অধ্যবসায়ী মানুষ মোহাম্মদ ইসহাক

মহসীন কাজী

25

মোহাম্মদ ইসহাক। সংবাপত্র বিপণন ব্যবসায় অতি পরিচিত নাম। কিশোর বেলায় যুক্ত হয়ে আমৃত্যু ছিলেন এই জগতে। সাড়ে পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতায় হৃদ্ধ মানুষটি ছিলেন সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, বিপণন কর্মকর্তা-কর্মীদের কাছের মানুষ; পরামর্শক। দেশের সংবাদপত্র বিপণন জগতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইসহাক নেতৃত্ব দিয়েছেন বিপণনকারীদের কেন্দ্রীয় সংগঠনে। ছিলেন বাংলাদেশ সংবাদপত্র এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি, ঢাকা সংবাদপত্র কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও চট্টগ্রাম সংবাদপত্র এজেন্ট সমিতির সাধারণ সম্পাদক। সংবাদপত্র এজেন্টের কর্মচারী হিসেবে এ পেশায় যুক্ত হয়ে পৌঁছে যান খ্যাতির শীর্ষে। ঢাকা-চট্টগ্রামে সংবাদপত্রের বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় তাঁর প্রতিষ্ঠিত মেসার্স মোহাম্মদ ইসহাক নামের এজেন্ট হয়ে। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিদিন পাঠকের কাছে যায় হাজার হাজার সংবাদপত্র।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ থাকলেও সংবাদপত্র হকারদের ছিল সর্বত্র যাতায়াত। ক্যান্টনমেন্ট থেকে সার্কিট হাউস সব জায়গায় পেপার বিলি করতে যেতেন মোহাম্মদ ইসহাক। বাইসাইকেলে তিনি শুধু পেপার বিলিই করতেন না। নজর রাখতেন পাক বাহিনীর গতিবিধির উপর। জানতে চেষ্টা করতেন তারা কোন সময় কোথায় যায়। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলে দিনভর পাওয়া নানা তথ্য পৌঁছে দিতেন শহর এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। তিনি বিভিন্ন সময় পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে যুদ্ধকালীন এই ভ‚মিকার কথা বলতেন। একবার আমাকেও জানিয়েছিলেন এ সব তথ্য। সেসব নিয়ে ২০০৫ সালে আজকের কাগজে ছাপা হয়েছিল একটি তথ্যবহুল সাক্ষাৎকার।
মোহাম্মদ ইসহাকের ম্যানেজার মরহুম তফসির আহমেদও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সংবাদপত্র হকার। ২০০১ সালের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় ব্যথিত ছিলেন তিনি। তখন তিনি আক্ষেপের সাথে বলতেন, ‘এখন মানুষ সাংবাদিক পেটায়। কী তাদের বিবেকবোধ আমার মাথায় আসে না। যুদ্ধের সময় পাক বাহিনী হকারদের যে শ্রদ্ধাবোধ দেখাত। এখনকার কিছু মানুষ সাংবাদিকদেরও তেমন ইজ্জত করে না’। এ প্রসঙ্গে যুদ্ধকালে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
বলেন, ‘একাত্তরের তুমুল যুদ্ধের সময় পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলাম। ভাবলাম, আমার জীবন শেষ। মনে মনে দোয়া-কলমা পড়ছিলাম’। এক পর্যায়ে এক পাকিস্তানী সৈন্য জানতে চান, কি কাজ করি। বললাম, ‘নিউজ পেপার হকার’। তারপর তারা কি যেন বললেন। আমাকে ছেড়ে দেন। এও বলে দেন, আর কেউ ধরলে যাতে নিউজ পেপার হকার পরিচয়টা দিই।
জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সমাজসেবায়ও মনোনিবেশ করেন মোহাম্মদ ইসহাক। মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ভ‚মিকা রাখেন তিনি। আত্মীয়-স্বজনদের নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন। জীবদ্দশায় কয়েক বছর ধরে বাকলিয়া মজিদিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন।
সংবাদপত্র ব্যবসার পাশাপাশি তিনি তিন দশক আগে যুক্ত হন রড, সিমেন্ট ব্যবসায়। এ ব্যবসায়ও সফল হয়ে উঠেন তিনি। মেসার্স নজরুল ট্রেডিং রড, সিমেন্ট ব্যবসায় চট্টগ্রামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। ছিলেন এ খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি।
মোহাম্মদ ইসহাক একেবারে শৈশবে হারিয়েছিলেন বাবা আবদুল গণিকে। অভাবের মাঝে মায়ের আঁচলে বেড়ে উঠা। সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোয়নি মায়ের। দু’এক ক্লাসের পর ছেলেকে পাঠাতে পারেননি পাঠশালায়। পাঠাতে হয়েছে জীবন-জীবিকার সন্ধানে। দুরন্ত ছেলেটিও বুঝলো। এভাবে আর না। গাছের এ ঢাল ও ঢালে ঘুরে ফল কুড়ানো, পুকুরে ঝাঁপ-সাঁতার বাদ। নেমে পড়ে জীবনসংগ্রামে।
গ্রামের বাড়ি চন্দনাইশের হাশিমপুর ছেড়ে চাকরি নেন চট্টগ্রাম নগরীতে নুরুল ইসলাম চৌধুরীর সংবাদপত্র এজেন্টে। পত্রিকার গাইড খোলা ছিল তার কাজ। গাইড খোলার সময় উচ্ছিষ্ট ঢাল, সূতলী সযতনে সংগ্রহ করে রাখতেন বাড়তি আয়ের জন্য। বেশ কিছু জমার পর বিক্রি করতেন। দুরন্ত হলেও কাজে ছিলেন পারদর্শী, তাই গাইড খোলার কাজ করতে হয়নি বেশিদিন। শুরু করেন হকারী। সংবাদপত্র এজেন্ট মোহাম্মদ ইব্রাহিমের অধীনে সরবরাহ শুরু করেন পেপার। ইতোমধ্যে সাথে নেন মামাতো ভাই মো. আবদুল মালেককে। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়কে সাথে করে এগিয়ে যেতে থাকেন। ইতোমধ্যে টেলিগ্রাফ রোডে উপেন্দ্র বাবুর হোটেলের সামনে খোলেন পানের দোকান। হকারীর সাথে সাথে দেশ স্বাধীনের আগেই গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান। পরিপূর্ণ এজেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরও সাইকেলে পেপার বিলি অব্যাহত রাখেন। এভাবে চলার কয়েক বছরের মধ্যে তার প্রতিষ্ঠান সংবাদপত্র বিপণনে শীর্ষস্থানে উঠে আসে।
সংবাদপত্র ব্যবসায়ী ছাড়াও মোহাম্মদ ইসহাক ছিলেন একজন পড়ুয়া মানুষ। তিনি বলতেন, ‘পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করি। কোন পত্রিকা কেমন তা না পড়লে বুঝব কেমন করে। পাঠক জানতে চাইলে কী জবাব দেব। তাই নিজে পড়ি এবং দেখি গেটআপ-মেকআপও। ভাল লাগলেও পত্রিকার সম্পাদক, সাংবাদিকের বলি, আবার খারাপ লাগলেও নিজের অনুভূতি জানাই। এতে পাঠক এবং পত্রিকা কর্তৃপক্ষ উভয়েরই লাভ’।
কোনো সুধী সমাবেশে মোহাম্মদ ইসহাকের বক্তব্য শুনলে বোঝার উপায় ছিল না তিনি খুবই কম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন লোক। বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং পড়ার অভ্যেসের কারণে ভাল বলতে পারতেন এবং পরামর্শ দিতে পারতেন। জাতীয়, আন্তর্জাতিক, স্থানীয় সববিষয়ে আপডেট থাকতেন তিনি। সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত না থাকলেও ধারণ করতেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে ছিল তাঁর সুসম্পর্ক।
এদেশের সংবাদপত্র জগতের দিকপালদের সাথেও ছিল তাঁর ভাল সম্পর্ক। হকার জীবনের শুরুতে পরিচয় হয় দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকের সাথে। কম বয়সী হকার হয়েও যে পরিমাণ পত্রিকা নিতেন সব বিক্রি করে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিলেন। দৈনিক পূর্বকোণের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরীরও স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। পত্রিকা বিপণনের বিভিন্ন বিষয়ে চৌধুরী সাহেব ডেকে নিতেন মোহাম্মদ ইসহাককে।
এছাড়াও মরহুম এবিএম মুসা, মরহুম মাহাবুবুল আলম, গোলাম সারওয়ার, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, কাজী শাহেদ আহমেদ, ইকবাল সোবহান চৌধুরী, মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমান চৌধুরী, শফিক রেহমান, খোন্দকার মোজাম্মেল হক, মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু, অমিত হাবিব, নঈম নিজাম, ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখ জাঁদরেল সম্পাদকদের সাথে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠতা। চট্টগ্রামের সিনিয়র থেকে তরুণ প্রায় সব সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রসেবীর ছিলেন কাছের মানুষ।
প্রতিভাবান এই ব্যবসায়ী গত ২৭ জানুয়ারি রাতে ঢাকার অ্যাপেলো হাসপাতালে ৬৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহে রাজিউন। মৃত্যুকালে ৫ মেয়ে ও ৩ ছেলে রেখে যান। তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান নজরুল ইসলাম সংবাদপত্র এজেন্টের হাল ধরেছেন। দ্বিতীয় ছেলে নসরুল ইসলাম ও ছোট ছেলে দিদারুল ইসলাম অন্যান্য ব্যবসা দেখভাল করছেন। তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম একজন অধ্যবসায়ী ও বিরল প্রতিভাধর ব্যবসায়ীকে হারিয়েছে। যিনি সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে জান্নাতবাসী করুন।

লেখক : সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব