­স্বাগতম হিজরি নববর্ষ ১৪৪০

49

গতকাল মহরমের চাঁদ দেখা যাওয়ায় ইসলামি বর্ষ পঞ্জিকা অনুসারে আজ শুরু হয়েছে হিজরিবর্ষ ১৪৪০। স্বাগতম হে হিজরি নববর্ষ ১৪৪০। বিগত বর্ষের পরিসমাপ্তির পথ বেয়ে নতুন হিজরি বর্ষ ফিরে এসেছে । তাই এটি বিগত সময়ের অনুশোচনা ও সামনের জন্য নতুন সংকল্পে উজ্জীবিত হওয়ার সময়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্মভুমি মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের ঐতিহাসিক ক্ষণকে স্মারক হিসাবে গ্রহণ করে হিজরি সালের প্রবর্তন করা হয়। একথা সুপ্রতিষ্ঠিত যে, হিযরত ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। বিশ্বের ইতিহাসেও সবচেয়ে তাৎপর্যবহ, সুদূরপ্রসারী ঘটনা এটি। এটি দ্বীন ও মানবতার বৃহত্তম স্বার্থে ত্যাগ, বিসর্জনের এক সাহসী পদক্ষেপ। মক্কার কাফিরদের পাশবিক নির্যাতন-নিপীড়ন, অব্যাহত অমানবিক আচরণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ নীরবে সহ্য করার পর তাদের স্পর্ধা আরো বেড়ে যায়। তারা মহানবী (সা.) কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ তা’আলা তাদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন। মহানবী (সা.) ও মক্কার মুসলমানদের মদিনায় হিযরত করার নির্দেশ দেন। হিজরতের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দ্বার উন্মোচিত হয়। তাগুতি শক্তির মোকাবিলার শুভ সূচনা হয়। উদিত হয় মক্কা বিজয়সহ ইসলামের বিশ্বজয়ের রঙিন সূর্য। এস বিবেচনা করেই হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মারক বানিয়ে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) হিজরি নববর্ষের গোড়াপত্তন করেন। মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্রমাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন। হযরত ওমর (রা.) তার খিলাফতকালে হিজরতের ১৭তম বর্ষে হিজরি সন গণনা শুরু করেন। এর প্রেক্ষাপট ছিল এ রকম হযরত ওমর (রা.) এর কাছে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় চিঠি আসত। সেখানে মাসের নাম ও তারিখ লেখা হতো। কিন্তু সনের নাম থাকত না। এতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো। তখন পরামর্শের ভিত্তিতে একটি সন নির্ধারণ ও গণনার সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন উপলক্ষ থেকে সন গণনার মতামত আসলেও শেষ পর্যন্ত হিজরতের ঘটনা থেকে সন গণনার সিদ্ধান্ত হয়। হিজরতের বছর থেকেই সন গণনার তাৎপর্য কী ? সন গণনার আলোচনার সময় প্রস্তাব উঠেছিল, ঈসায়ী সনের সূচনার সঙ্গে মিল রেখে নবীজীর জন্মের সন থেকে ইসলামী সনের শুরু করা। এরকম আরও কিছু কিছু উপলক্ষের কথাও আলোচিত হয়। কিন্তু হিজরতের সন থেকে সন গণনা চূড়ান্ত হওয়ার পেছনে তাৎপর্য হলো, হিযরতকে মূল্যায়ন করা হয় ‘আল ফারিকু বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল’ অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট প্রার্থক্যকারী বিষয় হিসেবে। হিজরতের পর থেকেই মুসলমানরা প্রকাশ্য ইবাদত ও সমাজ গঠনের রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে ‘দ্বীনুল ফিতরাহ’ বা স্বভাব-অনুকূল ধর্ম। ইসলামের বিধিবিধান এমনভাবে দেয়া হয়েছে যে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহুরে-গ্রাম্য, সমতলবাসী বা পাহাড়ি, তথ্য ও প্রযুক্তির সুবিধাপ্রাপ্ত ও বঞ্চিত সবাই যেন স্বাচ্ছন্দ্যে আল্লাহর বিধিবিধানগুলো পালন করতে পারে। চাঁদের মাস ও বছরের হিসাবেই সহজে এটা করতে পারা যায়। জোতির্বিদ্যা বা আবহাওয়া বিষয়ক তথ্য যাদের কাছে থাকে না তারাও চাঁদ দেখে স্বাচ্ছন্দ্যে এ বিধানগুলো পালন করতে পারে। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, চান্দ্রবর্ষের হিসাব অনুযায়ী হওয়ায় একটি ইবাদত বিভিন্ন মৌসুমে পালনের সুযোগ মুসলমানরা পান। কখনও রোজা ছোট দিনের হয়, কখনও দীর্ঘ দিনের। কখনও ঈদ ও হজ্ব হয় শীতকালে, কখনও গ্রীষ্মকালে। মৌসুমের এই বৈচিত্র্যের কারণে মুসলমানরা একটি ইবাদত বা উৎসব আল্লাহর দেওয়া সব ক’টি মৌসুমেই পালন করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দিন-তারিখগুলোকে খ্রিস্টীয় সন-তারিখে রূপান্তরিত করে পালন করা হয় বা স্মরণ করা হয়। এটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আমরা মনে করি, এটি মোটেই যুক্তিযুক্ত নয় এবং এমনটি করা উচিত নয়। কারণ, এসব ঘটনা যেসব মাস বা দিনে হয়েছে সেগুলোর আলাদা তাৎপর্য আছে। তবে হিজরি সন ঠিক রেখে এর সঙ্গে খ্রিস্টীয় সনকে মিলিত করে উল্লেখ করা যেতে পারে। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, ইতিহাসের ঐতিহ্যকে ধারণ করে যে হিজরি নববর্ষ তা কোনদিকে যে চলে যায়, স্বয়ং মুসলমানরাই বেমালুম ভুলে যাচ্ছেন। অথচ পাশ্চাত্য ধারার খ্রিস্ট্রীয় সনের নববর্ষ আমাদের উম্মাতাল করে চলে যায়। আমরা চাই আমাদের বাঙালি ঐতিহ্যের ধারায় যে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়, তার মূল নির্যাস চন্দ্রবর্ষ বা হিজরি সন গণনা থেকেই শুরু হয়েছে। তাই আমাদের উচিৎ হিজরি নববর্ষকেও যথাযথ মর্যাদা ও উৎসবের মধ্যদিয়ে উদ্যাপন করা। হিজরি নববর্ষ উপলক্ষে পূর্বদেশের সকল পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা।