অপরাধ কর্মকান্ড বাড়ছে রোহিঙ্গা শিবিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান প্রয়োজন

21

অপরাধ কর্মকান্ড বাড়ছে রোহিঙ্গা শিবিরে- একথাটি নতুন না হলেও সম্প্রতি গণমাধ্যমে তাদের মাদক,অস্ত্র ব্যবসা, মানব পাচার, খুনাখুনির ঘটনা ও দস্যুবিৃত্তিসহ নানা অপকর্মের ব্যাপক বিস্তারের কথা প্রকাশিত হচ্ছে। যা উদ্বিগ্ন করে তুলছে নিরীহ রোহিঙ্গা, স্থানীয় অধিবাসী ও প্রশাসনকে। বিশেষ করে, উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসব অপকর্ম বেড়েই চলছে বলে খবরে প্রকাশ। এ অবস্থায় প্রশাসন তাদের কঠোর অবস্থান জানান দিয়েছে গত রোববার রাতে। এ দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে একসাথে ৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যারা সকলেই রোহিঙ্গা ডাকাত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পে বেশকিছু গ্রুপ নানা ধরনের সন্ত্রাসী ও অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এদের বিরুদ্ধে এখনই শক্ত ব্যবস্থা না নিলে সামনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ঘটতে পারে। সম্প্রতি প্রায়ই অপরাধীদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটছে। এতে অপরাধীদের মৃত্যু হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি এমন কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হলেও মূল গ্রুপগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরো নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না বলে তারা মনে করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের কারণে ১২৭৩ জন রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আছে। এছাড়া ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ৭৩ জন।
উল্লেখ্য যে, উখিয়ার ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে বাস করছেন নিবন্ধিত ১১ লাখ ১৮ হাজার ৯১৩ জন রোহিঙ্গা। এরই মাঝে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে কিছু গ্রুপ। সরজমিন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিকাল ৫টার পর ঢুকতে পারেননা বাইরের কেউ। ৫টার পরেই পরিবর্তন হয়ে যায় ক্যাম্প এলাকার চেহারা। ক্যাম্পের সড়কে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ায় থাকলেও অনিরাপদ হয়ে ওঠে ভিতরের চিত্র। দিনের বেলা এসব গ্রুপের সদস্যদের সাদামাটা জীবন। আর রাত হলেই মুদ্রার উল্টো পিঠ। ক্যাম্প এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এসব গ্রুপের সদস্যরা। অন্যান্য গ্রæপের সক্রিয়তা থাকলেও আলইয়াকিন গ্রুপ সবথেকে শক্তিশালী অবস্থানে আছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কুতুপালং ও বালুখালী দুই ক্যাম্প এলাকার নিয়ন্ত্রিত হয় নৌকার মাঠ নামক স্থান থেকে। দিনের বেলা এই মাঠ থাকে স্বাভাবিক। জানা যায়, ক্যাম্পের প্রতিটি ব্লকে দেশীয় অস্ত্র হাতে ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য পাহাড়া দেয়। ক্যাম্পে সচ্ছল রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, ইয়াবার চালান, দেশের বিভিন্ন এলাকা ও সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানোসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত তারা। গৃহপালিত পশু, ফসল, ফলসহ স্থানীয়দের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি ডাকাতির সঙ্গে জড়িত এই গ্রুপ। সাধারণ রোহিঙ্গাদের দাবি, পুরো ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকে আলইয়াকিনের ৩ জন নেতা। তাদের দায়িত্ব পরিবর্তন হয় ৩ মাস পরপর।
ক্যাম্পে ২০১৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত প্রায় শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত খুন হয় অন্তত ৩৩ জন। শুধু তাই নয়, এসব অপরাধচক্র প্রত্যাবাসনের কথা উঠলেই বিরোধীতা করে । যারা প্রত্যাবাসনের সম্মতি জানাতে ক্যাম্প ইনচার্জের কাছে যান তাদেরকেই অস্ত্রের মুখে হুমকি দেয়া হয় বলেও জানা যায়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন সন্ত্রাসী গ্রæপের কথা। তিনি বলেন, তারা জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, রাতের বেলা অস্ত্র মহড়া ইত্যাদি দিয়ে থাকে। আমরা কোন অপরাধ হলে সেখানে যাই। গ্রেপ্তার করি। ক্যাম্পে দায়িত্বরত বিজিবি’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও প্রায় একই কথা বলেছেন, তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ক্যাম্পে অবস্থানকারী ১০ লাখ রোহিঙ্গা প্রায় সকলই বেকার। আর অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডা। এই কারণেই এসব গ্রæপ তৈরি হয়। আমরা মনে করি, দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরো কঠোর অবস্থান ও নজরদারী বৃদ্ধি করলে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রæপ যত শক্তিশালীই হোক তারা ঠিকে থাকতে পারবেনা।
জেলা প্রশাসকের ভাষায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তৎপর আছে, তাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ইতোমধ্যে জনবল বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুনকরে ৭টি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। চলছে জয়েন্ট পেট্রোলিং, মোবাইল কোর্টসহ নানা কার্যক্রম। ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে যারা আছেন তারা যেকোন ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের সাথে আমরাও সহমত পোষণ করে বলতে চাই, ক্যাম্পে এই ধরনের যারা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত তাদের অতি দ্রæত তালিকা তৈরি করে গ্রেপ্তার করা উচিত। ক্যাম্প এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম এখনই নিয়ন্ত্রণ না করলে এই অপরাধ প্রবণতা আরো বৃদ্ধি পাবে।