সাংবাদিকদের চবি উপাচার্য

অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার নিয়ে বিতর্ক

চবি প্রতিনিধি

15

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) অতীতে প্রচলিত সবধরণের অনৈতিক কর্মকান্ড, সুযোগ-সুবিধা প্রদান আমি বন্ধ করে দেয়ায় গুটিকয়েক শিক্ষক বঙ্গবন্ধু চেয়ারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘গত ৭ মার্চ বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা না নেওয়ার শর্তে আমি এ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করি। এ পদে আমার যোগদান একটি চক্র মেনে নিতে পারছেন না। এ কারণেই আমার বিরুদ্ধে কিছু শিক্ষকসহ কুচক্রিমহল সক্রিয় রয়েছে। বঙ্গবন্ধু চেয়ারকে যারা বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন তারা জামায়াত-শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি প্রদানকারী আট সিনেট সদস্যদের নানা অনৈতিক ও অনিয়ম এবং সুবিধা বন্ধ করে দেয়ায় তারা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন’।
গতকাল রবিবার দুপুর তিনি নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব অভিযোগ করেন। এসময় তিনি লিখিত বক্তব্যে আট সিনেট সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও তুলে ধরেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধু নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।
উপাচার্য আরো বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে আটজন শিক্ষক বিবৃতি দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে পূর্বেই বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে গবেষণায় জালিয়াতি, অনৈতিকভাবে শিক্ষক নিয়োগ, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, ছাত্রসংগঠনের মধ্যে গ্রুপিং সৃষ্টি করার বিষয়ে অভিযোগ উঠায় তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেও উদ্যোগ গ্রহণ করি। এছাড়াও একজনের স্ত্রীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে আমার উপর নানাভাবে অনৈতিক চাপ দেয়া হয়েছিল। জামায়াত-শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী, সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত করায় তারা বঙ্গবন্ধু চেয়ারের বিরোধিতা করে আসছেন। উপযুক্ত শর্ত সাপেক্ষে (বঙ্গবন্ধুর গৌরবময় জীবন, রাজনীতি, আদর্শ ও কীর্তি নিয়ে একাধারে গবেষণা/লিখালিখি) ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে প্রণয়ন কমিটি আমাকে মনোনীত করে। আমাকে মনোনয়ন দেয়ার সুপারিশটি সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাহী কমিটি অনুমোদন করে। এ পদে যোগদান বিষয়টি পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশে উল্লিখিত বিধান অনুযায়ী রিপোর্ট করা হবে’।
মত বিনিময় সভায় উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজগর চৌধুরী বলেন, ‘হলুদ দল থেকে মনোনীত মোট ৩৩ শিক্ষক প্রতিনিধি থেকে মাত্র আটজন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাকি ২৫ জন কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। আমি হলুদ দলের আহবায়কের সঙ্গে কথা বলেছি। ওনি বিবৃতির বিষয়ে কিছু জানেন না। আমার প্রশ্ন হলো, তারা একটি দল থেকে মনোনীত হয়ে দলের ফোরামে আলোচনা ছাড়া কিভাবে বিবৃতি দেন?’
এদিকে মতবিনিময় সভার পর বিকালে ওই আট সিনেট সদস্য এক বিবৃতিতে উপাচার্যের সংবাদ সম্মেলনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, গত বিবৃতিতে যেসব বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে উপাচার্য তার একটিও খন্ডন করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু চেয়ারে বসার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিব্রত হয়ে এবং গ্রহণযোগ্য সদুত্তর দিতে না পেরে তিনি এখন ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন। তিনি যেসব অভিযোগের কথা বলছেন সেসব মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের প্রগতিশীল শিক্ষকদের দমন করার অপচেষ্টা। এ ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ অব্যাহত রাখলে যথাসময়ে বর্তমান উপাচার্যের আমলের অন্যায় কর্মকান্ড সবার সামনে প্রকাশ করা হবে’। বিবৃতিতে বর্তমান উপাচার্যের কর্মকান্ড তদন্ত করে দেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির কাছে দাবি জানান সিনেটররা।
বিবৃতি প্রদানকারীরা হলেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী এসএম খসরুল আলম কুদ্দুসী, চবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক, সমাজতত্ত¡ বিভাগের অধ্যাপক এসএস মনিরুল হাসান, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মনছুর, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সিরাজ উদ-দৌল্লাহ এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল।
উল্লেখ্য, ঢাকা ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত বঙ্গবন্ধু চেয়ারের নীতিমালা পর্যালোচনা করে ২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর চবির ৫১০তম সিন্ডেকেট সভায় বঙ্গবন্ধু চেয়ারের অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন, রাজনীতি, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে অধ্যাপক সমমর্যাদাসম্পন্ন একজন বিশিষ্ট গবেষক বঙ্গবন্ধু চেয়ারে অধিষ্ঠ হন। তিনি অধ্যাপকের সমান বেতন-ভাতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সুবিধা পান। এক বছরের মেয়াদ হলেও ক্ষেত্র বিশেষে তা দু’বছর করার সুযোগ রয়েছে।
ওই সভায় বঙ্গবন্ধু চেয়ার সৃষ্টি এবং প্রবর্তনের ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে উপাচার্যকে প্রধান এবং বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রারকে সদস্য সচিব করে সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরিন আখতার, কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সেকান্দর চৌধুরী, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মহীবুল আজিজ, নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. ফরিদ উদ্দিন আহামেদ, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মাইনুল হাসান চৌধুরী।
নির্দেশনা মোতাবেক কমিটি ২০১৮ সালের ৭ মে ও ৩ সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি তিন দফা বৈঠক করেন। সর্বশেষ সভায় সর্ব সম্মতিক্রমে পূর্ণাঙ্গ একটি নীতিমালা সিন্ডিকেটে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। একইসাথে পদের জন্য উপাচার্যের নাম প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু সুপারিশকৃত ওই সভায় কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরিন আখতার উপস্থিত ছিলেন না। ফলে সভার সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. সেকান্দর চৌধুরী।
গঠিত কমিটির তিনদফা প্রস্তাবনা ও কার্যক্রম ২৩ ফেব্রুয়ারি নগরীর চারুকলা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত ৫২০তম সভায় রিপোর্ট আকারে তুলে ধরেন। এক্ষেত্রে বিষয়টি সিন্ডিকেটের এজেন্ডা না করে রিপোর্ট হিসেবে আনায় দুই সিন্ডিকেট সদস্য নোট অফ ডিসেন্ট দেন। পরবর্তীতে ৭ মার্চ উক্ত চেয়ারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন উপাচার্য।