা দোকানদার, কিভাবে খেলতে হবে তা হাতে নাতে প্রাকটিক্যালি শিখিয়ে দেয়। বন্ধু, দোকানদার থেকে জেনে আমাকে যা বলল তা হচ্ছে, পুতুল দুটি একটি ছেলে ও একটি মেয়ের বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশেষ। যা ঐ বক্স থেকে নিয়ে ছেলে মেয়ের মিশ্রিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গুলো একটির সাথে অন্যটি এমনভাবে সংযুক্ত করে সাজাতে হবে, যা বিভিন্ন ধরনের “সেক্স স্টাইল” নির্দেশ করে। বন্ধু সন্তানের জন্যে এমন খেলনা দেখে স্বাভাবিকভাবে চমকে গিয়ে থমকে যায়। চোখ দুটি আর কপালের নীচে নেই। চোখ বিস্ময়ে কপালের উপরে উঠে গেল। মাথা ঝিমঝিম করছিল।
বন্ধু কিনবেনা তবুও দাম জানার জন্যে কৌতুহল হয়ে বলে চমৎকার, এই খেলায় শিশুদের আইকিউ বাড়বে। এই ধরনের খেলনায় চেয়েছিলাম, দাম কত বলেন ভাই? দোকানদার থাইল্যান্ডের মুদ্রায় বলে ১৩৫০ থাইবাত। বন্ধু ১ থাইবাত বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২.৬৫ টাকা হিসাবে দেখল, যা বাংলাদেশী টাকায় ৩৫০০ টাকার কিছু বেশী।
যাই হোক, সেই দেশের এই ধরনের অশ্লীল, নোংরা খারাপ খেলনার কথা এখানে অনিচ্ছার সত্তে¡ও বলার কারণ হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের ক্রীড়া বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংস্কৃতি প্রতিফলিত হয় তা বুঝানোর জন্যে। থাইল্যান্ডে তাদের নিজ দেশের জাতীয় কৃষ্টি ঐতিহ্য কিন্তু এই খেলনায় প্রতিফলিত হচ্ছে। কারণ সেই দেশের অর্থনীতিতে জাতীয় আয়ের বড় একটা অংশ আসে নারীদের দেহ ব্যবসা থেকে। থাইল্যান্ডকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘ক্যাপিটেলসিটি অফ সেক্সয়্যুলিটি’ বা যৌনতার রাজধানী বলা হয়, এবং সেক্স ট্যুরিজম হিসাবে বিশ্ব বিখ্যাত ও স্বীকৃত। তাই তাদের সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শিশু বয়স থেকে শিখিয়ে দিচ্ছে এইসব কার্যক্রম।
এখন কথা হচ্ছে, থাইল্যান্ডের জাতীয় সংস্কৃতি কৃষ্টি যদি তাদের শিশু খেলনায় প্রতিফলিত হয়, তাহলে আমাদের দেশের সংস্কৃতি ঐতিহ্য কি সন্ত্রাস আর অস্ত্রের ঝনঝনানি! কেন শিশুদের জন্যে নামি দামি ডামি অস্ত্র অবাধে খেলনা হিসাবে মার্কেটে বিক্রয় করা হচ্ছে, অভিভাবকরা কেন তাদের প্রিয় সন্তানকে ক্রয় করে দিচ্ছে এই সব অস্ত্র?
যা হোক এখন শেষ পর্যায়ে আমার কথা হচ্ছে, শিশুদের বাঙালি ঐতিহ্য চেতনাকে ভিত্তি করে সেই পুরানো খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট ও উৎসাহী করে তুলতে হবে। এই বিষয়ে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে হবে মাতা পিতা অভিভাবককে। এখানে লেখার শুরুতে যে ঘটনার কথা বলেছিলাম, সেখানে একটি নিম্নস্তরের পথশিশুর ঘটনার পাশাপাশি অন্যটি ছিল অভিজাত পরিবারের শিশু, যা দেখে আমার এই রকমই মনে হয়েছিল। এর মানে হচ্ছে সমাজের সব ধরনের শিশুদের মধ্যে সন্ত্রাস বিষয়ে কৌতুহল ও চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। যার জন্যে আগামীতে ব্যাপকভাবে সমাজে সকলস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে সন্ত্রাস।
এখন সতর্কতার জন্যে কথা হচ্ছে, মাতাপিতাকে শৈশবের খেলাধুলা থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে মনস্তাত্বিকভাবে দেখতে হবে শিশুর কার্যকলাপ। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে পরিবেশের সঠিক উপাদান অনস্বীকার্য। শৈশবের বৈচিত্রময় আচরণের প্রভাব পুরো জীবন প্রভাবিত হয়ে সমাজে প্রবাহিত হয়। তাই শিশুর আচরণ প্রত্যক্ষণ করে তার মানসিক অবস্থা অনুধাবন ও চাহিদা নিরূপণ করে সেই অনুযায়ী এই সকল বিষয়ে মা বাবা বা অভিভাবককে পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। শিশুদের মধ্যে সন্ত্রাসমুক্ত খেলনার পরিবর্তে তাদেরকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই অবস্থায় ছোটবেলায় পড়া সেই ভাবসম্প্রসারণ স্মরণ করে বলতে চাই,
‘ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে, ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে।’
আর সচেতনতার জন্যে কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রকে সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিশুদের পাঠ্য বইয়ের বোঝা কমিয়ে এনে বিভিন্ন ধরনের খেলার সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিক্ষাক্রমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জটিল গাণিতিক সমীকরণ ও বৈজ্ঞানিক তত্ত¡ উপাত্ত দিয়ে বই প্রস্তুত করে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিলে শিক্ষা অর্জন হয়না। বাস্তবতা বিবর্জিত শিক্ষা জীবনের আদর্শ প্রতিফলিত হবে না পক্ষান্তরে বিপদ ডেকে আনবে।
লেখক : শিক্ষক ও সাহিত্যিক