অগ্নিকোণ : ঐতিহাসিক অগ্নিঝরা বিয়োগাত্মক গল্প গাঁথা

শাকিল আহমদ

7

চট্টগ্রামের মাটি-মানুষ- সংস্কৃতি শিক্ষাও জিবীকার সাথে আষ্ঠে-পৃষ্টে লেপ্ট্ েআছে আজাদ বুলবুল নামটি প্রায় চার দশক ধরে। যদিও বা তাঁর জন্ম (১৯৬৫) নোয়াখালী জেলার চাইখিলে। চট্টগ্রামকে গভীর ভাবে ভালবাসার এবং জানার এক অদম্য বাসনা নিয়েই তাঁর পথ চলা-শহর, গ্রাম পথ প্রান্তর হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনজীবন পর্যন্ত। সৃষ্টিশীলতার শুরু কথা সাহিত্যের ঋদ্ধ ভ‚বন ছোট গল্পের মধ্য দিয়ে হলেও বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যায়ন শেষে যুক্ত হন গবেষনার জটিলতত্তে¡। তাঁর গবেষনার প্লেক্ষাপট বিষাল পার্বত্য চট্টগ্রাম। ‘‘খাগড়াছড়ির ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ভাষাও সংস্কৃতি’’ বিষয়ে এম.ফিল এবং ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সংস্কৃতিঃ প্রেক্ষিত চাকমা মারমা ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠী’ বিষয়ে পি,এইচডি সম্পন্ন করেই খান্ত থাকেননি তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা সংস্কৃতি ইতিহাস নৃতত্ত¡ সহ নানা অনুসঙ্গ কেন্দ্র করে প্রায় দুই দশক পর্যন্ত গবেষনা ও সেখানে অবস্থান করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি বিষয়ক আটটি তথ্য ও তত্ত¡ মূলক আকড় গ্রন্থ রচনা করেন। জীবনে তারুন্যের উজ্জ্বল সময় কাটিয়েছেন হালদা পাড়ে। প্রত্যক্ষ করেছেন হালদা তীরবর্তী জনজীবন। ধীবর অদুষিত পল্লী গ্রামের জীবনযুদ্ধ। স্বর- ঋতুতে হালদার নানা রূপ এবং নদী খেকো মানুষের অত্যাচারে কীভাবে বিধ্বস্থত হচ্ছে একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের আধার এই হালদা নদী। এসব বিচিত্র অভিজ্ঞতার আলোকে রচনা করেন হালদা চলচিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্য। আর এই জীবন ঘনিষ্ঠ সৃজনশীলতার অনন্য প্রকাশ দেশের মাটি ছারিয়ে পাশ্চাত্যের মাটিতে ও বিস্তার লাভ করে। চট্টগ্রামের শতবছরের গৌরবোজ্জ্বল চাপা পড়া ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে উৎজিবীত করে তোলা আর এক সৃজনী প্রতিভা আজাদ বুলবুলের ‘অগ্নিকোণ’ ভারতের স্বার্ধীনতা সংগ্রামে মাষ্টারদা সূর্যসেনও তাঁর সহ-যোদ্ধাদের সশস্ত্র যুব বিদ্রোহ ও আত্মত্যাগের বিষাদময় আখ্যান এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বার্মার সম্পর্ক ও বিদ্বেদেশের নানা অনুসঙ্গ নিয়ে ইতিহাসাসৃত একসহাকাব্যিক উপন্যাস অগ্নিকোণ। আর এই অগ্নিকোনকে নিয়েই খানিকটা আলোকপাত।


‘অগ্নিকোন’ রচনার ইতিহাসিক সময়কাল ১৯২০-১৯৩৪। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যন্ত্রকাতর সমাজ জীবনের প্রচন্ড হতাশাও নৈরাজ্য থেকে মুসলিম যুব সমাজের বার্মা গমন এবং আর এক যুবসমাজ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অহিংস- সহিংস আন্দোলনে যোগদান। উপন্যাসের সূত্রপাত চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী ‘ফতেয়াবাদ স্কুলের’ সে সময়কার চিরচেনা ক্যাম্পাসটি ক্রমশ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিঁতের মধ্য দিয়ে। সেই স্কুলের মেধাবী ছাত্র শামসুল আলম যে কল্যান দত্ত স্যারের কাছে গিয়ে স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষা নেবার আকুতি জানান তাতে রয়েছে লেখকের চরিত্র নির্বাচনের মুন্সিয়ানা। কারণ শামসুল আলম চরিত্রটি বাস্তবেই সেই স্কুলের পাশ্ববর্তী গ্রাম ছড়ার কুলের এক সভ্রান্ত মুসলিম সাহিত্যিক আলম পরিবারেরই সন্তান। যাদের সাথে যোগসূত্র রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক কাজী নজরুল ইসলামেরও। নানা আঙ্গীকে বিচার করলে এই উল্লেখযোগ্য চরিত্রটি দিয়ে কাহিনীর সূত্র পাতে লেখক যথাযথ স্থানে সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে। ইতিহাসের মূল উপদান খোঁজা কখনো ওপন্যাসিকের প্রধান কাজ না হলেও, উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে পাঠক মাত্রই ইতিহাসের অনুসঙ্গের বাস্তবতাকে খুঁেজ নেবার প্রবনতা লক্ষনীয়, অন্তত এই অগ্নিকোনের ক্ষেত্রে।
ইতিহাসের যোগসূত্রকে কাহিনীতে সংযুক্ত করার প্রচেষ্টা এই ওপন্যাসিকের বরাবরই লক্ষনীয়। মূলত কথাশিল্পী আক্তাদ বুলবুল উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসে দুই শতাধিক ঐতিহাসিক চরিত্রকে অনুসঙ্গ করে ইতিহাস- কল্পনা- আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে চট্টগ্রামের যুববিদ্রোহের আনুপূর্বিক ঘটনাই উপস্থাপন করেছেন। ব্রিটিশ মিলিটারিও পুলিশ বাহিনী বিপ্লবী সূর্য সেনকে ধরার জন্য হন্ন্যা হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু বহরূপ ধারণ করা বিল্পবী সূর্যসেনের টিকিও তারা খুঁজে পাচ্ছে না।
“চট্টগ্রাম অস্ত্রগার লুন্ঠনের ছয়মাস পেরিয়ে গেছে। পুলিশ এখনো উল্লেখযোগ্য কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। …….. চারদিক থেকে আসছে নানামূখী খবর। এর কোনটাকেই সুসংবাদ বলা যায়না। অম্বিকা চক্রবর্তী আর নির্মলসেন তাদের নেতাকে একদন্ডও চোখের আড়াল রাখতে চান না।………… মাস্টার দা কখনো কখনো রাগ করে বলেন, তুমি কি আমাকে জন বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চাও ?নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যদি আমাকে মানুষ থেকে আলাদাই করেফেল তা হলে কাজ করব কাদের নিয়ে। ……. কয়েকজন শিক্ষিতা তরুনী নেতার সাথে সাক্ষাৎ করে দলভ‚ক্ত হতে চায়। নিমর্লসেন এদের দু’জনকে বেশ ভালোভাবেই চেনেন। একজন অপর্নাচরণ বালিকা স্কুলের হেডমিস্ট্রেস প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার অন্যজন চট্টগ্রাম কলেজের আই এসসির ছাত্রী কল্পনা দত্ত। প্রীতি দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে কাজ করেছে। কিন্তু শফত গ্রহণ করে দলভ‚ক্ত হবার সুযোগ পায়নি।” (পৃষ্ঠা- ২৮৩-২৮৫)। ওপন্যাসিক এভাবে কৌশলে বিপ্লবী মাস্টার দার শসন্ত্র সংগ্রাম কৌশল এবং অন্যতম বিপ্লবীদের কেও দলে অন্তভর্‚ক্তির বর্ণনা দিয়েছেন সুনিপুনভাবে। এখানে অপেক্ষাকৃতি গৌনচরিত্রগুলোকেও যথার্তও প্রাসঙ্গীক ভাবেই কাহিনীতে সংযোজন করা হয়েছে। মহানায়কোচিত চরিত্র মাস্টারদা সূর্যসেনও প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার কেও কল্পনা আর অবেগ দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি। চট্টগ্রামের যুববিদ্রোহের ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনায় যতটুকু প্রয়োজন ছিল এতটুকুই ঐতিহাসিক কাহিনীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। সুতরাং, অগ্নিকোন পাঠে কখনো মনে হয়নি সূর্যসেনকে এক মহানায়ক হিসেবে আর্বিভাব ঘটানোর প্রানান্থ চেষ্টা ছিল। ইতিহাসের অমুক নিয়মেই যেন প্রধান চরিত্রটি গতিময়তা লাভ করে বিয়োগান্তক পরিনতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহী চরিত্র প্রীতি লতা কল্পনা দত্ত, যতীন্দ্রমোহন সেন গুপ্ত, নেলীসেন গুপ্ত, রঞ্জন সেন, নির্মল সেন, লোকনাথ যেন সেই যুববিদ্রোহের, সেই অস্ত্রাগার লুন্ঠনের, জালালাবাদ যুদ্ধের, ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমনে এক জীবন্ত ইতিহাসের মতো ধরা দিয়েছে অগ্নিকোণে।-“আমরা বিপ্লবী। আমরা ইন্ডিয়ান রিপাবলিক আর্মীর সদস্য। এই অস্ত্রাগার দখলের জন্য আমরা এসেছি। তোমরা পালিয়ে যাও। নইলে কেউ প্রানে বাঁচতে পারবে না। ততক্ষনে অন্যান্য প্রহরীরা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ছাড়– রাইফেল। লোকনাথ গর্জে ওঠে। ……….. প্রথম গুলির আওয়াজ শুনে ঘর থেতেক অপ্রস্তুত অবস্থায় নৈশপোষাক পরা সার্জেন্স ফ্যারেল বেরিয়ে আসে। সেন্ট্রিকে ডাকাডাকি শুরু করে উচ্চম্বরে। কিন্তু সেন্ট্রিরা তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে মাটিতে। লোকনাথ ভারিক্কি গলায় বলে-দেখো ফ্যারেল চিৎকার চেঁচা মেচি করে কোন লাভ হবে না”…… (পৃষ্ঠা- ১৬৫)।
সশস্ত্র বিদ্রোহী বাবরীচুলের প্রীতিলতার অবয়ব সাধারণের চোখে যেভাবে ভেসে ওঠে ঠিক সে ভাবেই কাহিনীতে দাঁড় করানোর চেষ্ঠা ছিল। “সাতজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে রেলওয়ে কারখানার ভূতুড়ে অন্ধকারে অপেক্ষা করছে প্রীতিলতা। সঙ্গীদের পরনে চাটগাঁর মুসলমানদের মোত লুঙ্গিও কোর্তা। কোমরে গোঁজা পিস্তল ও রিভলভার। গলায় ঝোলানো ব্যাগে হাত বোমা। শান্তি চক্রবর্তীর হাতে দুপাশ ধারালো লম্বা তরবারি। প্রীতির পরনে পূর্ণ সামরিক পোষাক। খাকি ফুল প্যান্টের সাথে পায়ে ফুলহাতা মিলিটারি উর্দি, মাথায় পাঞ্জাবিদের আদলে বাধা পাগড়ি, পায়ে ভারি কাপড়ের জুতো। গলায় ঝোলানো ফিতা বাঁধা হুইশেল” (পৃষ্ঠা- ৩৩৭)।
ঐতিহাসিক এই ঘটনা প্রবাহের শতবর্ষপর এসে অগ্নিকোন রচনায় চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের সাথে বার্মার যোগসূত্র সৃষ্টিতে অনির্বায্য ভাবে এসে যাবে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার এক সভ্রান্ত ব্যক্তি আবদুল বারী চৌধুরীর নাম। সে সময়ে তিনি ছিলেন বার্মা এ্যাসেম্বলির সদস্য। বাস্তবে চট্টগ্রাম থেকে বার্মায় পারিজমানো অধিকাংশ বাঙালি তাঁর কোন না কোন আনুকুল্য পেয়েই বার্মা ব্যবসা বানিজ্যে প্রতিষ্ঠা পায়। বার্মা অঞ্চলে বারি চৌধুরীর অবস্থান এতোটাই বিস্তৃত ছিল যে তিনি এক সময় বার্মাতে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার স্বপ্নও পরিকল্পনা করেছিলেন। রেঙ্গুনে বিশাল সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেও তিনি স্বদেশী আন্দোলনের সাথে একাত্ত হয়েছিলেন। ইতিহাসে আজ বিস্মৃত প্রায় এই আবদুল বরি চৌধুরীর অনেক হারিয়ে যাওয়া তথ্যকে বেষ্ঠন করে সাহিত্যিক আজাদ বুলবুল চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ ও চট্টগ্রাম বার্মা সম্পর্ককে সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। যেহেতু এটিকোন ইতিহাস নয়, সাহিত্য, তাই বলা চলে বারি চৌধুরীর আরো বিস্তারিত কর্মকান্ড কাহিনীতে অজানা থাকলে ও পাঠক সমাজ তা দাবী করতে পারে না। বার্মার রেঙ্গুন শহরে তাঁর অবস্থান উপন্যাসের পাতায় এভাবে ওঠে আসে “রবিবার ছুটির দিন। আব্দুল বারি চৌধুরী এদিন ব্যবসায়িক কোন কাজ করেন না। বার্মা গনপরিষদের সদস্য হিসাবে এমনিতেই সামাজিক বহু কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। উমেদার, মোসাহেব, সাহায্যপ্রার্থীরা সকাল থেকেই অপেক্ষা করে অফিসের সামনে। চৌধূরী এদিন বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে খোশগল্পের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সমস্যাদি যথাসাদ্য সমাধা করে। …………. আলম প্রত্যেক দর্শনার্থীর নাম ঠিকানা আগমনের উদ্দেশ্য ও শুরুত্ব কাগজে লিখে বারি চৌধুরীর সামনে দাখিল করে” (পৃষ্ঠা- ১২৮) ।
রেঙ্গুন শহরের আর এক প্রতিষ্ঠিত বাঙালি ব্যবসায়ী সৈয়দ আহমদ। উপন্যাসের এই চপরিত্রটিও বাস্তবতা থেকে গল্পে ওঠে আসে। দেশের বর্তমান খ্যতিমান ব্যবসায়ী নাদের খানের পিতা সৈয়দ আহমদ ও বার্মায় অবস্থান করে স্বদেশী আন্দোলনকে উদজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে ভ‚মিকা রাখে। অগ্নিকোণ উপন্যাসে সৈয়দ আহমদের অবস্থান আবদুল বারি চৌধুরীর পরেই এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র। এদিকে বার্মা মুলুকেও তার অবস্থান ছিল বাস্তবে অনেকটা আবদুল বারি চৌধুরীর পরের অবস্থান। “পিডবিøউডির ঠিকাদার সৈয়দ আহমদ রেঙ্গুন বন্দরের জাহাজ ব্যবসায়ীদের প্রিয় পাত্র। জাহাজ রং করার কাজে তাঁর একক আধিপত্য। স্বগ্রামের ধনী ব্যবসায়ী আবদুল বারি চৌধুরীর সব জাহাজের রং করার কাজ তার কুক্ষিগত। এ ছাড়া চৌধুরীর বদন্ন্যতায় আরও আরও কাজ জোটানো সহজ হয়। ব্যস্ত টিকাদার হিসেবে তার কাজ চলে দেদারছে থিংগানযং এলাকায় একটি বাড়ি পছন্দ হয়েছে সৈয়দ আহমদের। ষোল একরের বিসাল বাড়ি। পিছনে ৪৪ একর ধানী জমি। বেশ কটি পুকুর আছে জমিতে।….. সৈয়দ আহমদ সর্বোচ্ছ বিডার হিসেবে সাড়ে সাত হাজার টাকায় কিনে বাড়িটি। সেখানে এখন তার নতুন ঠিকানা হয়েছে” (পৃষ্ঠা- ১০৩,১০৪)।
কথাসাহিত্যে ইতিহাসের ঘটনাকে অবলম্বন করে কাহিনী উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সমসাময়িক কালের পরিবেশ পরিস্থিতির দিকেও দৃষ্ঠি রাখতে হয়। অগ্নিকোনের আখ্যান কে বিশ্বস্থতার সহিত উপন্থাপন করার জন্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বহুল ব্যবহারেও পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন লেখ। যেহেতু শিক্ষা ও কর্মজীবনের দীর্ঘসময় চট্টগ্রাম অঞ্চলেই শুধু বসবাস করেননি, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময় কাঠিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। শহর চট্টগ্রাম ছারাও চট্টগ্রামের উত্তর-পূর্ব-পশ্চিম জর্নপথে যে ব্রিটিশ বিরোধী সহিংস আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল তার একটি নিপুন ইতিহাসনির্ভর বর্ণনা এই অগ্নিকোনে তুলে ধরতে কোথাও হুচট খেতে হয়নি। গ্রামের সাধারণ পার্শ্ব চরিত্র শুলো সৃষ্ঠিতেও লেখকের পারঙ্গমতা রয়েছে। তাঁদের সাধারণ আঞ্চলিক সংলাপের মধ্য দিয়েও উপন্যাসের মূল ¯্রােত স্বদেশী আন্দোলনের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক ভাবেই ওঠে এসেছে। বাংলা সাহিত্যের অপরাপর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির মতো ভারীক্ষি ভাষা তিনি ব্যবহার করেননি। সাবলিল – সহজ সরল ভাষায় কাহিনী গতিময়তা পেয়েছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মুসলিম পরিবারের (নি¤œ বর্গের) চিরাচরিত কথায় কথায় খিস্তিখেউড়ের আঞ্চলিক আধিক্য অধিক পরিমানে দেখা গেলেও মূলত সংগ্রাম বিদ্রোহের অধিকাংশ চরিত্রই চট্টগ্রামী হওয়াতে তাদের মধ্যেও কিছু সংলাপ রচনায় আঞ্চলিক ভাষা থাকাটা স্বাভাবিক ছিল। যা খুব একটা ওঠে আসেনি। উত্তর চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে যার সীমারেখা নির্ণয়ে লেখক ব্যর্থ হয়েছেন।
ওপন্যাসিক এই ঐতিহাসিক ঘঠনাকে কেন্দ্র বিন্দু করে অগ্রসর হলেও উপন্যাস যে জীবনের ঘনিষ্ঠতম শিল্প মাধ্যম বিষয়টি ক্ষনিকের জন্যও ভুলে যাননি বলে আনন্দ বেদনার জীবনভাষ্যের স্বাদ পেতেও পাঠকের বেগ পেতে হয়নি। ঐতিহাসিক উপন্যাস হওয়াতে অগ্নিকোন নাম করনে প্রতীকী মাধ্যম অবলম্বন না করে ইতিহাসাশ্রীত সাধারণ কোন নামাক্ষীত হলে আরো আবেদন পেতো বলে আমার বিশ্বাস।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের এই যুববিদ্রোহ ভারত বর্ষের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রায় শতবর্ষ পূর্বের এই শসন্ত্র বিদ্রোহে চট্টগ্রামের ভৌগলীক সীমারেখার যথার্তব্যবহার, চট্টগ্রামের সর্বশ্রেণরি মানুষের অংশগ্রহণ ও সমর্তন, চট্টগ্রামের দূরহ আঞ্চলিক ভাষার অধিক্য, দুই শতাধিক ইতিহাসিক চারিত্রের উপস্থিতি, যুব বিদ্রোহের চট্টগ্রাম বার্মার যোগসূত্র এবং চট্টগ্রামের মাটি মানুষের সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে মড়ে ওঠা আখ্যায়ন চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য কোন সাহিত্যিকের হাত ধরে সৃষ্ঠি হতে পারতো কিন্তু হয়ে ওঠেনি। যিনি এই দূর্সাহসীক কাজটি দেখিয়েছেন তিনি অন্য অঞ্চল থেকে ওঠে আসা একজন কথাকার। চট্টগ্রাম ইতিহাস কেন্দ্রিক অসংখ্য গ্রন্থ, সাময়িক পত্র, প্রবন্ধ থেকে ঐতিহাসিক তথ্য-ওপাথ্য-সংগ্রহ করে এক মহাকাব্যিক উপন্যাসের আদলে শৈল্পীক রূপদিতে পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন অগ্নিকোন গ্রন্থে।
মাস্টারদা সূর্যসেন ও তার সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য মাইল ফলক। সমগ্র পাকভরত উপমহাদেশ থেকে সূর্যসেনের দেশমাত্রিকার জন্য আত্মত্যাগের অবদান ইতিহাস থেকে কখনো অ¤øান হবার নয়। তাই তো শথ বর্ষ পরেও ভারত থেকে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি ড. প্রনব মুখারজী সম্প্রতি ছুটে আসেন বাংলাদেশের অগ্নিঝরা সেই অঞ্চল চট্টগ্রামে। তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন রাউজানে সূর্যসেনের সেই বাস্তুভিটা। সেদিন যদি এই ক্ষনজন্মা অগ্নিপুরুষের জন্ম না হতো, হয়তো বা আজকের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে প্রনব মুখারজীর এই সফর সম্ভব হতো না। মাষ্টারদা সূর্যসেনের বাস্তুভিটায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতির এমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। আর ওপন্যাসিক আজাদ বুলবুল-এর কাহিনী নির্বাচনের অনন্যতা এখানেই যে, এই আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক বিষয়ের বিষাদাত্মক আখ্যান এর আনুপূর্বিক বিবরনই হচ্ছে অগ্নিকোন।
চারশত আটচল্লিশ পৃষ্ঠার বৃহৎ উপন্যাস অগ্নিকোন যেমন আছে যুদ্ধোত্তর ভাগ্যান্নষনের চট্টগ্রাম থেকে একদল বার্মায় পাড়ি জমিয়ে থিতু হবার ঘটনা। আবার চট্টগ্রামের অনেকেই ধনে মানে বার্মায় আধিপত্য বিস্তার করলেও প্রাণ পরে আছে স্বদেশের স্বাদীনতার স্বপ্নে। উপন্যাসের পরিণতিতে এসে সমাপ্তী পর্ব তেষট্টিতে’চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহের যে বিয়োগাত্মক পরিনতি ঘটে তাতে শোকবাহ সমগ্র চট্টগ্রামের চিত্র অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে আকঁতে স্বক্ষম হয়েছেন এই কথাশিল্পী। – “অনন্ত সিংহের তামাকুমুন্ডির মন্ত্রির বাড়িতে সুনসান নীরবতা।…. আন্দরকিল্লায় কল্পনাদের বাড়িতে এখনো নিভেনি রাতের আলো। …. যোগেন্দ্র গুপ্তের দেবপাহাড়ের বাড়িতে আজ চুলা জ্বলেনি। ….. গভীর শোকে স্তদ্ধ চাটগাঁ শহর। কারফিউ তুলে নেয়া হয়েছে ভোর পাঁচটায়, এখন সকাল আটটা। কিন্তু রাস্তায় বের হয়নি মানুষজন, গাড়ি ঘোড়া।…… সারারাত দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি আবদুল বাড়ি চৌধুরী। সদর ঘাটের কর্তফুলীর পাড়ের এক দোতলা বাড়িতে কেটেছে তার নির্ঘুম রাত। সঙ্গী সৈয়দ আহমদও শামসুল আলম অস্থির ভাবে পায়চারি করছে বারান্দায়।… ভোর সকালে জানালা পথে দেখা যায় একটি ক্রজার ভাসছে কর্তফুলীতে। ….। বারি চৌধুরী দীর্ঘদিনের জাহাজ ব্যবসায়ী। তিনি বুঝেন কোন বিশেষ উদ্দেশ্য ছাড়া সিঙ্গাপুরের পতকাবাহী ক্রুজারটির এখানে ভেড়ানোর কথা নয়”। (পৃষ্টা ঃ- ৪৩৪-৪৩৫)।
আখ্যায়নের শেষাংসে এসে যুববিদ্রোহের আত্মত্যাগের বিষাদাত্মক পরিনাতিতে উল্লেখযোগ্য চরিত্র গুলোকে একই সমান্তরালে নিয়ে আসে। এবং ইঙ্গীত পূর্ণ বাখ্যে বুঝানো হয়েছে বিদ্রোহী মাষ্টার দা সূর্যসেনের ফাসির কাস্টে ঝুলানো লাশ বহন করে নিয়েযেতে কর্তফুলীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে এই সিঙ্গাপুরী ক্রুজারটি। ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতাকে আনুপৃর্বিক আক্রেধরে উপন্যাসের এই অগ্নিঝরা বিয়োগাত্মক পরিনতি কথা সাহিত্যিক আজাদ বুলবুল-এর সৃষ্টিশীলতার এক শৈল্পীক নৈপূর্নতাও বটে।অগ্নিকোণ : ঐতিহাসিক অগ্নিঝরা বিয়োগাত্মক গল্প গাঁথা
শাকিল আহমদ
চট্টগ্রামের মাটি-মানুষ- সংস্কৃতি শিক্ষাও জিবীকার সাথে আষ্ঠে-পৃষ্টে লেপ্ট্ েআছে আজাদ বুলবুল নামটি প্রায় চার দশক ধরে। যদিও বা তাঁর জন্ম (১৯৬৫) নোয়াখালী জেলার চাইখিলে। চট্টগ্রামকে গভীর ভাবে ভালবাসার এবং জানার এক অদম্য বাসনা নিয়েই তাঁর পথ চলা-শহর, গ্রাম পথ প্রান্তর হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনজীবন পর্যন্ত। সৃষ্টিশীলতার শুরু কথা সাহিত্যের ঋদ্ধ ভ‚বন ছোট গল্পের মধ্য দিয়ে হলেও বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যায়ন শেষে যুক্ত হন গবেষনার জটিলতত্তে¡। তাঁর গবেষনার প্লেক্ষাপট বিষাল পার্বত্য চট্টগ্রাম। ‘‘খাগড়াছড়ির ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ভাষাও সংস্কৃতি’’ বিষয়ে এম.ফিল এবং ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সংস্কৃতিঃ প্রেক্ষিত চাকমা মারমা ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠী’ বিষয়ে পি,এইচডি সম্পন্ন করেই খান্ত থাকেননি তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা সংস্কৃতি ইতিহাস নৃতত্ত¡ সহ নানা অনুসঙ্গ কেন্দ্র করে প্রায় দুই দশক পর্যন্ত গবেষনা ও সেখানে অবস্থান করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি বিষয়ক আটটি তথ্য ও তত্ত¡ মূলক আকড় গ্রন্থ রচনা করেন। জীবনে তারুন্যের উজ্জ্বল সময় কাটিয়েছেন হালদা পাড়ে। প্রত্যক্ষ করেছেন হালদা তীরবর্তী জনজীবন। ধীবর অদুষিত পল্লী গ্রামের জীবনযুদ্ধ। স্বর- ঋতুতে হালদার নানা রূপ এবং নদী খেকো মানুষের অত্যাচারে কীভাবে বিধ্বস্থত হচ্ছে একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের আধার এই হালদা নদী। এসব বিচিত্র অভিজ্ঞতার আলোকে রচনা করেন হালদা চলচিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্য। আর এই জীবন ঘনিষ্ঠ সৃজনশীলতার অনন্য প্রকাশ দেশের মাটি ছারিয়ে পাশ্চাত্যের মাটিতে ও বিস্তার লাভ করে। চট্টগ্রামের শতবছরের গৌরবোজ্জ্বল চাপা পড়া ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে উৎজিবীত করে তোলা আর এক সৃজনী প্রতিভা আজাদ বুলবুলের ‘অগ্নিকোণ’ ভারতের স্বার্ধীনতা সংগ্রামে মাষ্টারদা সূর্যসেনও তাঁর সহ-যোদ্ধাদের সশস্ত্র যুব বিদ্রোহ ও আত্মত্যাগের বিষাদময় আখ্যান এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বার্মার সম্পর্ক ও বিদ্বেদেশের নানা অনুসঙ্গ নিয়ে ইতিহাসাসৃত একসহাকাব্যিক উপন্যাস অগ্নিকোণ। আর এই অগ্নিকোনকে নিয়েই খানিকটা আলোকপাত।
‘অগ্নিকোন’ রচনার ইতিহাসিক সময়কাল ১৯২০-১৯৩৪। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর যন্ত্রকাতর সমাজ জীবনের প্রচন্ড হতাশাও নৈরাজ্য থেকে মুসলিম যুব সমাজের বার্মা গমন এবং আর এক যুবসমাজ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অহিংস- সহিংস আন্দোলনে যোগদান। উপন্যাসের সূত্রপাত চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী ‘ফতেয়াবাদ স্কুলের’ সে সময়কার চিরচেনা ক্যাম্পাসটি ক্রমশ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিঁতের মধ্য দিয়ে। সেই স্কুলের মেধাবী ছাত্র শামসুল আলম যে কল্যান দত্ত স্যারের কাছে গিয়ে স্বদেশী মন্ত্রে দীক্ষা নেবার আকুতি জানান তাতে রয়েছে লেখকের চরিত্র নির্বাচনের মুন্সিয়ানা। কারণ শামসুল আলম চরিত্রটি বাস্তবেই সেই স্কুলের পাশ্ববর্তী গ্রাম ছড়ার কুলের এক সভ্রান্ত মুসলিম সাহিত্যিক আলম পরিবারেরই সন্তান। যাদের সাথে যোগসূত্র রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক কাজী নজরুল ইসলামেরও। নানা আঙ্গীকে বিচার করলে এই উল্লেখযোগ্য চরিত্রটি দিয়ে কাহিনীর সূত্র পাতে লেখক যথাযথ স্থানে সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে। ইতিহাসের মূল উপদান খোঁজা কখনো ওপন্যাসিকের প্রধান কাজ না হলেও, উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে পাঠক মাত্রই ইতিহাসের অনুসঙ্গের বাস্তবতাকে খুঁেজ নেবার প্রবনতা লক্ষনীয়, অন্তত এই অগ্নিকোনের ক্ষেত্রে।
ইতিহাসের যোগসূত্রকে কাহিনীতে সংযুক্ত করার প্রচেষ্টা এই ওপন্যাসিকের বরাবরই লক্ষনীয়। মূলত কথাশিল্পী আক্তাদ বুলবুল উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসে দুই শতাধিক ঐতিহাসিক চরিত্রকে অনুসঙ্গ করে ইতিহাস- কল্পনা- আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে চট্টগ্রামের যুববিদ্রোহের আনুপূর্বিক ঘটনাই উপস্থাপন করেছেন। ব্রিটিশ মিলিটারিও পুলিশ বাহিনী বিপ্লবী সূর্য সেনকে ধরার জন্য হন্ন্যা হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু বহরূপ ধারণ করা বিল্পবী সূর্যসেনের টিকিও তারা খুঁজে পাচ্ছে না।
“চট্টগ্রাম অস্ত্রগার লুন্ঠনের ছয়মাস পেরিয়ে গেছে। পুলিশ এখনো উল্লেখযোগ্য কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। …….. চারদিক থেকে আসছে নানামূখী খবর। এর কোনটাকেই সুসংবাদ বলা যায়না। অম্বিকা চক্রবর্তী আর নির্মলসেন তাদের নেতাকে একদন্ডও চোখের আড়াল রাখতে চান না।………… মাস্টার দা কখনো কখনো রাগ করে বলেন, তুমি কি আমাকে জন বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চাও ?নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যদি আমাকে মানুষ থেকে আলাদাই করেফেল তা হলে কাজ করব কাদের নিয়ে। ……. কয়েকজন শিক্ষিতা তরুনী নেতার সাথে সাক্ষাৎ করে দলভ‚ক্ত হতে চায়। নিমর্লসেন এদের দু’জনকে বেশ ভালোভাবেই চেনেন। একজন অপর্নাচরণ বালিকা স্কুলের হেডমিস্ট্রেস প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার অন্যজন চট্টগ্রাম কলেজের আই এসসির ছাত্রী কল্পনা দত্ত। প্রীতি দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে কাজ করেছে। কিন্তু শফত গ্রহণ করে দলভ‚ক্ত হবার সুযোগ পায়নি।” (পৃষ্ঠা- ২৮৩-২৮৫)। ওপন্যাসিক এভাবে কৌশলে বিপ্লবী মাস্টার দার শসন্ত্র সংগ্রাম কৌশল এবং অন্যতম বিপ্লবীদের কেও দলে অন্তভর্‚ক্তির বর্ণনা দিয়েছেন সুনিপুনভাবে। এখানে অপেক্ষাকৃতি গৌনচরিত্রগুলোকেও যথার্তও প্রাসঙ্গীক ভাবেই কাহিনীতে সংযোজন করা হয়েছে। মহানায়কোচিত চরিত্র মাস্টারদা সূর্যসেনও প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার কেও কল্পনা আর অবেগ দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি। চট্টগ্রামের যুববিদ্রোহের ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনায় যতটুকু প্রয়োজন ছিল এতটুকুই ঐতিহাসিক কাহিনীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। সুতরাং, অগ্নিকোন পাঠে কখনো মনে হয়নি সূর্যসেনকে এক মহানায়ক হিসেবে আর্বিভাব ঘটানোর প্রানান্থ চেষ্টা ছিল। ইতিহাসের অমুক নিয়মেই যেন প্রধান চরিত্রটি গতিময়তা লাভ করে বিয়োগান্তক পরিনতির দিকে অগ্রসর হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহী চরিত্র প্রীতি লতা কল্পনা দত্ত, যতীন্দ্রমোহন সেন গুপ্ত, নেলীসেন গুপ্ত, রঞ্জন সেন, নির্মল সেন, লোকনাথ যেন সেই যুববিদ্রোহের, সেই অস্ত্রাগার লুন্ঠনের, জালালাবাদ যুদ্ধের, ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমনে এক জীবন্ত ইতিহাসের মতো ধরা দিয়েছে অগ্নিকোণে।-“আমরা বিপ্লবী। আমরা ইন্ডিয়ান রিপাবলিক আর্মীর সদস্য। এই অস্ত্রাগার দখলের জন্য আমরা এসেছি। তোমরা পালিয়ে যাও। নইলে কেউ প্রানে বাঁচতে পারবে না। ততক্ষনে অন্যান্য প্রহরীরা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ছাড়– রাইফেল। লোকনাথ গর্জে ওঠে। ……….. প্রথম গুলির আওয়াজ শুনে ঘর থেতেক অপ্রস্তুত অবস্থায় নৈশপোষাক পরা সার্জেন্স ফ্যারেল বেরিয়ে আসে। সেন্ট্রিকে ডাকাডাকি শুরু করে উচ্চম্বরে। কিন্তু সেন্ট্রিরা তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে মাটিতে। লোকনাথ ভারিক্কি গলায় বলে-দেখো ফ্যারেল চিৎকার চেঁচা মেচি করে কোন লাভ হবে না”…… (পৃষ্ঠা- ১৬৫)।
সশস্ত্র বিদ্রোহী বাবরীচুলের প্রীতিলতার অবয়ব সাধারণের চোখে যেভাবে ভেসে ওঠে ঠিক সে ভাবেই কাহিনীতে দাঁড় করানোর চেষ্ঠা ছিল। “সাতজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে রেলওয়ে কারখানার ভূতুড়ে অন্ধকারে অপেক্ষা করছে প্রীতিলতা। সঙ্গীদের পরনে চাটগাঁর মুসলমানদের মোত লুঙ্গিও কোর্তা। কোমরে গোঁজা পিস্তল ও রিভলভার। গলায় ঝোলানো ব্যাগে হাত বোমা। শান্তি চক্রবর্তীর হাতে দুপাশ ধারালো লম্বা তরবারি। প্রীতির পরনে পূর্ণ সামরিক পোষাক। খাকি ফুল প্যান্টের সাথে পায়ে ফুলহাতা মিলিটারি উর্দি, মাথায় পাঞ্জাবিদের আদলে বাধা পাগড়ি, পায়ে ভারি কাপড়ের জুতো। গলায় ঝোলানো ফিতা বাঁধা হুইশেল” (পৃষ্ঠা- ৩৩৭)।
ঐতিহাসিক এই ঘটনা প্রবাহের শতবর্ষপর এসে অগ্নিকোন রচনায় চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের সাথে বার্মার যোগসূত্র সৃষ্টিতে অনির্বায্য ভাবে এসে যাবে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার এক সভ্রান্ত ব্যক্তি আবদুল বারী চৌধুরীর নাম। সে সময়ে তিনি ছিলেন বার্মা এ্যাসেম্বলির সদস্য। বাস্তবে চট্টগ্রাম থেকে বার্মায় পারিজমানো অধিকাংশ বাঙালি তাঁর কোন না কোন আনুকুল্য পেয়েই বার্মা ব্যবসা বানিজ্যে প্রতিষ্ঠা পায়। বার্মা অঞ্চলে বারি চৌধুরীর অবস্থান এতোটাই বিস্তৃত ছিল যে তিনি এক সময় বার্মাতে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার স্বপ্নও পরিকল্পনা করেছিলেন। রেঙ্গুনে বিশাল সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেও তিনি স্বদেশী আন্দোলনের সাথে একাত্ত হয়েছিলেন। ইতিহাসে আজ বিস্মৃত প্রায় এই আবদুল বরি চৌধুরীর অনেক হারিয়ে যাওয়া তথ্যকে বেষ্ঠন করে সাহিত্যিক আজাদ বুলবুল চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ ও চট্টগ্রাম বার্মা সম্পর্ককে সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। যেহেতু এটিকোন ইতিহাস নয়, সাহিত্য, তাই বলা চলে বারি চৌধুরীর আরো বিস্তারিত কর্মকান্ড কাহিনীতে অজানা থাকলে ও পাঠক সমাজ তা দাবী করতে পারে না। বার্মার রেঙ্গুন শহরে তাঁর অবস্থান উপন্যাসের পাতায় এভাবে ওঠে আসে “রবিবার ছুটির দিন। আব্দুল বারি চৌধুরী এদিন ব্যবসায়িক কোন কাজ করেন না। বার্মা গনপরিষদের সদস্য হিসাবে এমনিতেই সামাজিক বহু কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। উমেদার, মোসাহেব, সাহায্যপ্রার্থীরা সকাল থেকেই অপেক্ষা করে অফিসের সামনে। চৌধূরী এদিন বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে খোশগল্পের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সমস্যাদি যথাসাদ্য সমাধা করে। …………. আলম প্রত্যেক দর্শনার্থীর নাম ঠিকানা আগমনের উদ্দেশ্য ও শুরুত্ব কাগজে লিখে বারি চৌধুরীর সামনে দাখিল করে” (পৃষ্ঠা- ১২৮) ।
রেঙ্গুন শহরের আর এক প্রতিষ্ঠিত বাঙালি ব্যবসায়ী সৈয়দ আহমদ। উপন্যাসের এই চপরিত্রটিও বাস্তবতা থেকে গল্পে ওঠে আসে। দেশের বর্তমান খ্যতিমান ব্যবসায়ী নাদের খানের পিতা সৈয়দ আহমদ ও বার্মায় অবস্থান করে স্বদেশী আন্দোলনকে উদজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে ভ‚মিকা রাখে। অগ্নিকোণ উপন্যাসে সৈয়দ আহমদের অবস্থান আবদুল বারি চৌধুরীর পরেই এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র। এদিকে বার্মা মুলুকেও তার অবস্থান ছিল বাস্তবে অনেকটা আবদুল বারি চৌধুরীর পরের অবস্থান। “পিডবিøউডির ঠিকাদার সৈয়দ আহমদ রেঙ্গুন বন্দরের জাহাজ ব্যবসায়ীদের প্রিয় পাত্র। জাহাজ রং করার কাজে তাঁর একক আধিপত্য। স্বগ্রামের ধনী ব্যবসায়ী আবদুল বারি চৌধুরীর সব জাহাজের রং করার কাজ তার কুক্ষিগত। এ ছাড়া চৌধুরীর বদন্ন্যতায় আরও আরও কাজ জোটানো সহজ হয়। ব্যস্ত টিকাদার হিসেবে তার কাজ চলে দেদারছে থিংগানযং এলাকায় একটি বাড়ি পছন্দ হয়েছে সৈয়দ আহমদের। ষোল একরের বিসাল বাড়ি। পিছনে ৪৪ একর ধানী জমি। বেশ কটি পুকুর আছে জমিতে।….. সৈয়দ আহমদ সর্বোচ্ছ বিডার হিসেবে সাড়ে সাত হাজার টাকায় কিনে বাড়িটি। সেখানে এখন তার নতুন ঠিকানা হয়েছে” (পৃষ্ঠা- ১০৩,১০৪)।
কথাসাহিত্যে ইতিহাসের ঘটনাকে অবলম্বন করে কাহিনী উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সমসাময়িক কালের পরিবেশ পরিস্থিতির দিকেও দৃষ্ঠি রাখতে হয়। অগ্নিকোনের আখ্যান কে বিশ্বস্থতার সহিত উপন্থাপন করার জন্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বহুল ব্যবহারেও পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন লেখ। যেহেতু শিক্ষা ও কর্মজীবনের দীর্ঘসময় চট্টগ্রাম অঞ্চলেই শুধু বসবাস করেননি, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময় কাঠিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। শহর চট্টগ্রাম ছারাও চট্টগ্রামের উত্তর-পূর্ব-পশ্চিম জর্নপথে যে ব্রিটিশ বিরোধী সহিংস আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল তার একটি নিপুন ইতিহাসনির্ভর বর্ণনা এই অগ্নিকোনে তুলে ধরতে কোথাও হুচট খেতে হয়নি। গ্রামের সাধারণ পার্শ্ব চরিত্র শুলো সৃষ্ঠিতেও লেখকের পারঙ্গমতা রয়েছে। তাঁদের সাধারণ আঞ্চলিক সংলাপের মধ্য দিয়েও উপন্যাসের মূল ¯্রােত স্বদেশী আন্দোলনের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক ভাবেই ওঠে এসেছে। বাংলা সাহিত্যের অপরাপর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলির মতো ভারীক্ষি ভাষা তিনি ব্যবহার করেননি। সাবলিল – সহজ সরল ভাষায় কাহিনী গতিময়তা পেয়েছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মুসলিম পরিবারের (নি¤œ বর্গের) চিরাচরিত কথায় কথায় খিস্তিখেউড়ের আঞ্চলিক আধিক্য অধিক পরিমানে দেখা গেলেও মূলত সংগ্রাম বিদ্রোহের অধিকাংশ চরিত্রই চট্টগ্রামী হওয়াতে তাদের মধ্যেও কিছু সংলাপ রচনায় আঞ্চলিক ভাষা থাকাটা স্বাভাবিক ছিল। যা খুব একটা ওঠে আসেনি। উত্তর চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে যার সীমারেখা নির্ণয়ে লেখক ব্যর্থ হয়েছেন।
ওপন্যাসিক এই > ৪র্থ পৃষ্ঠায় দেখুন
> ৩য় পৃষ্ঠার পর
ঐতিহাসিক ঘঠনাকে কেন্দ্র বিন্দু করে অগ্রসর হলেও উপন্যাস যে জীবনের ঘনিষ্ঠতম শিল্প মাধ্যম বিষয়টি ক্ষনিকের জন্যও ভুলে যাননি বলে আনন্দ বেদনার জীবনভাষ্যের স্বাদ পেতেও পাঠকের বেগ পেতে হয়নি। ঐতিহাসিক উপন্যাস হওয়াতে অগ্নিকোন নাম করনে প্রতীকী মাধ্যম অবলম্বন না করে ইতিহাসাশ্রীত সাধারণ কোন নামাক্ষীত হলে আরো আবেদন পেতো বলে আমার বিশ্বাস।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের এই যুববিদ্রোহ ভারত বর্ষের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রায় শতবর্ষ পূর্বের এই শসন্ত্র বিদ্রোহে চট্টগ্রামের ভৌগলীক সীমারেখার যথার্তব্যবহার, চট্টগ্রামের সর্বশ্রেণরি মানুষের অংশগ্রহণ ও সমর্তন, চট্টগ্রামের দূরহ আঞ্চলিক ভাষার অধিক্য, দুই শতাধিক ইতিহাসিক চারিত্রের উপস্থিতি, যুব বিদ্রোহের চট্টগ্রাম বার্মার যোগসূত্র এবং চট্টগ্রামের মাটি মানুষের সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে মড়ে ওঠা আখ্যায়ন চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য কোন সাহিত্যিকের হাত ধরে সৃষ্ঠি হতে পারতো কিন্তু হয়ে ওঠেনি। যিনি এই দূর্সাহসীক কাজটি দেখিয়েছেন তিনি অন্য অঞ্চল থেকে ওঠে আসা একজন কথাকার। চট্টগ্রাম ইতিহাস কেন্দ্রিক অসংখ্য গ্রন্থ, সাময়িক পত্র, প্রবন্ধ থেকে ঐতিহাসিক তথ্য-ওপাথ্য-সংগ্রহ করে এক মহাকাব্যিক উপন্যাসের আদলে শৈল্পীক রূপদিতে পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন অগ্নিকোন গ্রন্থে।
মাস্টারদা সূর্যসেন ও তার সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য মাইল ফলক। সমগ্র পাকভরত উপমহাদেশ থেকে সূর্যসেনের দেশমাত্রিকার জন্য আত্মত্যাগের অবদান ইতিহাস থেকে কখনো অ¤øান হবার নয়। তাই তো শথ বর্ষ পরেও ভারত থেকে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি ড. প্রনব মুখারজী সম্প্রতি ছুটে আসেন বাংলাদেশের অগ্নিঝরা সেই অঞ্চল চট্টগ্রামে। তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন রাউজানে সূর্যসেনের সেই বাস্তুভিটা। সেদিন যদি এই ক্ষনজন্মা অগ্নিপুরুষের জন্ম না হতো, হয়তো বা আজকের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে প্রনব মুখারজীর এই সফর সম্ভব হতো না। মাষ্টারদা সূর্যসেনের বাস্তুভিটায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতির এমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক। আর ওপন্যাসিক আজাদ বুলবুল-এর কাহিনী নির্বাচনের অনন্যতা এখানেই যে, এই আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক বিষয়ের বিষাদাত্মক আখ্যান এর আনুপূর্বিক বিবরনই হচ্ছে অগ্নিকোন।
চারশত আটচল্লিশ পৃষ্ঠার বৃহৎ উপন্যাস অগ্নিকোন যেমন আছে যুদ্ধোত্তর ভাগ্যান্নষনের চট্টগ্রাম থেকে একদল বার্মায় পাড়ি জমিয়ে থিতু হবার ঘটনা। আবার চট্টগ্রামের অনেকেই ধনে মানে বার্মায় আধিপত্য বিস্তার করলেও প্রাণ পরে আছে স্বদেশের স্বাদীনতার স্বপ্নে। উপন্যাসের পরিণতিতে এসে সমাপ্তী পর্ব তেষট্টিতে’চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহের যে বিয়োগাত্মক পরিনতি ঘটে তাতে শোকবাহ সমগ্র চট্টগ্রামের চিত্র অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে আকঁতে স্বক্ষম হয়েছেন এই কথাশিল্পী। – “অনন্ত সিংহের তামাকুমুন্ডির মন্ত্রির বাড়িতে সুনসান নীরবতা।…. আন্দরকিল্লায় কল্পনাদের বাড়িতে এখনো নিভেনি রাতের আলো। …. যোগেন্দ্র গুপ্তের দেবপাহাড়ের বাড়িতে আজ চুলা জ্বলেনি। ….. গভীর শোকে স্তদ্ধ চাটগাঁ শহর। কারফিউ তুলে নেয়া হয়েছে ভোর পাঁচটায়, এখন সকাল আটটা। কিন্তু রাস্তায় বের হয়নি মানুষজন, গাড়ি ঘোড়া।…… সারারাত দু-চোখের পাতা এক করতে পারেনি আবদুল বাড়ি চৌধুরী। সদর ঘাটের কর্তফুলীর পাড়ের এক দোতলা বাড়িতে কেটেছে তার নির্ঘুম রাত। সঙ্গী সৈয়দ আহমদও শামসুল আলম অস্থির ভাবে পায়চারি করছে বারান্দায়।… ভোর সকালে জানালা পথে দেখা যায় একটি ক্রজার ভাসছে কর্তফুলীতে। ….। বারি চৌধুরী দীর্ঘদিনের জাহাজ ব্যবসায়ী। তিনি বুঝেন কোন বিশেষ উদ্দেশ্য ছাড়া সিঙ্গাপুরের পতকাবাহী ক্রুজারটির এখানে ভেড়ানোর কথা নয়”। (পৃষ্টা ঃ- ৪৩৪-৪৩৫)।
আখ্যায়নের শেষাংসে এসে যুববিদ্রোহের আত্মত্যাগের বিষাদাত্মক পরিনাতিতে উল্লেখযোগ্য চরিত্র গুলোকে একই সমান্তরালে নিয়ে আসে। এবং ইঙ্গীত পূর্ণ বাখ্যে বুঝানো হয়েছে বিদ্রোহী মাষ্টার দা সূর্যসেনের ফাসির কাস্টে ঝুলানো লাশ বহন করে নিয়েযেতে কর্তফুলীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে এই সিঙ্গাপুরী ক্রুজারটি। ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতাকে আনুপৃর্বিক আক্রেধরে উপন্যাসের এই অগ্নিঝরা বিয়োগাত্মক পরিনতি কথা সাহিত্যিক আজাদ বুলবুল-এর সৃষ্টিশীলতার এক শৈল্পীক নৈপূর্নতাও বটে।