অপলক আলো অন্ধকার

রথীন্দ্র প্রসাদ দত্ত

10

সুহাসিনী দেবীর বিয়ে হয়ে যাবার পর যেদিন কুমারী জীবনের প্রথম দরজা ভাঙার দুর্লভ এক উন্মত্ত অনুভ‚তি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো তখন থেকেই তাঁর মনে অন্য আর এক অনাবিল আনন্দঘন রোমাঞ্চিত স্বপ্নময় আকাঙ্খার জন্ম দিয়েছিলো। এ রকম অতিবাহিত সময়ে একদিন জ্যোৎস্নাধোয়া রাতে সুপ্ত প্রকৃতির বুকে বাতাস বইছিলো। সেই হাওয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে সুহাসিনী দেবী তাঁর দেহের মধ্য থেকে এক বিচিত্র প্রাণ স্পন্দন অনুভব করলেন। স্বামী অরবিন্দ বাবুর বাহু বন্ধনের মধ্যে তাঁর শরীরের কোষে কোষে নারী সত্ত¡ার জাগরণী মন্ত্র সোচ্চার হয়ে উঠলো এবং সেই স্বপ্নময় অনুভ‚তির পূর্ণ প্রকাশ ঘটল ফুটফুটে এক পুত্র সন্তানের জন্মদানের মাধ্যমে।
সুহাসিনী দেবী ছেলের নাম রাখলেন অভিজিত। অরবন্দি বাবু রাখতে চেয়েছিলেন অনিক। অরবিন্দ বাবু চেয়েছিলেন তাঁর ছেলে এই নির্দয় সময়ে সংসারের ময়দানে একজন নিপুণ দক্ষ সৈনিকের ভ‚মিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক। কিন্তু ছেলের নাম নিয়ে দ্ব›েদ্ব শেষ পর্যন্ত সুহাসিনী দেবীর ইচ্ছাকেই মেনে নিয়েছিলেন অরবিন্দ বাবু।
মেটারনিটি লিভে বাড়ি এসে আর চাকরিতে ফিরে যাননি সুহাসিনী দেবী। একটা ভালো চেয়ার তাঁর দখলে ছিলো। কিন্তু তাঁর মনে এই প্রত্যয় জন্মেছিলো যে, ছেলের মঙ্গল চাইলে তাঁকে চাকরি ছাড়তে হবে। ছেলেকে মনের মতো করে গড়ে তুলতে হলে চাকরি ছাড়ার বিকল্প নেই।
ছেলের সঙ্গে আমরণ এক সঙ্গে এক বাড়িতে বসবাসের স্বপ্ন দেখতে থাকেন সুহাসিনী দেবী। বলা যায়, স্বপ্ন নয়, ছেলের মায়াবি ছোট সুন্দর মুখটি দেখে দেখে এটাই তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে যায়। অরবিন্দ বাবু বলেন, যুগ বদলেছে, এতো আশা করো না। শেষে পস্তাতে হবে। সুহাসিনী দেবী চোখ ঘুরিয়ে তর্ক করেন, তাই আবার হয় নাকি। নিজের রক্তবিন্দু দিয়ে তিল তিল করে যাকে বড়ো করে তুলবো, বড়ো হয়ে পর হয়ে যাবে? না, না, ও কিছুতেই সম্ভব নয়। এ কথা তাদের বেলায় প্রযোজ্য যারা ছেলে মানুষ করতে জানে না। স্বামীর কথা আমলেই নেয়নি সুহাসিনী দেবী। অরবিন্দ বাবু বলেন, তোমার স্বপ্ন আকাঙ্খা যেন বাস্তবে রূপ নেয় এই প্রার্থনা করি। তোমাকে যেন সেই ভয়ঙ্কর দিনের মুখ দেখতে না হয়।
সুহাসিনী দেবী যখন চাকরি ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত অরবিন্দ বাবুকে জানান, তখন অরবিন্দ বাবু তাঁকে বাঁধা না দিয়েও বলেন, চাকরিটা ছেড়ে দেবার আগে আরেকবার ভেবে দেখো। অবশ্য সুহাসিনী দেবীর চাকরি করার বিশেষ প্রয়োজনও ছিলো না। অরবিন্দ বাবু বাড়তি পয়সার ভালো বেতনের অফিসার পর্যায়ের চাকরি করছেন। ভালো সুযোগ সুবিধে নিয়ে সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করেন। কিন্তু সুহাসিনী দেবীর ইচ্ছে নিজের একটা বাাড়ি। মনের মতো করে সাজিয়ে তুলবেন সেই বাড়ি। ছোট্ট নীড়, ছোট্ট ভালোবাসা।
অভিজিত এখন স্কুলে যাচ্ছে। ওকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে অভিজাত একটা স্কুলে। সুহাসিনী দেবী ছেলেকে নিয়ে স্কুলে যান। ছেলের ছুটি পর্যন্ত সময়টা অন্য মায়েদের সঙ্গে আড্ডা দেন। রূপচর্চা থেকে পরচর্চা নিয়ে মেতে থেকে সময় কাটান। ছুটির পর ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফিরেন। এমনি করে স্বপ্নময় দিনগুলো কাটতে থাকে। এর মধ্যে অরবিন্দ বাবু কিছু টাকা জমিয়েছেন। শহরের উপকন্ঠে এক খন্ড জমিও কিনেছেন। এখন বাড়ি করার পরিকল্পনা করছেন। স্ত্রীকে নিয়ে পরামর্শ করে ডাইনিং, কিচেন বাদ দিয়ে তিনটি ঘর করবেন। একটি তারা থাকবেন, একটি ছেলের, অন্যটি অতিথিÑঅভ্যাগতদের।
এক সময় বাড়ির কাজ শেষ হলো। ছিমছাম করে গুছিয়ে ছেলেকে নিয়ে নিজের নতুন বাড়িতে উঠে গেলেন। অভিজিত যখন এমবিএ করছে অরবিন্দ বাবু তখন চাকরি থেকে অবসর নেন। অবসরকালীন প্রাপ্য টাকা থেকে দোতলা তোলেন। টাইলসের ছিমছাম ঘরগুলো খুবই মনোলোভা। এমনি করে করে দিন যেতে থাকে। এখন তাঁরা পরিণত বয়সে এসে দাঁড়িয়েছেন। ছেলেও পড়াশোনা শেষ করেছে।
একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরিও সে পেয়ে যায়। কিন্তু তাকে জয়েন করতে হবে ওই কোম্পানির হেড অফিস ঢাকায়। বেঁকে বসেন সুহাসিনী দেবী। শুরু হয় মা ছেলের ঠান্ডা লড়াই। মা বলেন, এক সঙ্গে বাস করবো বলেই তো এ বাড়ি তৈরি করেছি, তুই যদি না থাকিস… যেতে হবে না অতো দূরে, এখানে চাকরি পেলে করিস। তাছাড়া, অতদূরে চাকরি করার দরকারটাই বা কী? ছেলে বলল, দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পেলেই তো হলো না মা, কাজ তো করতে হবে। বড় হয়েছি, আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাও। তুমি ভেবো না মা, কিছু দিনের মধ্যেই কোম্পানিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এখানকার অফিসেই চলে আসবো। তার আগে অভিজ্ঞতা একটু বাড়িয়ে নেই।
চট্টগ্রামে চাকরি নিয়ে ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে বাস করার প্রতিশ্রæতি দিয়ে মাÑবাবার সবেধন নীলমনি পাড়ি দেয় ঢাকায়। সেখানে কোম্পানি কোয়ার্টারে শুয়ে রাতের আঁধারে বাপ মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এক সময় আর্দ্র হয়ে ওঠে চোখের পাতা। চট্টগ্রামে মায়ের চোখেও জল। মা ছেলের অশ্রæর মিলন ঘঠতে ফোনে। মাকে রোজই দু’বেলা ফোন করতে হয়।
এমনি করেই দিন যাচ্ছিল এবং দেখতে দেখতে কেটে গেলো দু’বছর। এবার ছেলের বিয়ে দিয়ে বউমা আনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন সুহাসিনী দেবী। তবে তাঁর একটা ভয়, বউমা এসে ছেলেকে পর করে দেবে না তো? আবহমান কাল থেকেই বাংলার মাদের যে শঙ্কা তা সুহাসিনী দেবীর মনেও ক্রিয়াশীল হয়ে উঠল। কিন্তু ছেলের বিয়েও তো দিতে হবে। তাই মনের দ্বিধা সরিয়ে মেয়ে দেখতে শুরু করেন। বেশ কিছু মেয়ে দেখার পর একটি মেয়েকে তাঁর মনে ধরে। অতি বাধ্য ছেলের মতো অভিজিত জানিয়ে দেয় মাÑবাবার পছন্দই তার পছন্দ। অতএব বিয়ের দিন স্থির হয়ে যায়। তবে বিয়ের পূর্বেই একটা প্রমোশন নিয়ে চট্টগ্রাম অফিসে এসে জয়েন করে অভিজিত। মায়ের আনন্দ আর ধরে না। তাঁর স্বপ্ন সফল হতে চলেছে। পরমানন্দে মহাসমারোহে বিয়ে হয়ে যায় অভিজিতের। দোতলার সেরা ঘরটা ছেলে বউÑএর জন্য নির্দিষ্ট করেন মা। আর তাঁরা স্বামীÑ স্ত্রীতে থাকেন একতলায়। এতে অবশ্য আপত্তি করেছিলো অভিজিত। কিন্তু মা ওপরে ওঠানমায় বয়সের অজুহাত দেখিয়ে ছেলের আর্জি খারিজ করে দেন।
আনন্দেই চলছিলো চৌধুরী বাড়ির সংসার। কিন্তু গোলাপকে তালুবন্দি করতে গেলে তো রক্ত ঝরতেই পারে। আস্তে আস্তে সুহাসিনী দেবীরও সেই অবস্থা। তাঁর মনের আকাঙ্খা বাস্তবের পথে হাটা শুরু করে। মেয়েরা মেয়েদের পরম শত্রæ। আর এটাই রূঢ় বাস্তব।
ছেলের ওপর মায়ের আধিপত্য বউমা ঠিক সহ্য করে উঠতে পারছে না। শাশুড়ি বউয়ের আধিপথ্য বউমা টিক সহ্য করে উঠতে পারছে না। শাশুড়ি বউয়ের আধিপত্যের ঠাÐা লড়াই এ যুগের এক নিদারুন ট্র্যাজেডি।
ইতোমধ্যে বউমা চাকরি পেয়েছে। শাশুড়ি মনে করেন, গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো বেড়েছে বউমার অহংকার। আর বউমা মনে করে, তার এই সৌভাগ্যকে শাশুড়ি ঈর্ষা করেন। এই ঠান্ডা লড়াইয়ের মধ্যেই পেরিয়ে যায় একটা বছর। তবে এবার মা হতে চলেছে বউমা। পরিবারে বইছে খুশির হাওয়া। শাশুড়ি সমস্ত মানÑঅভিমান ভুলে বউমার তদারকিতে ব্যস্ত। পরিতৃপ্তির হাসি বউমার মুখেও।
যথাসময়েই নাতির মুখ দেখেন চৌধুরী বাড়ির কর্তাÑগিন্নি। শিশুর মতোই উচ্ছ¡ল ওঁরা। ওঁদেও উচ্ছ¡লতায় হাঁপ ছেড়ে বাঁচে সভ্যতার ইমারত। এই বেঁচে থাকাটা সে জীবনেরই প্রাপ্য, জীবনেরই রহস্য, তা মাঝে মাঝে বিস্মৃত হয় অধিকার সচেতন কিছু মানুষ।
মেটারনিটি লিভ শেষ হবার পর অফিসে যাবার প্রস্তুতি নিতেই আবার শুরু হয় শাশুড়ি বউয়ের মন কষাকষি। দুধের বাচ্চাকে রেখে বউমার অফিসে যাওয়া মেনে নিতে পারেন নি সুহাসিনী দেবী। অভিজিত মাকে বলল, তুমি বুঝতে পারছ না মা, এখন এ সময়ে চাকরি পাওয়া কতো কষ্টকর। ঠুনতো সেন্টিমেন্টের জন্য এই সুযোগটা ছাড়ার বিলসিতা মধ্যবিত্তের সাজে না।
তার মানে তুই বলতে চাস, আত্মজের জন্য মায়ের আত্ম বলিদান বিলাসিতা মাত্র! ওরে, মাতৃ¯েœহের কাছে সন্তানের দাম টাকা পয়সা দিয়ে হয় না।
কিন্তু মা, বউদেরও তো একটা স্বাধীনতা আছে? সুহাসিনী দেবী তখন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, স্বাধীনতার অর্থ উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। আমাদের কোন অভাব নেই। তোকে বেড়ে ওঠতে ও মানুষ করতে আমি চাকরি ছেড়ে দিলেও তোর বাবা তো আমাকে পরাধীন করে রাখেন নি। পারস্পরিক সম্পর্কে বিশ্বাসটাই বড়ো কথা। শাশুড়ি বউয়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিতটাই টলে গিয়েছে। তাই ছোট খাটো কারণেও চলছে টানা পোড়েন। আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় কেউ হারতে রাজি নয়। তবে বেচারা অভিজিত পরে দোটানায়। তার এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা। মা বাবার কাছে আছে রক্তের ঋণ, আর স্ত্রীর কাছে পেয়েছে প্রেম ও পিতা হওয়ার সুখ, যা তাকে বর্তমানে পুরুষ বলে গর্বিত করে তুলতে পেরেছে। তার মনে হলো, প্রথমের চেয়ে দ্বিতীয়টা অধিকতর বাস্তব। বর্তমানকে নিয়েই তো মানুষ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।তাই অভিজিত রক্তের ঋণকে ভুলে একদিন মাÑবাবাকে বলল, তোমরাও এ বাড়িতে শান্তি পাচ্ছ না, আমরাও পাচ্ছি না। সব সময় একটা অশান্তির ছাড়া পড়ে আছে। তার চেয়ে হয় তোমরা বৃদ্ধাবাসে গিয়ে থাক, নয়তো আমরা এ বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বাস করার ব্যবস্থা করি।
অভিজিতের প্রস্তাবে মাÑবাবার বুকে শেল বিঁধে গেল। সুহাসিনী দেবী বাক্যহারা। অরবিন্দ বাবু দ্রæত নিজেকে সামলে নিয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, তোদের নিয়ে এক সঙ্গে বাস করবো বলেই এ বাড়ি তৈরি করেছিলাম। বলতে পারিস এটাই তোর মায়ের ব্রত। সেই ব্রত যখন উদযাপন হলো না, দাদু ভাইকে নিয়ে তোরাই এ বাড়িতে থাক। অন্ধ মোহে ভুলে গিয়েছিলাম, আমাদের যে বাণপ্রস্থে যাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
অভিজিত বলল, একটা ভালো বৃদ্ধাবাসের ব্যবস্থা করেছি বাবা। তুমি ভেবো না, মাসে মাসে সেখানে টাকা পাঠিয়ে দেবো। অরবিন্দ বাবু গম্ভীরভাবে বলেন, তার দরকার হবে না অভিজিত। পরবাসের বন্ধু পরবাসিরাই হয়। এখন বরং তোমরা ভাবো রাজ্যপাট কেমন করে চালাবে।
চোখের জলে বুক ভেসে যায় সুহাসিনী দেবীর। ছেলেকে নিয়ে বাস করার স্বপ্ন তাঁর যে চূর্ণ হয়ে গেলো।
অরবিন্দ বাবু বলেন, দুঃখ করো না হাসি। তোমার স্বপ্ন এখনো চূর্ণ হয়ে যায় নি।
স্বামীর এ কথায় ভিজে চোখেও সুহাসিনী দেবীর বিষ্মিত দৃষ্টি।
অরবন্দি বাবু ছেলে বউমার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে স্ত্রীর শোকাতুর বিষ্মিত চোখে চোখ রেখে বলেন, ওই বৃদ্ধাবাসে আমাদের পাশের ঘরটা এখন থেকেই বুক করে রাখব হাসি। অভিজিতদেরও তো একদিন বৃদ্ধাবাসে আসতে হবে। আমাদের পাশের ঘরটা খালি রাখলে ওরা তোমার পাশেই বাস করতে পারবে। একটু বিষাদপূর্ণ হাসিতে ভরে উঠল অরবিন্দ বাবুর মুখমন্ডল।