অগ্নি-দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে চার শতাধিক স্থাপনা

তুষার দেব

44

শুষ্ক মৌসুম শুরু হতে না হতেই প্রতিদিনই নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে একের পর এক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে। ইতিমধ্যে সংঘটিত কয়েকটি অগ্নিকান্ডে নারী ও শিশুর মৃত্যুসহ ব্যাপক সম্পদহানি হয়েছে। নিয়মিত অগ্নিনির্বাপন মহড়াসহ সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেও অগ্নিকান্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। উল্টো ঘনবসতি ও সংকীর্ণ সড়কের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত কমতে থাকা পানির উৎস অগ্নি-দুর্ঘটনার ঝুঁকিকে ক্রমেই ভয়াবহ করে তুলছে। নগরীতে বর্তমানে শিল্প-কারখানা, গুদাম, মার্কেট ও বসতি মিলিয়ে চার শতাধিক স্থাপনা অধিক মাত্রায় অগ্নি-দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে, নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ বা অধিকতর ঘিঞ্জি এলাকা হিসেবে পরিচিত রেয়াজউদ্দিন বাজার, জহুর হকার্স মার্কেট, কর্ণফুলী সিঙ্গাপুর মার্কেট, আগ্রাবাদের মোগলটুলী, মাদারবাড়ি, বাকলিয়ার মিয়াখান নগর, পাহাড়তলীর আমবাগান, ইপিজেডের কলসী দীঘির পাড়, বায়েজিদ শেরশাহ এলাকার বেশকিছু কলোনি ভয়াবহ অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এসব এলাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতিরও শঙ্কা রয়েছে। কারণ, এসব এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বা চলাচলের সড়কগুলো এতই সরু এবং সংকীর্ণ যে ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপক গাড়ি ও দমকল কর্মীদের দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানো একপ্রকার অসম্ভব। বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্ভাব্য অগ্নি-দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাসের বদলে দুর্ঘটনাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুতেই নগরীর প্রাণকেন্দ্র আন্দরকিল্লার একটি পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকান্ডে হতাহতের ঘটনা ঘটে। গত ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলায় থাকা ‘গার্ডিয়ান আইপিএস’ নামের দোকানে আগুন লেগে দগ্ধ হয়ে মারা যান দোকানমালিক শুভ্র দাশ বাবু (৫০)। এ ঘটনায় দগ্ধ ও ধোঁয়ায় অসুস্থ হন আরও সাতজন। মো. ইকবাল, অঞ্জন দাশ, বিজয় চৌধুরী, জুয়েল দে, রহিম বাদশা, বাবলু ও মিন্টু হাসান নামে আহত ও অসুস্থরা সবাই ওই দোকানের কর্মী ছিলেন। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সূত্রপাত হওয়া আগুন ওই দোকানে রাখা আইপিএসের ব্যাটারির তরল উপকরণসহ কেমিক্যালে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভবনে উঠানামার সিঁড়ি ছিল অতি সংকীর্ণ।
একইভাবে গত ৩১ আগস্ট বিকেলে নগরীর সদরঘাট থানার মাঝিরঘাটের স্ট্র্যান্ড রোডে একযোগে সাতটি লবণ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে চারটি কারখানা পুরোপুরি আগুনে ষ পৃষ্ঠা ৯, কলাম ৩
ষ প্রথম পৃষ্ঠার পর

পুড়ে যায়। বাকি তিনটি কারাখানা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শতভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কারখানাগুলো হল, মেসার্স সুমন সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, জননী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, তানভীর সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও সী সাইট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এছাড়া পপুলার সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সাগুপ্তা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও এলিট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি অগ্নিনির্বাপক গাড়ি নিয়ে দমকল কর্মীরা দ্রæততম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছলেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। স্থানীয়ভাবে পানির উৎস না পাওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের বেগ পেতে হয়েছে। এমনকি সড়ক না থাকায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের অন্য কারখানার টিনের ছাদে উঠেও আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হয়েছে। সর্বশেষ গত ২২ নভেম্বর দুপুরে নগরীর নন্দনকানন এলাকায় আগুন লেগে মমতাজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন ১২টি কাঁচা বসতঘর পুড়ে যায়। এতে অর্ধ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বিভাগীয় কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন ভুঁইয়া পূর্বদেশকে বলেন, ‘অসাবধানতাই অগ্নিকান্ডের প্রধান কারণ। আমরা অভ্যাসগত কারণেই অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি তৈরি করে রাখি। এছাড়া, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করা হয় না। যে কারণে অগ্নিকান্ড সংঘটিত হলেও তা নির্বাপনে ফায়ার কর্মীদের বেগ পেতে হয়। ফায়ার সনদ নিলেও নির্দেশনা অনুসরণে অভ্যস্থ হচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। একইভাবে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম সংরক্ষণ করলেও প্রয়োজনীয় মুহূর্তে তা ব্যবহার করা হয় না। ভবন নির্মাণে ত্রুটি থাকায় কোনও কোনও সময় প্রাণহানি বেশি ঘটে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও ভবনের ভেতরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও ত্রুটিমুক্ত নয়। যে কারণে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অগ্নিকান্ডের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে পাওয়া যায়। নগরে নির্বিচারে জলাশয় ভরাটের কারণে অগ্নি নির্বাপণে পানি সংকটে ভুগতে হয়। এক্ষেত্রে, সকলে নির্দেশনাগুলো মেনে সাবধানতা অবলম্বন করলে অগ্নিদুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব।’
অগ্নি প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, অসাবধানতা এবং অসচেতনতার কারণেই অগ্নিকান্ডের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা কিংবা হ্রাস করা যাচ্ছে না। ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অগ্নিনির্বাপন মহড়াসহ সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচির পরও এক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল অর্জিত হচ্ছে না। এছাড়া, অগ্নিপ্রতিরোধ ও অগ্নিনির্বাপন আইন-২০০৩ এর পর সরকার সর্বশেষ ২০১৪ সালে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপন বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক করলেও বিধিমালার অনেক ধারাই বাস্তবে উপেক্ষিত থাকছে।
সচেতনতা ও সতর্কতামূলক নির্দেশনা : অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপন বিধিমালায় অসাবধানতাই অগ্নিকাÐের প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করে অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় বেশকিছু নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, রান্নার পর চুলার আগুন নিভিয়ে রাখা, বিড়ি বা সিগারেটের জ্বলন্ত অংশ নিভিয়ে নিরাপদ স্থানে ফেলা, ছোট ছেলেমেয়েদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে বিরত রাখা, খোলা বাতির ব্যবহার বন্ধ রাখা, ক্রটিযুক্ত বৈদ্যুতিক তার ও সরঞ্জাম ব্যবহার না করা, হাতের কাছে সব সময় দুই বালতি পানি বা বালু রাখা, ঘরবাড়ি-অফিস আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সার্বক্ষণিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, বাসগৃহ, কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি নির্বাপনী যন্ত্রপাতি স্থাপন করা এবং মাঝে মাঝে তা পরীক্ষা করা, প্রতিটি শিল্প-কারখানা ও সরকারি-বেসরকারি ভবনে ফায়ার সার্ভিস অধ্যাদেশ অনুযায়ী অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা, কল-কারখানার কাছে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখা, গুদাম বা কারখানায় ধূমপান নিষিদ্ধকরণ ও সতর্কীকরণ পোস্টার লাগানো, স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের টেলিফোন নম্বর সংরক্ষণ ও ফায়ার সার্ভিস থেকে অগ্নি-প্রতিরোধ ও নির্বাপন বিষয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা, অগ্নি সচেতনতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা, স্থানীয়ভাবে অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপনের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলা ইত্যাদি।