আশি বছরে পদার্পণে অভিবাদন

অনুপম সেনের বাঙালি চর্চা ও তাঁর ভাবদর্শন

আলী প্রয়াস

13

হাজার বছরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ জনপদ আমাদের এই চট্টগ্রাম। প্রাকৃতিক বৈচিত্রে ভরপূর এই জনপদে প্রোজ্জ্বল কিছু মানুষ জন্ম নিয়েছেন। যারা এই ভ‚মিকে জ্ঞানে মননে উর্বর করে চলেছেন। শিক্ষায়, সমাজ ভাবনায়, বাংলা ও বাঙালি চেতনা প্রতিষ্ঠায় জাতির প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন, অন্ধকারে আলোর দিশারীর মতো বাংলাদেশের শিল্প-সমাজ-ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন। ড. অনুপম সেন সেই আলোক অভিযাত্রীদের অন্যতম পথিকৃত। এ সকল সূর্য সন্তানদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
১৯৪০ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণকারী সমাজবিজ্ঞানী অনুপম সেন এর ব্যক্তি জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনি মনেপ্রাণে একজন বাঙালি। একদিকে তিনি একজন মূলধারার অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্পকলাসহ জ্ঞানের সকল শাখায় বিশ্ববরেণ্য জ্ঞানদীপ্ত সাধক অন্যদিকে চলনে বলনে খাঁটি বাঙালি, খাঁটি মাতৃভাষা চর্চাকারী। তিনি মনে করেন, বাঙালি দর্শনই শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দর্শন। ‘অন্য কোনো দর্শন নয় আমি বাঙালি, আমাকে বাঁচতে হবে বাঙালি সংস্কৃতির ধারক হয়ে’ এই দর্শন ভাবনা লালন করেন বলেই তিনি ক্রমে ক্রমে নিজেকে গড়ে তুলেছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহকরূপে।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থারাজি এবং অপূর্ব জীবনদর্শনের দিকে তাকালে এ ধারণাই আমাদের বদ্ধমূল হয় যে, তাঁর চিন্তার জগৎ জুড়ে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার নানা কৃৎকৌশল তিনি যেন সবার কাছে উপস্থাপন করছেন।
বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁর বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি আমাদের মুগ্ধ করে। স্বাধীনতা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের সকল অসা¤প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথের সাহসী মানুষ তিনি। এমন কোনো প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক, এমনকি গণমানুষের পক্ষের এমন কোনো আন্দোলন নেই যাতে তিনি যুক্ত হননি।
আজকের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব থেকে মুক্তি পেতে বাঙালিকে মনেপ্রাণে বাঙালি হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। বাঙালির কাছে আজ আর বাঙালির দর্শন নেই। নেই তার জাতীয়তাবোধের আত্মশক্তি ও সাহস। যা দ্বারা একদিন সে শিরদাঁড়া সোজা করে বৈশ্বিক চেতনা ধারণ করতে পেরেছিল। আজকের বাঙালিকে আর ইতিহাসের ধারায় খুঁজে পাওয়া কিংবা চিনে নেয়া কষ্টকর। তার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ব্যাপ্তি ক্রমাগত রাজনৈতিক বেনিয়া, বিশ্বায়ন এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সংস্কৃতির হাতে লুন্ঠিত হতে হতে আজ এক ক্ষীণ দীপশিখা মাত্র। ড. অনুপম সেন তাঁর সুলিখিত বই-‘আদি-অন্ত বাঙালি, বাঙালি সত্তার ভ‚ত-ভবিষ্যৎ’-তে এই কথাই বলেছেন-
‘আমাদের বাঙালি সত্তাকে রক্ষা করতে হলে, আমাদের আদি-অন্তে বাঙালি হতে হলে বিশ্ব পুঁজিবাদের আগ্রাসন বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আমাদের মানস পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ঠেকাতে হবে। এদের মুল উদ্দেশ্য জীবনকে পণ্যাশ্রয়ী করা, পণ্যে পরিণত করা; অবশ্য তা থেকে ফেরার চেষ্টাও চলছে আজ বিশ্বব্যাপী। বারবার পটুজির বিপন্নতার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদ নিজেই তার দৌর্বল্যকে বিশ্বের নিপীড়িত নিগৃহীত মানুষের কাছে তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছে। এরই মধ্যে দিয়ে দেশে দেশে এই সত্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে, পণ্য নয়, মানুষের যা প্রয়োজন, মানুষ তা নিজেকে পণ্যে পরিণত করতে পারে না। পণ্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে হবে। পণ্যকে তার বশে আনতে হবে। ঊীপযধহমব ঠধষঁব-এর পরিবর্তে বস্তুর টংব ঠধষঁব কে ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশ্ব প্রকৃতি আমাদের যা দিচ্ছে তাকে নিরবচ্ছিন্ন পণ্য প্রবাহে রূপান্তর না করে আমাদের জীবনের সহায়ক শক্তিতে পরিণত করতে হবে।’(পৃ. ৬১, প্রাগুপ্ত)
নিজের রূপে বিশ্বরূপ প্রতিফলিত করবার অহংবোধ বাঙালিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একমাত্র পথ। বাঙালির মননের প্রতীক, প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ড. অনুপম সেন সেই বিশ্ববাঙালির সমার্থক স্বরূপ। তিনি আমাদের বিবেক, অভিভাবক এবং একজন সত্যিকারের বাঙালি ভাবদার্শনিক। তিনি বাঙালির প্রতি গভীর আস্থাশীল, তাঁর অপার বিশ্বাস বাঙালি ঘুরে দাঁড়াবেই একদিন। সময়ের যে দৃশ্যমান সংকট তা সাময়িক। তিনি বলেন–
‘বাঙালির জীবনে আজ যে অন্ধকার, যে-দৈন্য তা ক্ষণিকের বলেই আমি বিশ্বাস করি। বাঙালি আবার উঠবে, জাগবে, কারণ তার সংস্কৃতিতে, তার জীবনবোধে সেই গভীর প্রত্যয় রয়েছে। আদি-অন্ত বাঙালি হয়েই বাঙালিকে বিশ্বসভায় তার আত্মশক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য যা প্রয়োজন তা হলো নতুন প্রজন্মের কাছে তার হাজার বছরের সংস্কৃতির দিকগুলো তুলে ধরা, তার উপলব্ধিতে সর্বমানবের মুক্তি-সংগ্রামকে জাগ্রত করা। বাঙালিকে বিশ্বের সব সংগ্রাম মানুষের সঙ্গে এক হয়েই এগোতে হবে তার বন্ধন মুক্তির জন্য, তার আত্মসত্তার পূর্ণবিকাশের জন্য।’ (পৃষ্ঠা-৬২, প্রাগুপ্ত)
ড. অনুপম সেন আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির এক সুনিপুণ যোদ্ধা এবং দেশচেতনা ও সুন্দর স্বদেশ প্রতিষ্ঠার এক অগ্রগণ্য বাঙালি। তাঁর প্রজ্ঞাদীপ্ত জীবন আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, শিক্ষা তথা সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত। পাঠজীবন, ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মজীবন, প্রবাসজীবন এবং রাজনৈতিক জীবনপ্রবাহে তিনি আমাদের সমাজের প্রাগ্রসর মানুষ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তক, বিশ্লেষক ও দার্শনিক। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা, সমাজ-লগ্নতা এবং প্রগতিবাদিতা সবসময়েই ছিল অক্ষুণœ। রাজনীতি, সমাজতন্ত্রবাদ, মার্কসীয় সাহিত্যচিন্তা বিষয়েও তাঁর মন ছিল অর্গলমুক্ত। আধুনিকতা, নান্দনিকতা, বিশ্বনাগরিকতা, মননশীলতা এবং দেশ ও বৈশ্বিক রাষ্ট্রকল্পনার সাংগীতিক সমন্বয়- প্রতিটি ক্ষেত্রে ড. অনুপম সেনের সুগভীর বোধ-বীক্ষণ এক কথায় অসাধারণ। ভাষাপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, দেশচেতনা ও সমাজভাবনা তাঁর জীবনকেন্দ্রিক অধ্যয়নের উল্লেখযোগ্য বিষয়। বাঙলা ভাষার প্রতি তাঁর দরদ অপরিসীম। এক আলাপচারিতায় তিনি বলেন-
‘আমাদের দেশের সরকারি বেসরকারি প্রত্যেক ইউনিভার্সিটিতে বাংলা পড়ানো দরকার। এটা খালি শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যম নয়, আমাদের জীবন ধারনেরও মাধ্যম। এ ভাষা যত উন্নত হবে, এ ভাষায় যত গভীর চিন্তা করতে পারব, ততই আমরা এগোব। আমরা বিদেশি ভাষা দিয়ে এত গভীর চিন্তা করতে পারব না। কিন্তু আমরা এখন বর্তমানে ইংরেজির পেছনে দৌঁড়াচ্ছি। পৃথিবীতে যে দেশই এগিয়েছে, সেদেশই নিজের ভাষা দিয়ে এগিয়েছে। সেটা চীনই হোক, জাপানী বা আমেরিকান হোক। এটা সব সময় মনে রাখতে হবে।’
একজন মানুষ তার নিজের মধ্যে আপন স্বকীয়তার অস্থিত্ব অনুভব করতে না পারলে, অন্যের উপস্থিতিটা তার কাছে অনুপস্থিতিই থেকে যায়। তখনই দেখা দেয় আমিত্বের সর্বস্ব গ্রাস করবার পাশবিক মনোবৃত্তি। যা আজ আমাদের রাজনৈতিক ধারাগুলোর মধ্যে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ‘আমরা বাঙালি’ চির শাশ্বত এই সত্য ও রাজনৈতিক দর্শনকে ধারণ করাই আজকের জীবন চলার পথে বাঙালির প্রাথমিক ও প্রধান কাজ। অধ্যাপক সেন আমাদের ভেতরে বাঙালি চেতনা কিভাবে কাজ করতে হবে কিংবা হাজার বছরের ঐতিহ্যিক বাঙালি হিসেবে আমাদের বৈশ্বিকভাবনা কি হওয়া উচিত তারই চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর মূল্যবান প্রবন্ধে-
‘প্রকৃত-বাঙালি হতে হবে বিশ্ব নাগরিক হয়েই; নিজের মানবসত্তার পূর্ণতা-দেয়ার-সংগ্রামের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মানবসত্তার পূর্ণতা দেয়ার প্রতিজ্ঞা যুক্ত করেই। বাঙালির এই সংগ্রাম এখনো অপূর্ণ, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে তাকে আরো বহু-পথ হাঁটতে হবে। এই পথ চলায় তার পাথেয় হবে নিজের হাজার বছরের ঋদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, তার মুক্তি-সংগ্রামের অঙ্গীকার।’
(আদি-অন্ত বাঙালি, বাঙালি সত্তার ভ‚ত-ভবিষ্যৎ- অনুপম সেন, পৃষ্ঠা-৬৩)
একটি জনপদ কিংবা জাতিরাষ্ট্র কিছু কিছু মানুষের পথনির্দেশনায় গড়ে ওঠে। তাঁদের সারাজীবনের অর্জিত জ্ঞান দেশ-মানুষ-সমাজের জন্য নিয়োজিত করেন। তাঁদের সৃজনীশক্তি, মননশীলতা ও জ্ঞানের অভাবনীয় অবদান জাতিরাষ্ট্রের অগ্রগতির প্রেরণা হয়ে মুখ্য ভ‚মিকা পালন করে। আদি-অন্ত বাঙালি পুরুষ ড. অনুপম সেন তাঁর চিন্তা ও কর্ম দিয়ে বাঙালি সমাজকে আধুনিক মূল্যবোধ ও স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। পোশাক পরিচ্ছদে, আহারে-বিহারেও তিনি একজন প্রকৃত বাঙালিই।
তিনি আমাদের বাঙালি মননের প্রতীক, চেতনার বাতিঘর। আগামী ৫ আগস্ট এই মহান মানুষটি আশি বছরে পা রাখবেন। দেশের সমাজ-মানুষ তার যাপনপ্রবাহে অধ্যাপক সেনের মতো করে বাঙালি চিন্তাকে ধারণ ও লালন করুক এটাই সময়ের প্রত্যাশা।