অন্তর মম বিকশিত করো অন্তর তর হে

মছিউদ্দৌলা জাহাঙ্গীর

9

‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তর তর হে, নির্মল করো উজ্জ্বল করো সুন্দর করো হে’। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ রবিন্দ্রনাথের এ আকাক্সক্ষাটিকে আত্মস্থ করতে চায়। কারণ মানুষ ভাল থাকতে চায়, কিন্তু লোভের জন্য পারেনা, লোভের কাছে সে পরাজিত যত বড় বীর হোক। আমরা কথায় কথায় বলি ভয়কে করতে হবে জয়, শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে কিন্তু লোভকে কেউ ক্ষোভ বানাতে পারে না। তবে দেখা যায় ক্ষোভকে বিক্ষোভ বানাতে মাশাল্লাহ্ অনেকে বেশ পারদর্শী। সম্প্রতি দেখলাম কুমিল্লায় আদালতে বিচারকের সামনে এক আসামি আরেক আসামিকে খুন করে ফেলেছে, বাপের বেটা হাসান, সে শোককে শক্তিতে পরিণত করেছে। কিংবা বলতে পারি ক্ষোভকে বিক্ষোভে, কিন্তু তার মনে কিসের এত ক্ষোভ আদালত, পুলিশ, বিচারক কেউ তার মনে ন্যূনতম ভয় জাগাতে পারল না? জনতার কথা বাদই দিলাম, কারণ জনতাকে এখন কেউ ভয় পায় না, তাই জনতার সামনে কুপিয়ে ঢাকায় বিশ্বজিৎকে হত্যা করে, বরগুনায় রিফাতকে হত্যা করে। কিন্তু প্রশ্ন এত সাহস তারা পায় কি করে, পুলিশ, আদালত কাউকে ভয় করছেনা তাদের এ সাহসের উৎস কি? উৎস যা হোক তবে একদিকে বাংলাদেশ কিন্তু ইতালিকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৪ সালের ২১ মে ইতালির এক আদালতে সঙ্গমকার্য চলছিল, কপোত-কপোতীর সে কি চিৎকার! সে শব্দে পাশের কক্ষে থাকা বিচারক আর বিচারকার্য চালাতে পারলেন না, ফলে তিনি বিচারকার্য বন্ধ ঘোষণা করলেন। এখন আমাদের দেশে ডাইরেক্ট হত্যাকাÐ বিচারকের এজলাসে, অতএব আমরা ইতালি থেকে এগিয়ে। আর ইতালিও দেখছি এক আজব দেশ, ঐ সঙ্গমকাÐের কবছর আগে বিশ্বে সোয়াইন ফ্লুর প্রচÐ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। মেক্সিকোতে নাকি এ রোগের উন্মেষ, ফলে সবার মধ্যে তখন এক মেক্সিকো ভীতি কাজ করছিল। এমন পরিস্থিতিতে ইতালির এক জনাকীর্ণ আদালত কক্ষে বিচারক এসে এজলাসে বসলেন ঠিক তখনই তাঁর একটি কাশি এল। কাশি দিয়ে নাক মুছতে মুছতে তিনি একটু বিষাদের সুরে বললেন, গতকালই মেক্সিকো থেকে এলাম। সাথে সাথে এক বিকট চিৎকার দিয়ে আদালত কক্ষ খালি, বিচারক ছাড়া আর কেউ নাই! জানা যায় সোয়াইন ফ্লু ভীষণ সংক্রামক রোগ, আর সর্দি-কাশি হল তার প্রাথমিক লক্ষণ এবং মরণে সমাপন।


দেখা যাচ্ছে ইতালিয়রা একদিকে অতি নির্লজ্জ জাতি আবার অন্যদিকে চরম ভিতু জাতি, মৃত্যুকে তাদের বড় ভয়। সেদিক হতে আমরা কলঙ্ক মুক্ত, তাই তো আদালত কক্ষে ঢুকে হাসান নামক খুনি সবার সামনে নির্ভয়ে ফারুককে কোপাতে পেরেছে। প্রশ্নÑ হাসান ভয় পেল না কেন, পুলিশ, বিচারক, জনতার সামনে ফারুককে ছুরিকাঘাত করার এত সাহস সে পেল কোথায়? তবে কি সে উক্ত কর্ম সম্পাদনে আদালতকে বেশি নিরাপদ মনে করেছিল? অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর, তবে কি হাসান সেই পাঠ রপ্ত করেছে? মাশাল্লাহ্, আমরা হঠাৎ অস্বাভাবিক কিছু দেখলে বিস্মিত হই কিন্তু সীমার অধিক যদি দেখে ফেলি তখন সে লোড আর নিতে পারি না। ফলে তখন আমরা আর বিস্মিত হই না বোকা হয়ে যাই, কি করব তখন ভেবে পাই না। তার একটি বাস্তব উদাহরণ হল আমাদের স্কুল, ক্লাশ সেভেনে পড়ি তখন এক ছেলে পরীক্ষার হলে নকল করার জন্য পুরো ডিকশনারি সাইজের ব্যাকরণ ও রচনা বই ঢুকিয়ে ফেলল! আমরা তো ভয়ে অস্থির, ছোট্ট এক টুকরা কাগজ পেলে পর্যন্ত স্যার ভীষণ মার দেন, এ ছেলেকে নির্ঘাত মেরে বেহুঁশ বানাবেন। কিন্তু না, তেমন কিছু ঘটেনি, উল্টা স্যার সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে হাসতে হাসতে লুঠন, শেষে বইটি রেখে তিনি ছেলেটিকে হল থেকে বের করে দিলেন। তার মানে আমরা ছোট হলে প্রতিক্রিয়া দেখাই বড় হলে দেখাই না কারণ লোড নিতে পারি না। এই থিওরি অ্যাপ্লাই করে মনে হয় হাসান ডাইরেক্ট কোর্টে ঢুকে কাজ সেরে ফেলেছে। অর্থাৎ বিচারক হাসতে হাসতে তাকে কোর্ট থেকে বের করে দেবেন অথবা আরো দুটি সম্ভাব্য উপায় আমার জানা আছে। ১. নবী হজরত মুছা (আ.) ফেরাউনকে হেদায়েতের চেষ্টা করছিলেন ফেরাউন তখন তাঁকে প্রশ্ন করল; মুছা! আল্লাহ্ যদি শিকারী হন আমি শিকার, এখন শিকারী যদি স্থির করেই থাকেন শিকারকে তীর মারবেনই তাহলে শিকারের কি আর বাঁচার পথ থাকে? মুছা বললেন, এক্ষেত্রে শিকার শিকারীর বুকে চলে এলে হয়, তাহলে আর মারতে পারবেন না। ২. বন্যায় চারিদিক ভেসে গেল পানি থেকে বাঁচতে একটি বাঘ উঠতে উঠতে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেল, দেখে একটি ছাগলও সেখানে আগে থেকেই উঠে বসে আছে। বাঘকে দেখে তো ছাগল শেষ, এবার নির্ঘাত মরতে হবে। ওদিকে অথৈ পানির কারণে বাঘের মন খারাপ তাই ছাগলকে খাবে কি খাবেনা বসে ভাবছে। বাঘের ইতস্ততা দেখে ছাগল ধীরে ধীরে তার কাছে ঘেঁষল এবং এক পর্যায়ে সে বাঘের গাল চাটতে লাগল, বাঘ তখন হঠাৎ হেসে দিল।
অতএব আমাদের হাসানরা সব মুখস্ত করে ফেলেছে, শিকারীর বুকে চলে এসেছে কিংবা গাল চাটছে। অন্য কোন উঁচু পন্থাও থাকতে পারে, আমি সেই উচ্চতায় এখনো পৌঁছতে পারি নাই। আমি কি পৌঁছব, আমাদের আদালতেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে! তাই তো কুমিল্লার সম্মানিত বিচারক প্রশ্ন করছেন, আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? এখন আদালতই যদি না জানেন তাঁদের নিরাপত্তা কোথায়, তাহলে আমরা কেমনে জানবো আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? হাইকোর্ট বলেছেন, ওসি-ডিসিরা নিজেদের জমিদার মনে করেন। আলহামদুলিল্লাহ্ তা’ও ভাল ছিল, কিন্ত তাঁরা তো নিজেদের রাজা মনে করেন। কারণ পুলিশই বলেছে, মাছের রাজা ইলিশ দেশের রাজা পুলিশ। ঠিক সেরূপ পুলিশ চিনেছে পুলিশেরে তাই পুলিশের খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ। এখন পুলিশকে আর বাঁধে কে? ফলে পুলিশ ভিডিও করে, থানায় শালিস বসায়, বিচার করে। কিছুদিন আগে হাইকোর্ট একবার বলেছিলেন; পুলিশ থানায় শালিস বসায়, টাকা নেয় এত সাহস পুলিশ পায় কোত্থেকে? বিষয়টার উপর কিছুদিন পূর্বে ‘এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে’ নামে আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। অতএব তা নিয়ে আর আলাপ করবনা তবে কথা হল, সে কথাটা বলার কিছুদিনের মধ্যে হাইকোর্ট এখন আবার বলছেন, ওসি-ডিসিরা নিজেদের জমিদার মনে করেন।
দুঃখ লাগছে গত সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে দায়ের হওয়া মামলার পরোয়ানা নিয়ে অথবা নিরপরাধ মানুষ মামলার পরোয়ানা নিয়ে এখনো অনেকে কোর্টের বারান্দায় ঘুরাঘুরি করছে। আর কেউ প্রকাশ্য রাজপথে দিনের বেলায় মানুষ কুপিয়ে মারছে, এবং সে সংস্কৃতি আজ আদালতে গিয়ে প্রবেশ করেছে। অবশ্য কোন কোন থানার ভেতর এধরনের কাজের কথা শোনা যায়, আবার বাইরেও ঘটে আমাদের কিছু কিছু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যদের সাহায্যে, যেমন নারায়ণগঞ্জ ‘সেভেন মার্ডার’। জেলখানার ভেতরেও ঘটে, যেমন অমিত মুহুরী। তবে আদালতে মনে হয় এই প্রথম সংঘটিত হয়েছে। চিন্তা নাই, শুরু যখন হয়েছে গুরুর কৃপায় শেষটাও আমরা দেখব। ২০১০ সালে দেখলাম লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সাপ মারার মত করে নাটোরে পৌর মেয়র বাবু হত্যার দৃশ্য। তারপর একে একে বিশ্বজিৎ, রিফাত এবং এখন ফারুক হত্যার দৃশ্য দেখলাম, অদৃশ্য তো অগণিত রয়েছে। দিন দিন কেবল বাড়ছেই কমার লক্ষণ নাই, আর কমবেই বা কেমনে, যে যে যোদ্ধারা নিয়োজিত। একেক জনের হাতে ইয়া বড় বড় রামদা, কিরিচ, রড, বন্দুক আর পিস্তল থাকেÑ কমার ইচ্ছা থাকলেও তো কমবে না। আর এদিকে দুদকের শীর্ষ কর্তা নাকি বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি করলে অপরাধ হবে না। দায়মুক্তির চমৎকার সার্টিফিকেট, থানায় নাকি ফৌজদারী ছাড়া অন্য শালিস করা যাবে। এখন কোনটা সরল বিশ্বাস আর কোনটা ফৌজদারী সে বিচার কে করবে? অতএব পুলিশ এত সাহস কোথায় পায়, পুলিশ জমিদার হয়ে গেছে এসব বলে কোর্টের কোন লাভ আছে? কোর্ট তো রায় দেয়, বাস্তবায়ন করে কে?
চারদিকে হতাশা, কোর্টও হতাশ। ভাবছি হাসান, নয়ন বন্ড, রিপন নাথরা এত সাহস পায় কোথায়, প্রকাশ্যে রাজপথে মানুষকে কুপিয়ে মারে কেমন করে? মাঝে মাঝে ভাবি যোগানদার আছে অর্থাৎ সাহসের যোগানদার, নইলে পুলিশকে ভয় করেনা এমন মানুষ আছে? শুরু করেছি ‘অন্তর মম বিকশিত করো’ দিয়ে, কিন্তু সমস্যা হল কেউ এখন তা আর চায় না। সবাই খালি চায় লোভ আর দাপট বিকশিত হোক, অবশ্য একটি জিনিস এখন দারুণ বিকশিত হয়েছেÑ যৌন ক্ষমতার চরম বিকাশ, হাহাহাহা। ক্ষমা করবেন একটু রস করলাম, আসলে রসের বড়ই আকাল পড়েছে, তাই তো উজির হতে ফকির, আমলা হতে কামলা সকলেই রসাস্বাদনে মত্ত। বালিকা, নাবালিকা, নারী, শিশু, মহিলা, কোনই বাচবিচার নাই, যেখান হতে পারে খালি রস নিচ্ছে। আমার গত প্রবন্ধ ‘এনেছি আমার শত জনমের প্রেম’এ লিখেছি, ‘আরব বিশ্বে আইন হচ্ছে বাঙালি পুরুষ তাদের নারীকে বিয়ে করতে পারবে, অতএব আমরা না পারলেও তোমরা অন্তত সাধ মিটাও। আমরা তো খালি ইমরুল কায়েসের প্রেমিকা উনাইজাকে স্বপ্ন দেখতাম, মনে মনে খেলে পান্তা কেন খাব, বিরানিই খাই।’ দেশে এখন ধর্ষণের যে গতি, দোয়া করি তোমরা মনে মনে না বাস্তবে খাও, দেশটা অন্তত ধর্ষণমুক্ত হোক। আবার দেখলাম হবিগঞ্জে গতমাসে র‌্যাব সদস্য সাদেক মিয়া তিন শতক জমি কেনা নিয়ে কৃষক চাচা দুলা মিয়াকে নাই করে দিয়েছেন। মাশাল্লাহ্ সাদেক মিয়া বড়ই কামের আদম, তবে ধরা খেয়ে এখন মনে হয় বেদম হয়ে যাবে। থাক আজ আর না, কামনা শুধু সব লোভ, হিংসা, অহংকার বিনাশিত হয়ে হৃদয়ের সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকশিত হোক।
লেখক : কলামিস্ট