অপরূপ সৌন্দর্যের সন্দ্বীপের মূল সমস্যা ঝুঁকিতে যাতায়াত

সাইফ রাব্বী, সন্দ্বীপ

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর সবুজ, শ্যামল, মনোমুগ্ধকর দেশের সর্বপ্রাচীন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপক‚লে অবস্থিত।
এখানে রয়েছে নানা জাতের পাখি, মাছ, ফল, ফুল এবং সাগরের গভীরে লুকায়িত প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার। সারি সারি নারকেল গাছ আর বিভিন্ন জাতের ফলের গাছে ভরা সন্দ্বীপের প্রতিটি বাড়ির বাগান।
সূর্যের কিরণ ও সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের তালে উপভোগ করা যায় সূর্যাস্তের সৌন্দর্য। পড়ন্ত বিকেলে সুবজ ফসলের মাঠে দোল খেয়ে যাওয়া দক্ষিণা বাতাস মনে আনে প্রশান্তি। বসন্তে কোকিলর ডাক, গাছে গাছে নানা ফুলের বাহার, শরৎকালের কাশফুল আর নিত্য দেখা মিলে মহিষ-ভেড়ার দল বেঁধে ছুটে চলা। তার উপর সাদা বকের ঝাঁকের ঘুরপাক খাওয়া নয়নাভিরাম দৃশ্য সবই রয়েছে এই দ্বীপে।
স›দ্বীপের সৌন্দর্য্য বর্ণনা করতে গিয়ে দ্বীপের বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও সন্দ্বীপ প্রেস ক্লাব সভাপতি রহিম মোহাম্মদ বলেন, স›দ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকার সবুজ পরিবেশ, পরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট, সুসজ্জিত বাড়ি-ঘর, এখানকার সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের দৃশ্য ভ্রমণবিলাসীদের মুগ্ধ করে।
সাগরকণ্যা সন্দ্বীপের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক কবি, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, পর্যটক ঘুরে গেছেন সন্দ্বীপ থেকে। ১৩৪৫ সালে ঐতিহাসিক পর্যটক ইবনে বতুতা সন্দ্বীপ আসেন। ১৫৬৫ সালে আসেন ডেনিশ পর্যটক সিজার ফ্রেডরিক এবং এর বহু প্রাচীন নিদর্শনের বর্ণনাও তিনি লিপিবদ্ধ করেন।
১৯২৯ সালের ২৮ জানুয়ারি মোজাফ্ফর আহমেদের সাথে সন্দ্বীপে আসেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সন্দ্বীপ ভ্রমণের স্মৃতির পটভূমিকাতেই কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর মধুবালা গীতিনাট্য রচনা করেন। সন্দ্বীপ বৃক্ষের ছায়াতলে বসে নজরুল তাঁর চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অনেকগুলো কবিতা রচনা করেছেন বলে জানা যায়।
এই দ্বীপের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় ইউরোপীয় দের লেখা ইতিহাসে। জানা যায়, নোয়াখালীতে মানুষের বসতি স্থাপনের পূর্বেই এখানে লোকালয় গড়ে উঠেছিল। সমুদ্র উপকূল হওয়ায় এখানে বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য ব্যবস্থা বিস্তার লাভ করেছিল। এখানকার লবণ শিল্প, জাহাজ নির্মাণ কারখানা ও বস্ত্র শিল্পও নানা দেশে বিখ্যাত ছিল।
১৭৭৬ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতি বছর সন্দ্বীপে উৎপাদিত হত প্রায় এক লক্ষ ত্রিশ হাজার মণ লবণ এবং তিনশ জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হত এসব। এমনকি জাহাজ নির্মাণ শিল্পেও ছিল বিশ্ব পরিচিতি।
তবে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে প্রধান সমস্যা যাতায়াত ব্যবস্থা। নেই কোন গণপরিবহন। মোটরসাইকেল এবং সিএনজি অটোরিকশা গণপরিবহনের চাহিদা পূরণ করছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও অনেকাংশে ভালো। পুরো সন্দ্বীপজুড়েই চোখে পড়বে আরসিসি সড়ক। কিন্তু সন্দ্বীপ যেতে হলে পাড়ি দিতে হবে সাগরপথে। যে পথের একমাত্র বাহন ছোট ছোট নৌযান। আধুনিক সভ্যতার এ যুগে নদীপথের এ যাত্রায় হোভারক্রাফটের দাবি এলাকাবাসীর।
পূর্ব সন্দ্বীপ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালেদ মাহমুদ চৌধুরী স›দ্বীপে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হোভারক্রাফট চালুসহ ফেরীঘাটগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। এ সময় তিনি জরুরি কারণে রাতের বেলায় যাতে দ্বীপবাসী সাগরপাড়ি দিতে পারে সেজন্য অবিলম্বে সন্দ্বীপ চ্যানেলে ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১০টি বয়াবাতি স্থাপন করা হবে বলে জানান।
যাতায়াত ব্যবস্থার সমস্যা নিরসন সম্পর্কে সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, সন্দ্বীপের সাথে মূল ভূখন্ডের যোগাযোগ স্থাপনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। মাটির ধারণ ক্ষমতা বিচার বিশ্লেষণ করে সন্দ্বীপে একটি সংযোগ সেতু নির্মাণ করে দেয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নদী পারাপারে সময় সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে আমি হারিয়েছি আমার মাকে। একদিন আমি নিজেই সাগরে পড়ে যাই। অল্পের জন্যে প্রাণ রক্ষা পেয়েছি।